মায়েরা অবাক জল

মা শব্দটি শুনলেই আমার এক ধরনের অপ্রাপ্তির পাশাপাশি এক পৌরাণিক গল্পের কথা মনে পড়ে। মাকে মহিমান্বিত করার গল্প। দুর্গার দুই ছেলের মধ্যে প্রতিযোগিতা কে মাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে? এটা প্রমাণের জন্য সারা পৃথিবী ঘুরে যে আগে মায়ের কাছে পৌঁছাবে, সেই-ই বিজয়ী হবে। কী সে? মাকে ভালোবাসার প্রতিযোগিতায়। তো, তীর-ধনুক নিয়ে কার্তিক মহোদয় ছুটলেন বাহন ময়ূরকে নিয়ে। কার্তিক বিশ্ব-মহাবিশ্ব পরিভ্রমণ করছেন। আর এক ফাঁকে গণেশ বাবাজি বিশাল পেট আর হাতির মাথা নিয়ে মা দুর্গার চার পাশ এক পাক নেচে নেচেই যেন ঘুরে নিলেন। এরপর গণেশ আর দুর্গার অপেক্ষা। কার্তিক ফিরলেন। দেখলেন, গণেশ যেখানে ছিলেন সেখানেই বর্তমান। এরপর বিচারক মা বললেন এত সময় লাগল তোমার? কার্তিকের উত্তর, হ্যাঁ  মা, পুরো পৃথিবী ঘুরে এলাম। কিন্তু গণেশ দাদা কী করল। গণেশ বললেন, মা আমার পৃথিবী। আমি সারা পৃথিবী না ঘুরে মায়ের চারপাশ একবার ঘুরে নিলাম। গণেশ বাবু বিজয়ী। সাধে কি আর তিনি সনাতনীদের কাছে সিদ্ধিদাতা! নিজ সিদ্ধির ব্যাপারেও পাক্কা এক চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। গল্পটা আসলে মাতৃ-মহিমার, মাকে চমৎকার এক গল্পের ভেতর দিয়ে মহিমান্বিত করে তোলা। ভারতীয়রা মাতৃ-বন্দনাকে এক বড় জায়গায় দীর্ঘকাল ধরে ঠাঁই দিয়ে আসছেন। এই যে এত দুর্গাপূজা, লক্ষ্মীপূজা, বাসন্তীপূজা, কালীপূজা, সরস্বতীপূজা, মনসাপূজা, জগদ্ধাত্রী পূজা, মঙ্গলচ-ী পূজা এর সবই তো মাতৃ-বন্দনার ভেতর দিয়ে তার গৌরব ও মহিমাকে স্বীকার করে নেওয়া। আমাদের বহু পুরনো মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে এর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করে চলা। পিতার সার্বিক কর্তৃত্ব সত্ত্বেও মাতৃত্বের জয়গান আর তার মমত্ব-স্নেহ ও ভালোবাসার মহত্ত্ব এখনো শতমুখে গীত। সারা পৃথিবীর কবি-সাহিত্যিকরা মাকে নিয়ে তাদের অজস্র আবেগকে মাতৃ-বন্দনায় উচ্ছ্রিত করেছেন। আমরা অনেকেই জানি, মাকে নিয়ে কবিতা-গল্পের পাশাপাশি বেশ কিছু উপন্যাসও রচিত হয়েছে। সেই উপন্যাসে মায়ের চরিত্রগুলো বহুমুখী বিচ্ছুরণে আলোকোজ্জ্বলা হয়ে আছেন। গল্প-উপন্যাস-কবিতার মায়েরা কিন্তু পৌরাণিক নন, একেবারেই মাটির গন্ধ মেখে নেওয়া বাস্তব জীবনের।

আমাদের মায়েরা ক্রূর বাস্তবের হিংস্রতায় দাঁড়িয়ে, সংসারের সীমাবদ্ধ জলে সীমিত সবুজে দাঁড়িয়েও অনেক বেশি আবেগী। তাদের সিদ্ধান্ত আবেগ-জড়ানো, তাদের ভালোবাসা আবেগ-জড়ানো, সন্তান-সংসারের যাবতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণেও আবেগী তারা। বাস্তবের সঙ্গে শঙ্কাহীন যুদ্ধে যেসব মায়েরা তাদের স্বামীদের পেছন থেকে বরাভয় ও সাহস জুগিয়েছেন, সেই মায়েরাই আবার সামান্য কথায় কেঁদে বুক ভাসিয়েছেন। যে মায়েরা অবলীলায় সন্তানকে যুদ্ধে পাঠিয়েছেন, দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য, সেই মায়েরাই অন্য এক সন্তানের অনাগ্রহের, অসম্মানের অন্নকে তুচ্ছ  করেছেন।

মানুষ বা মানব শব্দটিকে আমরা যেমন চিরপ্রবহমান এক অতিধারণার ভেতর দিয়ে বয়ে নিয়ে চলেছি, আমাদের মায়ের ধারণাও প্রায় অনেকটা সেরকমই প্রবহমান সত্তা। আমার ব্যক্তিগত বিবেচনায়, বাংলার মায়েরা সম্পূর্ণ আলাদা একটা প্রতিমার ধাত্রী। আলাদা। পৃথক। বিস্ময়কর। যোদ্ধ। সাহসিনী। উৎসর্জনে নির্বিকার। সৃজনে আনন্দময়ী। আমার মায়েরা মুহূর্তে বিস্তৃত হয়ে যায় প্রবৃতিতে। শস্য-সন্ধানে, খাদ্য-রক্ষণে, রন্ধনে, পারিবারিক বন্ধনে, পরোপকারে সম্পূর্ণ অনন্যা এক চরিত্রাধিকারিণী। এবার আমার ব্যক্তি মায়ের কথায়। বেচারা ন’বছর বয়সে তার জমিদার পিতামহের বিশাল আঙিনায় পাড়ার পুজোর অনুষ্ঠানে নেচেছিল। কোনো দিন বলেনি তার গুণের কথা। চৌদ্দ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল তার চেয়ে দশ বছর বড়ো এক যুবকের সঙ্গে। আটটি সন্তানের জন্ম দিয়ে ছটিকে মাত্র বাঁচাতে পেরেছে। আমি তার স্বপ্নছেঁড়া প্রথম সন্তান। কিন্তু তার সন্তানের অবস্থা মরমর। অতএব, নিজের মায়ের হাতে সেই প্রথম সন্তানকে তুলে দিতে হলো, যে সন্তানের সঙ্গে তার দূরত্ব হলো বিশ কিলোমিটারের। আসলে, কাব্যিক শোনালেও ওটা ছিল আমার মায়ের ‘পয়েন্ট অব ভিউ’ থেকে মহাজাগতিক দূরত্ব। অবশ্য অন্য কোনো সন্তানের সঙ্গে তার এই বিচ্ছেদের প্রয়োজন হয়নি। বাকিরা মোটামুটি সুস্থতার সঙ্গেই বেড়ে উঠেছে। মায়ের কাছ থেকে প্রথম সন্তানকে ছিন্ন করার বেদনা কীরকম ছিল এ প্রশ্ন মাকে কোনো দিন করা হয়নি। মনে হয়েছিল, এটা ভিন্নতর আবেগের জন্ম দেবে অতীতের কথা ভেবে অথবা গুছিয়ে বলার বিদ্যে ছিল না, এমন চিন্তায় হয়তো এটা এড়িয়ে গেছি।

পিতার ক্ষমতা-অক্ষমতা বিবেচনা-পুনর্বিবেচনা করার তোয়াক্কা না করেই আমার মায়ের মতো আরও বহু বহু মাকে দেখেছি অতিথি আপ্যায়নে নিরলস এ সদাজাগ্রত সীমান্ত প্রহরা দেওয়া সৈনিকের মতো। তারাও তো সংসার-সীমান্তের অতন্দ্র পাহারাদার! পৃথিবীতে এমন মা অদ্যাবধি দেখিনি, যে মা সন্তান গর্বে গর্বিত নন। মায়েরা কিছুতেই তাদের আপন গর্ভের বন্দনকে, মায়াকে প্রাকৃতিক কারণেই বোধ করি কাটিয়ে উঠতে অপারগ, অক্ষম, মনে হয় তাদের ভেতরকার এক রহস্যময় মনোভঙ্গি এই বিজিত অক্ষমতার গৌরবে ধন্য।

মায়ের একটা শাড়ি পরা কিশোর বয়সের ছবি স্বপ্নের মতো আমার হাতে এসে আবার অতি অল্পসময়ের মধ্যে হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল। সেই শোক আমার আজও কাটেনি। কাটবেও না কোনো দিন। শেষ বিকেলের আলোয় ছোট্ট মাটিকে আমার নৃত্যভঙ্গিমায় উড়ে যাওয়া পরী মনে হয়েছিল সেদিন কি আমার মায়ের সেই ছবিতে হাসি দেখেছিলাম? মনে পড়ে না।

আমি সারাজীবন বাইরে বাইরে থেকেছি। মামার বাড়ি, মা গ্রামের শ^শুরবাড়িতে। আমি স্কুল-কলেজ করেছি মামাবাড়ি থেকেই। মাঝখানে কিছুদিন গ্রামের বিখ্যাত এক ঐতিহাসিক স্কুলে পড়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। ওই সময়টুকুতেই মায়ের সঙ্গে থাকার সুযোগ হয়েছিল। কিন্তু তাও সারাদিন স্কুল, বিকেলে খেলার মাঠ, সন্ধ্যায় পড়তে বসা। পরদিন আবার স্কুল ইত্যাদি। তখন রবিবার ছুটির দিন ছিল। ওইদিন দীর্ঘ একটা সময় কাটত বাবার সঙ্গে বাজারে। ওইদিন আমাদের ঈদ-আনন্দ। সবকিছু মা করে চলেছেন রান্নার জন্য আর বাবা তাকে সাহায্য করছেন। এটুকুই এক মহানন্দ। সারা দিন শেষে বিকেলের দিকে নিজের খাবারটুকু খেয়ে নিয়ে এক গাদা থালাবাসন ধোয়া। তখনকার দিনে মেলামাইন ছিল না। কাঁসার থালায়, পরে অ্যালুমিনিয়াম এবং সবশেষে স্টিলে। আর এখন সিরামিক। এই আমাদের জীবন-বৃত্ত।

তবে একটা কথা না বললে অন্যায় হবে, মা চেয়েছেন আর বাবা তার সাধ্যমতো করেননি, এমন ঘটনা নেই। মা, মিষ্টি খুব পছন্দ করতেন, শেষ বয়সে যখন আমাকে পাহারা দিচ্ছেন, ডায়াবেটিস আক্রান্ত, তখনো আমার বাবা প্রস্তুত। মাকে গ্রামের বাড়ি থেকে চট্টগ্রাম শহরে তার বাবার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলো সকালের ট্রেনে পটিয়া থেকে। আমি তো মামার বাড়িতেই। মামা বাড়ি থেকে চলমান চট্টগ্রাম কোর্ট বিলিংয়ের পাদদেশে ‘কর অ্যান্ড কোং’-এ, বাবা-মাসহ মিষ্টি খেতে। বাবা, বিভিন্ন পদের বেশ কিছু মিষ্টির ফরমায়েশ দিলেন। বিশাল এক প্লেটে মিষ্টি এলো। আমারটা আমি সাবাড় করেছি ততক্ষণে। মা তো এত মিষ্টি পছন্দ, কিন্তু দুটোর পর আর মিষ্টি খেতে পারছেন না। বাবা বলছেন, না না, খেতেই হবে, তুমি মিষ্টি খেতে চেয়েছ। এখন না বললে চলবে না। আমার মা আরও একটা মিষ্টির অর্ধেক জোর করে খেল। কিন্তু তার চোখে পানি। আত্মসমর্পণের না অক্ষমতার আজও জানি না। একটা চমচমের দাম তখন মাত্র চার আনা। কর অ্যান্ড কোং চট্টগ্রামের বিখ্যাত মিষ্টি দোকান বলে, আইনজীবীদের এলাকায় বলে, সারা চট্টগ্রামের লোক নানা মামলা-মোকদ্দমায় ভিড় করে বলে বেচাকেনাও বেশ। আর তাদের মিষ্টির স্বাদও একটু অন্যরকম ছিল। ওখান থেকে মাকে নিয়ে যাওয়া হলো টেরিবাজারের একেবারে মুখের জুয়েলারি দোকানাটাতে। সেখানে মাকে এক জোড়া কানের দুল বাবা কিনে উপহার দিয়েছিলেন এবং দোকানের মালিক আধাভরি ওজনের ওই দুই দুলের দাম বাষট্টি টাকা আট আনার বদলে আট আনা ছাড় দিয়ে বাষট্টি টাকা নিয়েছিলেন। স্পষ্ট মনে আছে। আজ ওর দাম কত হবে? সব কিছু বদলে গেছে পুরো পৃথিবী। বাবা ও মা দুজনেই চলে গেছেন অনন্তের পথে। কিন্তু মায়েদের সেই আবহমান বিষয়াদি খুব কি বদলেছে! মনে হয় না আমার।