ভারতে চলছে লোকসভা নির্বাচন। নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে বাম-কংগ্রেস জোটের প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন সিপিআইএম পলিটব্যুরো সদস্য, রাজ্য কমিটির সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। লোকসভা নির্বাচন থেকে শুরু করে ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বামপন্থার ভবিষ্যৎ সব নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি। দেশ রূপান্তরের জন্য এই বিশেষ সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা, লেখক ও কলামিস্ট সৌমিত্র দস্তিদার।
প্রশ্ন : ভোটের দিন দেখলাম, আপনি বুথে বুথে ঘুরে ভুয়া এজেন্ট ধরছেন। গ্রামবাসীদের সাহস জোগাচ্ছেন, তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মীদের সঙ্গে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ছেন। কেউ কেউ বলছেন, একজন রাজ্য সম্পাদক হয়ে বিপক্ষের কর্মীদের গায়ে হাত তোলা ঠিক হয়নি।
উত্তর : প্রথমেই বলি, যাদের গায়ে হাত তুলতে বাধ্য হয়েছি, তারা কেউই নিরীহ কর্মী-সমর্থক নয়। ওরা তৃণমূল কংগ্রেসের গু-া। ওরা গ্রামের লোককে, বিশেষ করে মহিলাদের ভয় দেখিয়ে ভোট দিতে দিচ্ছিল না। এমনকি আমার সঙ্গেও অত্যন্ত নোংরা ভাষায় কথা বলছিল। ওদের পা-ার নাম আবার হিটলার। সে আমার দিকে তেড়ে আসতে আমি রুখে উঠি। হিটলারের বিরুদ্ধে কমিউনিস্টরা সবসময় রুখে দাঁড়াবে। তাছাড়া একজন ক্যাপ্টেন হয়ে আমি পিছিয়ে গেলে লোকের, এমনকি আমার কর্মী-সমর্থকদের কাছেও ভুল বার্তা যেত। আমি তো ছাত্র আন্দোলন করে উঠে এসেছি। আগে তো অ্যাক্টিভিস্ট, পরে রাজ্য সম্পাদক। সারা রাজ্যে এর আগে যত নির্বাচন হয়েছে সব জায়গায় তৃণমূল ভোট লুট করে জিতেছে। এবার কোথাও আমরা লুট করতে দিইনি।
প্রশ্ন : অনেকে বলছেন যে সিপিআইএমের রাজ্য সম্পাদক হিসেবে আপনি দলকে অনেক চনমনে করে তুলছেন। কর্মী, সমর্থক, সদস্যদের শরীরের ভাষা আমূল বদলে গেছে। কেউ তেড়ে এলে তারাও জবাব দিতে তৈরি। এটাই দেখলাম ভোটের দিন।
উত্তর : দেখুন, কৃতিত্ব আমার একার নয়। সবাই মিলে দলকে আগের থেকে অনেক সংগঠিত করা গেছে। আমরা তারুণ্যের ওপর জোর দিয়েছি। এবার কত কত তরুণ আমরা সঙ্গে পেয়েছি তা বহুদিন পাইনি। দীপ্সিতা, প্রতিকূর, সৃজনরা প্রার্থী হয়েছে। মীনাক্ষী সারা রাজ্য চষে ফেলছে। মুর্শিদাবাদ কেন্দ্রেই দেখুন, জামির মোল্লার মতো তরুণ জেলা সম্পাদক। এছাড়া এক ভগবানগোলাতেই কামাল, বাচ্চু, বাবলু, ইসমাইল আরও শত শত ছেলে-মেয়ে লাল পতাকা নিয়ে রাস্তায় নেমেছে। দল এখন একটা ট্র্যানজিশনে পৌঁছেছে। ভোটের ফল নিয়ে এখনই কিছু বলব না। কিন্তু সংগঠন যে অনেক মসৃণ মেশিনারি তৈরি করতে পেরেছে তা নিয়ে কোথাও কোনো সন্দেহ নেই।
প্রশ্ন : সর্বভারতীয় স্তরে বামেরা যথেষ্ট কোণঠাসা। কারণ কী?
উত্তর : গত দু দশক ধরে এ বিশ্বে, এ উপমহাদেশে এবং ভারতেও চরম দক্ষিণপন্থার উত্থান হয়েছে। ফলে যেটা হয়েছে গরিব এবং বড়লোকের মধ্যে ব্যবধান বেড়ে গেছে। গরিব দেশ এবং বড়লোক দেশের মধ্যেও এটা বেড়ে গেছে, ক্রমাগত হচ্ছে এটা, হ্যাভস এবং হ্যাভ-নট্সদের মধ্যে; দেশের মধ্যে, দেশগুলোর মধ্যে এবং আঞ্চলিকভাবে। সেখানে দাঁড়িয়ে গ্লোবালাইজেশনের নামে যেটা হয়েছে যারা লুটে নেয় প্রাকৃতিক সম্পদ এবং বাকি সব সম্পদ যারা কুক্ষিগত করে নিচ্ছে, বিজ্ঞান প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে নিয়ে তাদের কাছে এত ফান্ড তৈরি হয়েছে যে, যেখানে দাঁড়িয়ে তারা এখনকার জন্য না, ভবিষ্যতের যা কিছু সম্পদ, জ্বালানি, গবেষণা তারা এখন থেকে বুক করে নিচ্ছে। অথচ আমরা কমিউনিস্টরা, বামপন্থিরা, আমাদের যে ওয়ার্কিং ক্লাস ঐক্য সেটা হচ্ছে মানবতার ক্ষেত্রে, হিউম্যানিটির ক্ষেত্রে। মার্কেটটার গ্লোবালাইজেশন হলো অথচ কালচার, সিভিলাইজেশন, পলিটিক্স, সোসাইটি এগুলো লোকালাইজড হয়ে গেল। একটা ফ্রাগমেন্টেশন হয়ে গেল। যত বেশি সোসাইটি ফ্রাগমেন্টেড হচ্ছে, তত বেশি সোসিও-পলিটিক্যাল অবজেক্টিভগুলো ফ্রাগমেন্টেড হচ্ছে। তত বেশি ইকোনমিক কনসোলিডেশন হচ্ছে। এই ৯৯ আর ১ ভাগ পার্সেন্টেজের যে লড়াই, এটা আরও প্রবল হবে। এখন সময় এসেছে এটাকে রিভাইব করার। তার জন্য তোমাকে রাইটিস্টদের যে এপ্রোচ আছে, তার কাউন্টার ন্যারেটিভ তৈরি করতে হবে। এই লেফট কাউন্টার ন্যারেটিভ তৈরির কোনো বিকল্প নেই একটি কনস্ট্যান্ট সাস্টেন্ড পিপলস স্ট্রাগল হুইচ উইল ইউনাইট পিপল।
প্রশ্ন : লেফট ন্যারেটিভ তৈরি করার পথ তো সোজা নয়। আপনার পথনির্দেশ কী!
উত্তর : সাফারিং আছে, এস্পিরেশন আছে, ইস্যুগুলো রেইজ করতে হবে লাইভলিহুড, এনভায়রনমেন্ট, লিভিং কন্ডিশন। ওদিকে রাইট উইং তাদের প্রিডোমিনেন্স ধরে রাখার জন্য কূটনৈতিক, মিলিটারি এবং পলিটিক্যাল-ইডিওলজিক্যাল সব ডিভিসিভ টেকনিক তারা প্রয়োগ করে। ক্ল্যাশ অফ সিভিলাইশেজন দিয়ে শুরু হয়েছিল। এরপর তারা যুদ্ধ ব্যবহার করবে। টেরোরিজমকে ব্যবহার করবে। রিলিজিয়নকে ব্যবহার করবে। তারপর ফ্রাগমেন্ট করবে। লড়াইটা তাহলে হচ্ছে, এদিকে ফ্রাগমেন্টেশন, অন্যদিকে ইলুমিনেশন।
প্রশ্ন : আজকের ভারতের শাসকদের ভূমিকা তাহলে ব্রিটিশদের ডিভাইড অ্যান্ড রুলেই চলছে? ভাগ করো ও শাসন করো। হিন্দু-মুসলমান বিভাজনের রাজনীতি?
উত্তর : আজ ভারতে দক্ষিণপন্থার উত্থানের ফলে ধর্মকে ব্যবহার করে যে উন্মাদনা তৈরি করেছে মেজরিটেরিয়ানিজম প্রতিবেশী অন্য দেশগুলোতেও দেখবে, এটা শুধু হিন্দু-মুসলমান নয়। মেজরিটেরিয়ানিজম মানে হলো জোর যার মুল্লুক তার, যার সংখ্যা বেশি সে ঠিক করবে সব। এটা অ্যাক্রস দ্য নেশন হতে পারে, উইদিন দ্য নেশন হতে পারে বা ছোট ছোট পকেটে হতে পারে। মাতব্বরি। এখানে বাবরি মসজিদের ক্ষেত্রে কী হলো? আগে গায়ের জোরে ভেঙে দেওয়া হলো, তারপর কোর্ট থেকে লিগালাইজ করে নেওয়া হলো। প্রতি মুহূর্তে এটা দেখা যাচ্ছে সিএএ, এনআরসি...। আগে বাংলাদেশি ইনফিল্টারেশন, বহিরাগত, রোহিঙ্গা, জিহাদি এই ক্যাম্পেইনটা করে নিয়ে তারপরে যেভাবেই হোক এদের বাদ দাও। এখানে তৃণমূল যা করছে তুমি পঞ্চায়েত ভোটে অংশগ্রহণ করবে, নমিনেশন জমা করবে, ভোট দেবে, গণনা হবে, তারপর বোর্ড তৈরি হবে। কিন্তু তার মনের মতো যদি না হয় সে কিছুই করতে দেবে না। এমনকি ইলেক্টেড পঞ্চায়েতকে বোর্ড তৈরি করতে দেয়নি। যেহেতু বিক্রি হয়নি। যেমন আমডাঙ্গায়। দুই হচ্ছে, আমরা কেন বিজেপি এবং তৃণমূলের বিরুদ্ধে। আরএসএস এই যে ল্যাবরেটরি করতে বলল। পশ্চিম উপকূলের গুজরাটে গত আড়াই দশক ধরে এ কাজ করল। যেখানে হিন্দুত্বের নাম করে, হিন্দু রাষ্ট্রের যে কল্পনা আছে তাকে, ধর্মনিরপেক্ষতা আছে তাকে ভেঙে দিয়ে, সোসাইটিতে যে হারমনি আছে তাকে কীভাবে নষ্ট করা যায় এবং মেজরিটেরিয়ানিজমকে কীভাবে ইম্পোজ করা যায় সে প্রক্রিয়া চলল। আসলে আমাদের মতো দেশে যদি ধর্মনিরপেক্ষতা না থাকে, গণতন্ত্র থাকবে না। যদি গণতন্ত্র না থাকে ধর্মনিরপক্ষেতা থাকবে না, অর্থাৎ সেকুলার ডেমোক্রেসি। পশ্চিমবঙ্গেও তৃণমূল গণতন্ত্রের ধার ধারে না।
প্রশ্ন : আজকের দিনে লেফটের কাছে মূল চ্যালেঞ্জ তাহলে কী?
উত্তর : আজকের দিনের চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ইন্ডিয়াতে সেকুলার, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিককে আমাদের রক্ষা করতে হবে। লাস্টলি ইউনিটি ইন ডাইভারসিটি এটাকে যদি রক্ষা করতে হয় তাহলে এটাও বুঝতে হবে ইউনিটির অ্যাপ্রোচটাও ডাইভারসিফাই হতে হবে। ভেরিয়াস স্টেটে ডাইভারসিফায়েড রিয়ালিটি। কালচার, ল্যাঙ্গুয়েজ অন্যান্য সমস্ত জিনিস যেমন আলাদা আলাদা আছে সে রকম রাজনীতিতে প্রত্যেকটা রাজ্য পলিটিক্যাল ল্যাডারেও আলাদা স্টেজে আছে। কোথাও এক ধাপে নেই। এই জন্য আমরা বললাম ইন্ডিয়া কন্সেপ্টটি ব্লক হিসেবে তৈরি হবে। অ্যান্টি বিজেপি মোবিলাইজ হবে। যখন পুল করব আমি অ্যান্টি বিজেপি ভোটকে, তখন লোকাল লেভেলে স্ট্র্যাটেজাইজ করতে হবে। আমি প্রথমে বলেছিলাম কন্সট্যান্ট স্ট্রাগল। এই কন্সট্যান্ট স্ট্রাগল করতে গেলে একটা কোয়ালিশন করতে হবে। সেটা হচ্ছে পার্লামেন্টারি কোয়ালিশন। আরেকটা হচ্ছে- এই স্ট্রাগলের মধ্য দিয়ে তোমাকে নতুন স্ফিয়ার জয় করতে হবে। নতুন ক্ষেত্র, নতুন উপাদান, নতুন পিপল আসবে। তাকে কনসলিডেট করতে হবে। একটা উপত্যকা অতিক্রমে নদীর বাধা এলে আর সেই বাধা পাহাড় ডিঙাতে গেলে নদীটা উপত্যকায় ছড়িয়ে যাবে। তখন তা আসলে বাদ দিতে হবে। কনসলিডেট করতে হবে, তখন তার গতিটা বাড়বে। আবার পরবর্তী উপত্যকায় যেতে হবে। একটাতে হবে না, কন্সট্যান্ট অ্যাপ্রোচ লাগবে। এর সঙ্গে অর্গানাইজেশনাল কাজটাও করতে হবে। এটা কমিউনিস্ট পার্টি ও লেফট পার্টিগুলোকে বুঝতে হবে। অনেকে কী করে চেনা ছকে, চেনা ছাঁচে কাজ করতে চায়। এবং সেখানে নতুন কিছু প্রয়োগ করতে চায় না।
এক একটা জেনারেশন এক একটা সমস্যা ফেস করে। আজকের গ্লোবালাইজেশনের ফলে, কস্টলি এডুকেশনের ফলে, অ্যান্টি ডেমোক্রেটিক মুভসের ফলে, ইনকাম কমে যাওয়ার ফলে লোকে একটা রিভাইব করতে চাচ্ছে। নতুন জেনারেশন যে সমস্যা ফেস করে সে নতুনভাবে আবার নিজেকে সংগঠিত করে সেই চ্যালেঞ্জটাকে মোকাবিলা করার জন্য। দ্যাটস আ ওয়েলকাম ডিফেন্ড। এটা হচ্ছে চেঞ্জেস। গান্ধীর ভাষায় ইউথ টু দ্য ফর। সেই চট্টগ্রামে যখন যুব বিদ্রোহ হয়েছিল।
প্রশ্ন : আপনি তো পশ্চিম এশিয়া নিয়ে চর্চা করেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে প্যালেস্টাইন প্রশ্ন তো এখন খুব প্রাসঙ্গিক। কিছু বলবেন?
উত্তর : প্যালেস্টাইনটা চোখ খুলে দিয়েছে। লোকে মনে করল, বিশ্বায়নের ফলে এই ইউনিপোলার ওয়ার্ল্ডে আমেরিকা যা করবে, সব সিদ্ধান্ত হয়ে যাবে। আর আন্দোলন সংগ্রাম সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক কিছু বলতে হবে না। অসলো চুক্তি হলো। অসলো চুক্তির পরে এখন দেখা গেল, প্যালেস্টাইনের ভূমি রক্ষার ক্ষেত্রে, অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে, স্বাধীনতা রক্ষা করতে তাকে লড়তে হবে। যে নামে করুক যে ঢঙে করুক। লড়াই ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। কারণ কেউ তোমাকে সিলভার প্ল্যাটারে তোমার ফ্রিডম, তোমার রাইটস তোমাকে ডেলিভার করবে না। বোমা ডেলিভার করতে পারে, মিসাইল ডেলিভার করতে পারে। কিন্তু এফ-১৬ প্লেনে বা নিউক্লিয়ার ওয়ারহেডে ডেস্ট্রাকশনকে ডেলিভার করা যায় কিন্তু কনস্ট্রাকশনকে ডেলিভার করা যায় না। মার্কিন মুল্লুক থেকে সারা পশ্চিমে জায়নবাদ ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে ছাত্র বিক্ষোভ সংঘটিত হচ্ছে এভাবেই লেফট ন্যারেটিভ জন্ম নেয়।
প্রশ্ন : এই মুহূর্তে যে ৩ দফা ভোট হয়েছে সেখানে দেখা যাচ্ছে যে, মোদির ভোট অনেক কমছে...?
উত্তর : প্রত্যেক দফা ভোট যত এগোবে এবং মানুষ রিয়ালিটি ফেস করবে। মিডিয়া একটু আগে থেকেই ইলেক্টোরাল বন্ডের টাকায় বাইনারি ডেভেলপ করছিল বা মোদি হ্যায় মোদি হ্যায় বলে চিৎকার করছিল। সেটা বেসড অন ফ্যাক্ট ছিল না। সুতরাং রিয়ালিটি সামনে চলে আসবে। এবং তাতে ক্রমাগত মোদি চারশো বলছিল এখন আর ৩০০ বলবে না। এখানে ৩৫ বলছিল এখন আর ২০-ও বলবে না। এভাবে ধাপটা নেমে যাবে।
প্রশ্ন : পশ্চিমবঙ্গে কী হতে পারে?
উত্তর : বাইনারিটা ভেঙেছে। তীব্র লড়াই হবে। এরপর তৃণমূল আর বিজেপি একদিকে আর লেফট-কংগ্রেস আরেক দিকে।
অনুলিখন : ঋতপ্রিয়া নন্দী