সরকার পতনের লক্ষ্যে গত বছরের শেষের দিকে বিএনপির চূড়ান্ত আন্দোলন কর্মসূচির সময়ে দলটির ভ্যানগার্ডখ্যাত ছাত্রদলের নেতৃত্বের দুর্বলতা প্রকাশ্যে আসে। আন্দোলনে প্রত্যাশা অনুযায়ী ভূমিকা রাখতে না পেরে সমালোচনার মুখে পড়েন সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা। সে সময় ছাত্রদলের ভূমিকায় প্রকাশ্যে আক্ষেপ প্রকাশ করতে দেখা গেছে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের। এমন পরিস্থিতিতে সংকট থেকে উত্তরণ এবং আন্দোলন ও সংগঠনে গতিশীলতা ফেরাতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশে নিষ্ক্রিয় কমিটি ভেঙে সাম্প্রতিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখা ও মেধাবীদের নেতৃত্বে আনে বিএনপির হাইকমান্ড।
সংগঠনকে গতিশীল করতে গত ১ মার্চ ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রাশেদ ইকবাল খান ও সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদের নেতৃত্বাধীন কমিটি বিলুপ্ত করে রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও নাছির উদ্দীন নাছিরের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাত সদস্যের নতুন আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। তাদের নেতৃত্বে রাজপথে কিছুটা সক্রিয়তাও দেখা যায়। বিভিন্ন ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান জানানোসহ সারা দেশে কর্মী সম্মেলনের উদ্যোগ নেয় ছাত্রদল। এবার নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা মেটাতে এবং সংগঠনের গতিশীলতা বাড়াতে দ্রুত সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে সংগঠনটি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়ে কাজ চলছে। একটা খসড়া প্রস্তুত করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নজরেও আনা হয়েছে। চলতি মাসের যেকোনো সময় ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। আর তা হলে এটি হবে সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্রদলের দ্রুত পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের রেকর্ড। তিন মাসের মধ্যে বিগত কয়েকটি কমিটি পূর্ণাঙ্গ হয়নি। এর আগে কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ ও সাইফ মাহমুদ জুয়েলের নেতৃত্বাধীন কমিটি সময় নেয় পাঁচ মাস এবং ফজলুর রহমান খোকন ও ইকবাল হোসেন শ্যামলের কমিটি সময় নেয় এক বছরের বেশি।
কত সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি হবে সে বিষয়ে আলোচনা আছে ছাত্রদলে। ৬০-৭০ সদস্যের কমিটি হওয়ার আলোচনা থাকলেও ছাত্রদলের দায়িত্বশীল একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছে যে ১০১ থেকে ১৫০ সদস্যের কমিটি হতে পারে। ছাত্রদলের খসড়া গঠনতন্ত্রের ১৭ ধারা অনুযায়ী কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সংখ্যা ১৫১ হওয়ার কথা থাকলেও শীর্ষ নেতারা সংগঠনের চাহিদা অনুযায়ী কমিটি ঘোষণা করেন। সর্বশেষ কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ ও সাইফ মাহমুদ জুয়েল ৩০২ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করেন। আর তার আগে ফজলুর রহমান খোকন ও ইকবাল হোসেন শ্যামলের নেতৃত্বাধীন কমিটিতে ৬০ সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। তবে সে কমিটি পরে আর আড়াই বছরেও পূর্ণাঙ্গ করতে ব্যর্থ হন তারা। তাতে অনেক ত্যাগী ও যোগ্য নেতাকর্মী সাংগঠনিক পরিচয় পাওয়া থেকে বঞ্চিত হন। তাই বর্তমান নেতৃত্ব যোগ্যদের নিয়ে একটি স্মার্ট কমিটি গঠন করতে চায় বলে জানা গেছে।
বিগত কমিটির একাধিক নেতা বলেন, সর্বশেষ কমিটিতে সিন্ডিকেট ও আঞ্চলিকতা গুরুত্ব পাওয়ায় আন্দোলনের উপযুক্ত সময়ে তারা ভূমিকা দেখাতে পারেনি। তবে বর্তমান কমিটির নেতারা বলছেন, পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে স্থান পাওয়ার একমাত্র মানদণ্ড হবে আন্দোলন সংগ্রামে ভূমিকা রাখা। এর বাইরে কারও কমিটিতে আসার সুযোগ নেই। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে নারী নেতৃত্ব থাকলেও সে হার এবার বাড়বে বলে জানান তারা। ছাত্রদলের নতুন কমিটির নেতারা তৃণমূল থেকে ছাত্রদলকে সুসংহত করে সরকার পতনের আন্দোলনে অতীতের চেয়ে অগ্রণী ভূমিকা রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া নিয়েও শিক্ষাঙ্গনে সক্রিয় থাকার কথা জানিয়েছেন তারা।
বর্তমান কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছাত্রদলকে তৃণমূল থেকে আরও বেশি সুসংহত করতে আমরা কাজ করছি। ইতিমধ্যে কর্মিসভা শুরু করেছি। আমরা চেষ্টা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করতে। সে প্রস্তুতি আমাদের চলছে। যারা আন্দোলন সংগ্রামে ভূমিকা রাখছে তাদের মূল্যায়ন করা হবে। এর বাইরে কেউ কমিটিতে আসার সুযোগ নেই। দ্রুত সময়ের মধ্যে যোগ্যদের নেতৃত্বে এনে ছাত্রদলে আরও বেশি গতিশীলতা আনা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের প্রধান লক্ষ্য গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা এবং ক্যাম্পাসগুলোতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি আদায়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করা। বাংলাদেশের কর্র্তৃত্ববাদী সরকার ক্ষমতায় থাকার কারণে সেভাবে আন্দোলনের সফলতার মুখ দেখেনি ছাত্রদল। এবার এ সরকারের পতনের মাধ্যমে ছাত্রদলের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা আমরা ফিরিয়ে নিয়ে আসব।’
আর কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ বা আংশিক কমিটি ঘোষণা করব। যারা আন্দোলন করেছেন, এমনকি জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন, তাদের আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করব। চলমান আন্দোলনে যারা ভূমিকা রাখছেন, বিশেষ করে ২৮ অক্টোবর এবং এরপর থেকে যারা আন্দোলন সংগ্রামে খুবই সম্পৃক্ত ছিলেন, তাদেরই নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে।’
নারী নেতৃত্বের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এবারের আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা প্রশংসনীয়। সুতরাং নারীদের মধ্যে যারা আন্দোলন সংগ্রাম করছে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে নানা ভূমিকা রাখছেন, তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে।’
এদিকে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ছাত্রদলের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়ে আপাতত কোনো আলোচনা নেই। এ বিষয়ে ঢাবি ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটির সঙ্গে আলোচনা শুরু করব। কেন্দ্রীয় কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হবে। তবে ত্যাগী, যোগ্য এবং মেধাবীদের সমন্বয়ে এই কমিটি গঠন করা হবে। বিগত দিনের আন্দোলন সংগ্রামে যারা ভূমিকা রেখেছেন, তাদের সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করা হবে।’