ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) বা নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র এবং সিসিইউ (কার্ডিয়াক/করোনারি কেয়ার ইউনিট) অর্থাৎ হৃদযন্ত্রের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে রোগীদের অত্যন্ত জরুরি অবস্থায় জটিল চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। সাধারণভাবে আইসিইউতে বিভিন্ন ধরনের অসুখের জন্য নিবিড় পর্যবেক্ষণ করা হয় আর সিসিইউতে শুধুমাত্র হৃদযন্ত্রের অসুখের জন্য নিবিড় পর্যবেক্ষণ করা হয়। ২০১৯ সালে দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিকগুলোতে কতগুলো ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ), করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) আছে, তার হিসাব চেয়েছিল হাইকোর্ট। সেই সঙ্গে একটি আইসিইউ বা সিসিইউ ইউনিট তৈরির জন্য কত টাকা খরচ হয়, কী পরিমাণ লোকবল ও বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন, সে বিষয়েও প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, সেই বছরের ২৪ এপ্রিলের মধ্যে স্বাস্থ্য সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে হলফনামা আকারে এ প্রতিবেদন দিতে হবে। ‘দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিস (রেগুলেশনস) অর্ডিন্যান্স-১৯৮২’ অনুযায়ী নীতিমালা প্রণয়নে আদালতের আদেশ কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে, তার অগ্রগতি প্রতিবেদন দিতে এই আদেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট। সে অনুযায়ী স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অগ্রগতি প্রতিবেদনও দাখিল করে। কিন্তু তারপর? আমরা জানি না। প্রায়ই সংবাদমাধ্যম সূত্রে আমরা জানতে পারি- অমুক হাসপাতালে আইসিইউ, সিসিইউ, গুরুত্বপূর্ণ মেডিকেল যন্ত্রপাতি অযত্নে পড়ে আছে। তমুক হাসপাতালে লোকবল নেই। আবার চিকিৎসা যন্ত্রপাতি নষ্ট। কোনো বিষয়ে যখন গণমাধ্যমে হইচই শুরু হয়, তখনই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসেন। ভাবটা এমন, এর আগে কোনো দায়িত্ব-কর্তব্য নেই। যাদের নির্দিষ্ট দায়িত্ব দেওয়া হয় সেই মানুষজন এক ধরনের দায়িত্বহীনতা এবং স্বেচ্ছাচারী মনোভাব দেখান। অভিযোগ রয়েছে, কর্তৃপক্ষের এমন মানসিকতার পেছনে একটি বড় ধরনের স্বার্থ লুকিয়ে রয়েছে।
আজ পর্যন্ত এ বিষয়ে যত সংবাদ আমরা জানতে পেরেছি, তার অধিকাংশই সরকারি হাসপাতাল সংক্রান্ত। কোনো হাসপাতালে যন্ত্রপাতি নেই, ওষুধ নেই, আইসিইউ নেই, সিসিইউ নেই, লোকবল নেই এই ধরনের বিভিন্ন ‘নেই’ যখন প্রকট আকার ধারণ করে তখন তারা একটি মোক্ষম সুযোগ পান। অভিযোগ রয়েছে, ঠিক তখনই রোগীকে রেফার করা হয় বেসরকারি কোনো ক্লিনিক বা হাসপাতালে। বিনিময়ে সেই গোষ্ঠী বড় ধরনের কমিশন পান। শনিবার প্রকাশিত ‘অযত্নে পড়ে আছে আইসিইউ-সিসিইউ’ প্রতিবেদন জানাচ্ছে শেরপুর জেলায় সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে শুধু জনবলের অভাবে চালু করা যাচ্ছে না আইসিইউ এবং সিসিইউ ইউনিট। অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে দুই ইউনিটের মূল্যবান সব যন্ত্রপাতি। তাতে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ২০ লাখ মানুষ। এই মানুষগুলো তাহলে জরুরি মুহূর্তে যাবে কোথায়? সামর্থ্য থাকলে সেখানেই যাবে, যেখানে চিকিৎসাসেবা পাওয়া যাবে। আর সামর্থ্য না থাকলে মারা যাবে! প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে এর সমাধান কী? করোনার সময় শেরপুর জেলা সদর হাসপাতালের আটতলা ভবনের ওপর প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি আইসিইউ ও একটি সিসিইউ ইউনিট নির্মাণ করা হয়েছে। ২ কোটির বেশি টাকা ব্যয়ে ভেন্টিলেটর, ১০টি করে ২০টি বেডসহ সব ধরনের যন্ত্রপাতি দিয়ে ইউনিট দুটিকে সাজানো হলেও শুধু জনবলের অভাবে তা চালু করা যাচ্ছে না। ফলে হাসপাতালের আইসিইউ ও সিসিইউ ইউনিটের ভেন্টিলেটর, শয্যাসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যাচ্ছে, হাসপাতালটিকে ২০১৮ সালে ১০০ থেকে ২৫০ শয্যার জেলা সদর হাসপাতাল হিসেবে উন্নীত করা হয়। কিন্তু ২৫০ শয্যা হলেও ডাক্তার-নার্সসহ অন্যান্য লোকবল রয়েছে ১০০ শয্যারই। নতুন করে আইসিইউ ও সিসিইউ ইউনিট চালু করতে হলে ৬ জন কনসালট্যান্ট, ১২ জন মেডিকেল অফিসার, ৩০ জন নার্স, ১২ জন ওয়ার্ডবয়, ৬ জন স্ট্রেচার বেয়ারার, ৩ জন ল্যাব টেকনিশিয়ান, ২ জন আইসিইউ টেকনিশিয়ান ও ৬ জন সুইপার প্রয়োজন।
সেই চিরাচরিত সমস্যা। কোথাও প্রয়োজনীয় লোকবল নেই, আবার কোথাও যন্ত্রপাতি নেই। এই দুইয়ে দীর্ঘদিন ধরে ঘুরপাক খাচ্ছে, আমাদের সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা। মজার বিষয় হচ্ছে, বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালে এ রকম সমস্যা দেখা যায় না। এই ধরনের সমস্যার ‘ফাঁক’ চিহ্নিত না হলে- সরকারি হাসপাতালে আইসিইউই আইসিইউতে থাকবেই।