অভিযোগ দিলেও ক্ষতিপূরণ অল্প

চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড এলাকার আলফাই হোসাইন সজীব ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফেয়ার ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি এজেন্সির মাধ্যমে ক্রোয়েশিয়ায় যান। পাঠানোর সময় এজেন্সি বলেছিল তাকে ওই দেশের একটি রেস্টুরেন্টে কাজের ব্যবস্থা করে দেবে। কিন্তু কাজের বদলে তার ভাগ্যে মেলে প্রতারণা। ওই দেশে যাওয়ার পর দালালরা তাকে আটকে রেখে পরিবারের কাছে চার লাখ টাকা দাবি করে। টাকা দিতে না পারায় তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়।

২০২১ সালের মে মাসে সজীব দেশে ফিরে ওই এজেন্সির বিরুদ্ধে মানব পাচারের অভিযোগে মামলা করেন। এ ছাড়া ক্ষতিপূরণ চেয়ে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোতে (বিএমইটি) অভিযোগ করেন। সেই অভিযোগের পর বিএমইটি ওই রিক্রুটিং এজেন্সিকে ক্ষতিপূরণের চিঠিও দেয়। কিন্তু সেই অভিযোগের নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।

সজীব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রায় ২০ থেকে ২৫ বার শুনানির জন্য বিএমইটিতে গিয়েছি। তবুও সমস্যার সমাধান হয়নি। আমার ক্ষতিপূরণ এখনো পাইনি। কত দিন লাগবে তা-ও জানি না। এখন টাকা পাওয়ার আশা ছেড়েই দিয়েছি।’

প্রতিনিয়ত বিদেশে বা দেশে প্রতারণার স্বীকার হয়ে প্রবাসীরা দ্বারস্থ বিএমইটির। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন এ বিভাগটির কাজ অভিবাসন ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানে নিয়োগ প্রক্রিয়ার তত্ত্বাবধান, অভিবাসী কর্মীদের অধিকার সংরক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের অধিকতর সুযোগ সৃষ্টি করে দেশের কর্মোপযোগী জনগোষ্ঠীকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো। বিভিন্নভাবে প্রতারণার স্বীকার হয়ে দেশে ফেরা প্রবাসীদের অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য ওই বিভাগের অধীনে ‘আরবিট্রেশন সেল’ আছে। সেই সেলে প্রবাসীরা অভিযোগ করেন।

কিন্তু বিএমইটির আরবিট্রেশন সেলে অভিযোগ করে তা নিষ্পত্তির জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়। এমনকি বছর পার হয়েছে এমন তথ্যও পাওয়া গেছে।

জানতে চাইলে বিএমইটির মহাপরিচালক সালেহ আহমদ মোজাফফর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাকার বাইরে থাকা কর্মসংস্থান ও জনশক্তির আঞ্চলিক কার্যালয়গুলো খুব শিগগিরই ভুক্তভোগী প্রবাসীদের অভিযোগের বিষয়গুলো তদন্ত করবে। এ লক্ষ্যে কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। দুই ব্যাচে কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণও শুরু হয়েছে। যারা অভিযোগ করেন তারা অনেকেই দেশের বাইরে থাকেন। তাদের পক্ষে পরিবার বা আত্মীয়স্বজন অভিযোগ করেন। অভিযোগ তদন্তের জন্য এজেন্সি ও ভুক্তভোগী দুই পক্ষেরই বক্তব্যের প্রয়োজন রয়েছে। অনলাইন ও অফলাইন দুই মাধ্যমেই যাতে অভিযোগগুলো দ্রুত সমাধান করা যায়, সে বিষয়ে কাজ চলছে।’

জানা গেছে, প্রবাসীরা বিএমইটিতে প্রধানত চার ধরনের অভিযোগ করেন। এর মধ্যে বিদেশে গিয়ে চাকরি না পাওয়া, আকামা জটিলতা, বেতন ও চুক্তি অনুযায়ী কাজ না পাওয়া। অভিযোগ পাওয়ার পর দপ্তরটি তা তদন্ত ও অনুসন্ধান শেষে নিষ্পত্তি করে। তবে প্রতি বছর কয়েক হাজার অভিযোগ জমা পড়লেও তা নিষ্পত্তির হার অর্ধেকের কম। বিএমইটির তথ্য বিশ্লেষণ করে এমনটি দেখা গেছে। গত পাঁচ বছরে হয়রানি-নির্যাতন নিয়ে সংস্থাটির কার্যালয়ে যত অভিযোগ জমা পড়েছে, এর ৬১ শতাংশ প্রবাসীই কোনো প্রতিকার পাননি। এমনকি যারা প্রতিকার পাচ্ছেন, ক্ষতিপূরণ হিসেবে তার পরিমাণও যৎসামান্য বলে জানান ভুক্তভোগীরা।

বিএমইটির গত পাঁচ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় প্রবাসে হয়রানি ও নির্যাতনের বিষয়ে যত অভিযোগ পড়েছে তার নিষ্পত্তির হার সবচেয়ে কম। এর মধ্যে গত বছর আরবিট্রেশন সেলে অভিযোগ জমা পড়েছে ২ হাজার ৩৮০টি। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ৮৬৫টির। সেই হিসাবে অভিযোগ নিষ্পত্তির হার ৩৬ শতাংশ; অর্থাৎ ৬৪ শতাংশ অভিযোগেরই কোনো সুরাহা হয়নি। আর যেসব নিষ্পত্তি হয়েছে তার মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ আদায় হয় ৪ কোটি ৮৭ লাখ ৯১ হাজার টাকা।

পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম অভিযোগ নিষ্পত্তি হয় ২০২২ সালে। হয়রানি, নির্যাতনসহ নানা বিষয়ে ওই বছর বিএমইটিতে ১ হাজার ২৪০টি অভিযোগ করেন বিভিন্ন দেশে থাকা প্রবাসী ও তাদের স্বজনরা। এর মধ্যে ৫৬৭টিই ছিল নারী প্রবাসী কর্মীদের। ওই বছর নিষ্পত্তি হয় ৩৩৯টি অভিযোগ। এসব খতিয়ে দেখে ক্ষতিপূরণ আদায় করা হয় ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। ২০২১ সালে অভিযোগ পড়ে ৫২৮টি, নিষ্পত্তি হয় ২৪০টি আর ক্ষতিপূরণ আদায় হয় ১ কোটি ৮২ লাখ টাকা। ২০২০ সালে অভিযোগ পড়ে ৯০৫টি, নিষ্পত্তি হয় ৪২৪টি, ক্ষতিপূরণ আদায় হয় ২ কোটি ৪০ লাখ ৪১ হাজার টাকা। এর পরের বছর ২০১৯ সালে অভিযোগ পড়ে ৭৩২টি, নিষ্পত্তি হয় ৩৭৫টি এবং ২ কোটি ৫৬ লাখ ৯২ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় হয়।

তবে অভিযোগ নিষ্পত্তি না হওয়ার পেছনে জনবল সংকটকে দায়ী করেছেন বিএমইটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। প্রবাসীদের অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য বিএমইটিতে লোকবল খুবই কম। তাই সময় বেশি লাগে। এ ছাড়া অভিযোগকারী শুনানি ও যার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, তাদেরও কথা শুনতে হয়। তাই নির্দিষ্ট সময়ে সমাধান হয় না। তবে সমস্যা সমাধানে বিকল্প চিন্তাভাবনা করছে বিএমইটি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিএমইটিতে পড়া অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ঢাকার বাইরে থাকা ৪২টি জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসে সমাধানের ব্যবস্থা থাকবে। বড় সমস্যাগুলো ঢাকা অফিসে আর ছোটখাটো সমস্যাগুলো জেলা অফিসে সমাধান করা হবে। তারা সমাধানে ব্যর্থ হলে ঢাকা বিএমইটিতে পাঠিয়ে দেবে। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে সমস্যার কিছুটা সমাধান হবে বলে জানান তিনি।

এসব বিষয়ে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর অভিযোগ নিষ্পত্তি কর্মকর্তা (কর্মসংস্থান) উপসচিব মোহাম্মদ আবদুল হাই দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা অভিযোগ পাওয়ার পরেই সংশ্লিষ্ট এজেন্সি বা যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে তাদের চিঠি পাঠাই। কিন্তু সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলো তেমন সহযোগিতা না করাই সমস্যাগুলো ঝুলে যায়। এসব সমস্যা সমাধানে কঠোর আইন দরকার। এ ছাড়া জনবল বাড়ানো ও মনিটরিং দরকার। তবেই সমস্যার সমাধান হবে।’