মা ও মাতৃত্ব

আপডেট : ১২ মে ২০২৪, ০৬:২৪ পিএম

মাতৃত্ব আসলে কী? পৃথিবীর সব সংস্কৃতিতে এবং সব প্রাণীর মধ্যে ‘মা’কে চিহ্নিত করা হয় স্নেহপ্রবণ, আত্মত্যাগী, দরদি এ রকম নানান ধনাত্মক বিশেষণে। খুব কম ব্যতিক্রমকে বাদ দিলে কথাগুলো সত্য। এই মাতৃত্বের বিজ্ঞান, মানুষের বিবর্তন এবং সমাজ ও সংস্কৃতিতে মাতৃত্ব তাই একটি ভিন্ন অভিধায় স্বীকৃত। একটি ব্যক্তিগত ঘটনা বলি খুব ছোটবেলায় মায়ের সঙ্গে নানান আত্মীয় বাড়িতে বেড়াতে যেতাম। আমি পরিবারের চার ভাই, দুই বোনের মধ্যে সবার ছোট। আত্মীয়রা বলতেন, ‘পেট-মোছা’, কেউ বা ‘কোলের ছেলে’। কিন্তু যা আমাকে অবাক করত তা হলো, কোনো কোনো আত্মীয় আমাকে দেখেই দৌড়ে এসে গায়ে চিমটি কেটে বলতেন, ‘ওরে আল্লাহ, এই সেই ছেলে। সত্যি বেঁচে আছে?’। কেন এমন বলে ওরা? একদিন মাকে জিগ্যেস করে জানলাম আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর দিনের কথা। এসব মায়ের কাছে থেকে পরবর্তী সময় বারবার শুনতে শুনতে মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি যেন সবই নিজে চোখে দেখেছি।

আমার বয়স যখন মাত্র নয় দিন, তখন টিটেনাসে আক্রান্ত হয়েছিলাম। টিটেনাস বা ধনুষ্টংকার একটি ভয়ংকর জীবাণুবাহিত রোগ, যা এখনো দুই লাখের মতো শিশুর জীবন কেড়ে নেয় প্রতি বছর। আমার জন্ম হয়েছিল যে প্রত্যন্ত গ্রামে সেখানে হাসপাতাল নয়, ক্লিনিক নয়, আঁতুড়ঘরে জন্ম এবং বাঁশের চলটা দিয়ে নাড়ি কাটা হয়েছিল, যদিও স্যাভলনে ভিজিয়ে। এখান থেকেই টিটেনাসের সূত্রপাত। আমার ঠিক আগের বড় ভাই ছিল যমজ। সেই যমজ যুগলের একজন যার নাম ছিল ‘নয়ন’, টিটেনাস হয়ে মারা গিয়েছিল। গ্রামের দিকে টিটেনাসকে অনেকেই ‘জিনে ধরা’ বা ‘উপড়ি ওঠা’ ইত্যাদি নামে চিহ্নিত করে ঝাড়ফুঁক, ওঝা বা মোল্লা ডেকে চিকিৎসা করে থাকেন।

আমার যখন টিটেনাস হয় আমার মা এবার অন্য কারও কথা শোনেননি। সোজা বড় মামাকে খবর দিয়েছেন। বড় মামা ডাক্তার ছিলেন। কিন্তু খবর পেয়ে আসতে আসতে দেরি। পারিবারিক ডাক্তার নিতাই কাকা এসেছেন কিন্তু সেই সময় টিটেনাসের তেমন কোনো চিকিৎসা ছিল না। এই অবস্থায় মা নিজে সেই আঁতুড়ঘর থেকেই বাড়ির পাশের জঙ্গলে খুঁজে ভেষজ ওষুধ এনে বুকে পিঠে মালিশ করে দিয়েছেন। আমার মা অনেক ভেষজ চিকিৎসা জানতেন। কিন্তু টিটেনাসে শরীরের যে বিষ নিঃসৃত হয়, তা স্নায়ুগুলোকে পঙ্গু করে দেয়, শ্বাস-প্রশ্বাসের মাংসপেশিগুলো নিস্তেজ হয়ে মারা যায় মানুষ। প্রচণ্ড খিঁচুনি দিতে দিতে এক সময় যখন নিস্তেজ হয়েছিলাম, মা তখন আশায় আশায় বসে আছেন কখন বড় মামা আসবেন ‘এটিএস’ ইনজেকশন নিয়ে। সেটা তখন নতুন বাজারে আসা টিটেনাসের চিকিৎসা। কিন্তু পারিবারিক ডাক্তার নিতাই কাকা জানালেন, ‘কোনো আশা নেই। শ্বাস নেই ছেলের। মারা গেছে।’

বাড়ির একজন ছুটল কাফনের কাপড় কিনে আনতে, গোসলের জোগাড়যন্ত্র হলো। এমন সময় বড় মামা এলেন ‘এটিএস’ ইনজেকশন নিয়ে। এসে শুনলেন, মারা গেছে ছেলে। মা বললেন, ‘মারা যদি গিয়ে থাকে তাও ইনজেকশন দাও’। মায়ের মন, আশা ছাড়তে পারে না।

এর পরের কথাগুলো মায়ের কাছে এতবার শোনা যে, মুখস্থ হয়ে গেছে আমার :

‘তোর মামা যখন ইনজেকশন দিল আমি তোর হাত ধইরা ছিলাম। মনে হইল সুইয়ের খোঁচায় আমার হাত খামচে ধরলি। আমি তোর মামাকে কইলাম, ও মরে নাই, ভাইজান। আমি কী আর কবর দিতে দেই? একটার পর একটা ইনজেকশন। চৌদ্দ দিনের মাথায় তুই কাইন্দা উঠলি।’

হ্যাঁ, এ জন্যই আমার আত্মীয়রা কাছে এসে চিমটি কেটে দেখত আমি সত্যিই বেঁচে আছি। আমি বড় হয়েছি, ডাক্তার হয়েছি। টিটেনাস নামের রোগটিকে জীবনের একটি চরিত্র করে নিয়েছি। এখন পরিণত চিকিৎসাবিজ্ঞান, রোগ প্রতিরোধ বিজ্ঞান, চিকিৎসার সঙ্গে সামাজিক সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ বিবেচনা করে ভাবি, আমি সেই দুই লাখ শিশুর একজন যে মরতে মরতে বেঁচে গিয়েছি। এটিএস দিলে টিটেনাসের বিষকে নিষ্ক্রিয় করা যায়, কিন্তু যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করেছিল তা হলো আমার মায়ের সেই ভেষজ ওষুধ। আমি পরে খুঁজে বের করেছি সেই ভেষজের কাজ ছিল মাংসপেশিকে নরম করা, মাসল রিলাক্সজেন্ট। ওই মুহূর্তে সেই মাংসপেশিকে নরম রাখার কারণেই শ্বাস-প্রশ্বাস ক্ষীণতর হলেও বাঁচিয়ে রেখেছিল। তারপর এটিএস, অ্যান্টিবায়োটিক সব কিছু মিলিয়ে বেঁচে ওঠা।

আমার মা ধার্মিক কিন্তু ধর্মান্ধ না। তিনি বলেন, ‘ওই দিন যদি মোল্লা-মুন্সির কথামতো জিনে-ধরার চিকিৎসা করতাম, তাইলে নয়নের মতো তোকেও মরতে হইতো।’

এই ঘটনা আমার জীবনের বিরাট দার্শনিক নির্দেশনা দেয়। এ জন্যই আমি বিজ্ঞানমনস্ক কিন্তু বিজ্ঞানের অনিশ্চয়তাকেও মানি; এ জন্যই আমি ধর্মান্ধ নই, কিন্তু জীবনের অদৃশ্য, অধরাকে মানি; এ জন্যই আমি রোগের চিকিৎসার চেয়েও প্রতিরোধকেই বেশি গুরুত্ব দিই; এ জন্যই মানুষ, মানবিকতা আর মানুষের জীবন আমার কাছে সব কিছুর চেয়ে বড়।

এই ঘটনা আমাকে যেমন চিকিৎসক, চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষক ও গবেষক বানিয়েছে, তেমনি লেখক হিসেবে ‘মাতৃত্ব’ কী তা নিয়ে নানান গভীরতর চিন্তা করতে শিখিয়েছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, কুড়ি লাখ বছর আগে আফ্রিকার জঙ্গলে একদল বানর জাতীয় প্রাণী শিম্পাঞ্জি বা গরিলাদের থেকে অন্য আচরণ করছে শিশুকে লালন-পালন করতে। কী সেই অন্য আচরণ? তা হলো তারা নিজেদের সন্তানকে অন্যদের ধরতে দিচ্ছে বা লালন-পালন করতে দিচ্ছে। এটা একটা মাইলস্টোন মানুষ হওয়ার পথে। এটার সঙ্গে আরেকটা তথ্য যোগ করলে গুরুত্ব বোঝা যায়। যেমন অক্টোপাস বুদ্ধিযুক্ত প্রাণী কিন্তু মা অক্টোপাস বাচ্চাদের টিকে থাকার কৌশল শেখানোর আগেই মারা যায়। অন্যদিকে ‘অরকা’ নামের তিমি মা তাদের শিশুদের বেঁচে থাকার কলাকৌশল শেখাতে পারে। এ কারণে অক্টোপাসের চেয়ে অরকার শিশুদের বেঁচে থাকার চান্স অনেক বেশি।

প্রাণিকুলে মায়ের আত্মত্যাগের সত্য ঘটনা লিখলে আস্ত বই হয়ে যাবে। যেমন- ক্যাসিলিয়ান উভচর প্রাণীর সন্তানদের প্রথম খাবার হলো মায়ের শরীরের চামড়া। যা খেয়ে তারা বাঁচে কিন্তু পরবর্তী সময় মা মারা যায়। আফ্রিকার এক ধরনের মাকড়সার বাচ্চা মাকে মেরে প্রথম খাবার খায়। যা বলতে চাচ্ছি প্রকৃতিতে বেশিরভাগ মা প্রজাতি আত্মত্যাগ করে সন্তানকে বাঁচাতে সাহায্য করে। বাবারও করেন, কিন্তু মা, মায়েদের মতো না। অন্যদিকে মা কি সন্তানকে হত্যা করে না বা বিক্রি করার ঘটনা দেখা যায় না? যায়, কিন্তু সেগুলো নিতান্তই ব্যতিক্রম।

মাতৃত্ব তাই একটি বহুমুখী ধারণা যা সময়, সংস্কৃতি এবং বৈজ্ঞানিক অনুশাসনের সীমানা অতিক্রম করে। মাতৃত্বের চিত্রটি প্রায়ই শক্তি, প্রজ্ঞা এবং নিঃশর্ত ভালোবাসার প্রতীক। ইতিহাস জুড়ে, মায়েদের মর্যাদা এবং উপলব্ধি বিকশিত হয়েছে, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় এবং সামাজিক নিয়ম দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। প্রাচীনকালের ঐশ্বরিক মাতৃদেবী থেকে শুরু করে রেনেসাঁ শিল্পে চিত্রিত আদর্শ মাতৃত্বের ব্যক্তিত্ব পর্যন্ত, মায়েদের ঐতিহাসিক চিত্রায়ণ প্রতিটি যুগের মূল্যবোধ এবং আকাক্সক্ষাকে প্রতিফলিত করে। দার্শনিকভাবে, মাতৃত্ব পরিচয়, নীতিশাস্ত্র এবং প্রেমের প্রকৃতি সম্পর্কে গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করে। বিভিন্ন ঐতিহ্যের দার্শনিকরা মাতৃবন্ধনের তাৎপর্য এবং পিতৃত্বের অন্তর্নিহিত নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে চিন্তা করেছেন। প্লেটোর গুহার রূপকথা থেকে, যেখানে মা আলোকিতকরণ এবং লালন-পালনের উৎসকে প্রতিনিধিত্ব করে, একটি রাজনৈতিক কাজ হিসেবে মাতৃত্বের ওপর সমসাময়িক নারীবাদীর প্রভাব, মাতৃত্বের দার্শনিক অনুসন্ধানগুলো মানব সম্পর্কের জটিলতা এবং নৈতিক বাধ্যবাধকতাগুলোকে গভীরভাবে আবিষ্কার করে।

আমার মা যথার্থ অর্থেই একজন মহীয়সী নারী ছিলেন। আমরা শিক্ষিত হয়েও মাঝেমাঝে তার প্রজ্ঞার কাছে নতজানু হয়েছি। ছোটবেলায় দেখেছি তার বই পড়ার তীব্র নেশা। রাত জেগে বাংলা সাহিত্যের সব বই পড়তেন। সেখান থেকেই রবীন্দ্র, নজরুল, শরৎ, বঙ্কিম, মুজতবা আলী থেকে নীহাররঞ্জন কোনোটাই তাই বাদ পড়েনি আমার ছোটবেলায়। মা অনর্গল গল্প শোনাতেন, মহাভারতের গল্প, ইসলামিক ইতিহাসের কাহিনি। আর কবিতা সব মুখস্থ ছিল। তাকে তিন-চারবার আমেরিকায় নিয়ে এসে থাকার ব্যবস্থা করেছি কিন্তু কোনোদিন থাকেননি। যদি বলতাম, ছেলের কাছেও থাকতে মন চায় না? অমনি দুই বিঘা জমি কবিতা মুখস্থ শুনিয়ে দিতেন। আমিও তার আদর্শে বিশ্ব নাগরিক হয়েছি।

আজ মা দিবস। অথচ আমি মা ছাড়া। মাত্র দুবছর হলো হারিয়েছিল তাকে। মা যে নেই, মাঝে মাঝে আমি ভুলে যাই। আমি প্রায়ই আমার স্ত্রী তৃষ্ণাকে বলি, শোন অমুক দেশে যাচ্ছি মায়ের জন্য ব্যথার ওষুধ আর ভিটামিন কিনে দিও। তৃষ্ণা বুঝতে পারে। কাছে এসে মাথায় হাত রাখে, জড়িয়ে নেয়। তখন মনে পড়ে মা নেই। মা আর মমতা এভাবেই মিশে থাকে চোখের জল হয়ে।

রুডইয়ার্ড কিপলিং বোধহয় বলেছিলেন, ঈশ্বর সবখানে একসঙ্গে থাকতে পারেন না, এ জন্যই মা সৃষ্টি করেছেন। আমি বলি মায়েরাই হয়তো দেবীর মুখ! আমার মা, আমার ছেলেদের মা আর জগতের সব মায়েরা সুখে থাকুক, শান্তিতে থাকুক!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত