স্নেহ ভরা কোল

আপডেট : ১২ মে ২০২৪, ০৬:২৮ পিএম

মা দিবস এলেই মনে পড়ে বছরের বাকি ৩৬৪ দিন আমরা কী রকম অসাড় ব্যস্ততায় ভুলে থাকি আমাদের প্রত্যেকের জীবনের শ্রেষ্ঠতম এই মানবীকে। যিনি এই পৃথিবীতে আনলেন, ডানার নিচে আশ্রয় দিলেন, ভাষা শেখালেন, বাবার রুদ্ররোষে ঝড়ের মুখে বাতি হলেন। কোন খাবারটা খেতে পছন্দ, কোন পোশাকটা পরতে পছন্দ, কোন খেলনাটা খেলতে পছন্দ সন্তানের সঙ্গে মায়ের এমনি এক টেলিপ্যাথিক সম্পর্ক; যিনি সন্তানের চেতন-অবচেতনে বিচরণ করে তার জীবনকে আনন্দে পরিপূর্ণ করেন। দুর্গার মতো দশ হাতে গড়ে তোলেন সন্তানের জন্য এক স্বর্গ।

মা উড়তে শেখান; তারপর ওড়া শেখা হয়ে গেলে; মাকে প্রায় বিস্মৃত হয়, সন্তান। মায়ের জীবনের সবটা জুড়ে থাকে সন্তান; কিন্তু সন্তানের জীবনে ক্যারিয়ার, খ্যাতি, সম্পদ, প্রেম-অপ্রেমের ভিড়ে মায়ের জায়গা হয় ফ্রেমে বাঁধানো একটা স্টিল ফটোগ্রাফিতে অথবা ফোনের ফটোগ্যালারির এক কোনায়।

আমি এইচএসসি পরীক্ষার পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ‘ঘ’ ইউনিটের লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলাম। কিন্তু দ্রুত কোথাও পৌঁছানোর অভিলাষে সেনাবাহিনীর আইএসএসবি পরীক্ষা দিয়ে পাস করেছিলাম। একই দিনে পড়ে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘ ইউনিটের মৌখিক পরীক্ষা আর সেনাবাহিনীর চূড়ান্ত মেডিকেল টেস্ট। মায়ের নিষেধ অমান্য করে আমি চলে গিয়েছিলাম সিএমএইচে মেডিকেল টেস্টের আনুষ্ঠানিকতা সারতে। আম্মা তখন আমার এসএসসি-এইচএসসির সার্টিফিকেট আর নম্বরপত্রের ফাইলটি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে যান আমার পক্ষ থেকে ভাইভা দিতে। ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল ভালো থাকায়, শ্রদ্ধেয় শিক্ষকরা আগ্রহ দেখান। আম্মার অনুরোধে আমাকে ইংরেজি সাহিত্যে ভর্তি করে নেওয়া হয়। পরে আম্মা লৌহমানবীর মতো করে আমার আর্মিতে ঢোকার পরিকল্পনা বানচাল করে ইংরেজি সাহিত্যে পড়তে বাধ্য করেছিলেন। আজ জীবনের আনন্দময় অর্ধশতক পেরিয়ে যাওয়ার পরে পেছনে তাকালে মনে হয়, আম্মা কেবল আমার প্রথম জন্ম নয়; দ্বিতীয় জন্মটিও দিয়েছেন।

মা চিরন্তন এক স্নেহ-মায়ার প্রতীক; পৃথিবীর পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ সব জায়গায় বৃদ্ধা মা ঘরের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে সন্তানের জন্য অপেক্ষা করেন। ঈদ-পূজা-বড়দিনে শুধু একবার সন্তানকে চোখের দেখাটা দেখার অপেক্ষায় মা চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করেন যেন। কখনো কখনো সে অপেক্ষাটাও ম্লান হয়ে যায়; কেবল একটি ফোনে, মা এবার আসতে পারব না।

একবিংশ ভীষণ স্বার্থপর এক শতাব্দী; আত্মকেন্দ্রিক সন্তানের ফাঁপা কোলাহলে এম্পটি নেস্টগুলোতে নিঃসঙ্গ মায়ের বিষন্ন সকাল-দুপুর-রাত্রি, টাইমলেস ল্যান্ডের বিলীন হয়ে যাওয়া সময় ধারণার ট্র্যাজেডি।

মায়ের মানসিক স্বাস্থ্যের কথা একবিংশের কোনো সন্তান কী গভীরভাবে ভাবে; যখন মাকে রেখে আসে বৃদ্ধাশ্রমে! অথচ মা কিন্তু সন্তানের কাছে কোনো কিছু পাওয়ার আশায় তাকে গর্ভধারণ করেন না; পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি কষ্টসাধ্য প্রক্রিয়ার মাঝ দিয়ে সন্তানকে এই পৃথিবীর আলোতে আনেন না। জীবনব্যাপী তার একটিই প্রার্থনা, আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে।

কিষানি মা, সেলাইদিদি মা, স্বশিক্ষিত মা, সুশিক্ষিত মা, মধ্যবিত্ত মা, উচ্চবিত্ত মা; মাতৃত্বের আকাক্সক্ষা পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ এক সাম্যচিন্তা। প্রত্যেক মা তার নিজের সামর্থ্যরে সবটুকু দিয়ে সন্তানের জন্য রচনা করার চেষ্টা করেন একটি কল্যাণ পরিবার।

বাবার আকাক্সক্ষা একটি সফল সন্তান; কিন্তু মায়ের ভালোবাসা সন্তানের সাফল্য-অসাফল্যে একই। এ হচ্ছে স্বর্গের আলোয় গড়া নাড়ির সম্পর্ক।

নারী একটি সুপিরিয়র জেন্ডার। যে কারণে কন্যাসন্তানের মাঝে মায়ের প্রতি ভালোবাসা থাকে মায়ায় গড়া। সোশ্যাল কন্ডিশনিংয়ের কারণে যে মা নিয়মিত বিয়ে ও সংসার করার চাপ দিয়ে কন্যাসন্তানের জীবনকে স্নায়ুচাপে ফেলেছেন; সেই কন্যাটিই মা বৃদ্ধ হলে তার সেবা করে। তাকে বুঝতে চেষ্টা করে; পার্থিব ব্যস্ততায় সপ্তাহে একবার হলেও মায়ের কাছে গিয়ে স্নেহের স্পর্শ দিয়ে; যত্ন দিয়ে তার বিষন্নতার জগৎটিকে খানিক আনন্দে ভরে দেয়।

সোনালি যুগের মায়েদের সুবিধা হচ্ছে তারা নিজেদের মায়ের কাছে সন্তান লালনের ট্র্যাডিশনাল আর্ট রপ্ত করেছিলেন। ফলে খুব সহজ আর সাবলীল ছিল সে সন্তান পরিচর্যার জগৎ। একবিংশের নিও স্টোন এইজে শিক্ষিত ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী মা, ইন্টারনেট যুগের পোস্ট মডার্ন মা অনেক সময় মনে করেন, তার সে যুগের মা আর কী জানেন কী করে সন্তান প্রতিপালন করতে হয়; সব জানে গুগল মা। তাই সে ইউটিউব টিউটোরিয়াল দেখে সন্তান পালন শেখে। থিওরিটিক্যাল নলেজ বাস্তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই লাগসই হয় না। তাই সন্তানের ওপর নানারকম নিরীক্ষা করে অনেক সময় শিব গড়তে বাঁদর গড়া হয়ে যায়।

অনেক সময় কন্যাসন্তান অভিবাসী হলে মাকে দেশ থেকে বিদেশে নিয়ে যায়; আপাতদৃষ্টিতে এটাকে কন্যার নির্দোষ মায়াময় কীর্তি বলে মনে হলেও; অনেক সময় তা হয়ে যায় বৃদ্ধা মাকে গ্লোরিফায়েড ন্যানিতে রূপান্তর। মাকে তার শেকড় উপড়ে তুলে নিয়ে গিয়ে প্রায় নিষ্প্রাণ এক মায়াবৃক্ষে পরিণত করা হয়।

যৌথ পরিবারের ধারণাটি ভেঙে যাওয়ার পর একবিংশের নারী অ্যাপার্টমেন্টে তার সার্বভৌম জীবন রচনায় মেতে ওঠেন। অতীতে যৌথ পরিবারগুলোতে ছেলের বউয়ের প্রতি শাশুড়ির ফ্যাসিস্ট আচরণের মিথ আর জিনগত আশ্লেষে; নতুন প্রজন্মে এক ধরনের মাদার ইন ল এপারথেড লক্ষ্য করা যায়। দরকার হয় তোমার মাকে বঙ্গোপসাগরে ফেলে দিয়ে এসো; তবু তাকে আমার সাম্রাজ্যে রাখা যাবে না; এই ধনুক ভাঙা পণে; বেশির ভাগ ছেলের মা-ই আজ বৃদ্ধাশ্রমে কিংবা এম্পটি নেস্টে একাকী; ক্রম মৃত্যুর অপেক্ষায় লীন।

আবার অনেক পোস্ট মডার্ন মেয়ে চায়, তার সন্তান কেবল নানি বাড়িকেন্দ্রিক হবে, দাদির বাড়িতে সন্তানকে যেতে দেওয়া যাবে না, গেলেও পাহারা দিয়ে রাখে যাতে দাদির মায়ার ছায়া না পড়ে সন্তানের ওপর। এ রকম কুরুক্ষেত্র হয়ে আছে আজকের পোস্ট ট্রুথ এরার সোনালি যুগের মা বনাম নিও স্টোন এইজ মাম্মির প্রতিপক্ষতা।

এর প্রভাব সন্তানদের ওপর পড়ে। যারা সোনালি যুগে মা, নানি, দাদি সবার স্নেহ পেয়ে বড় হয়েছে, তাদের মনোজগৎ আর যারা ইগোর কুরুক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন দ্বীপে বড় হচ্ছে, তাদের মনোজগতে বিশাল তফাত।

মা দিবসে সোশ্যাল মিডিয়াতে কাব্যিক স্টেটাস লিখে, একদিনের জন্য মাকে জড়িয়ে ধরে ম্যা ম্যা করে; রাজনৈতিক নেতাদের মতো জনসেবার অভিনয়ে আসলে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বা এলিয়েনেশনের নিদান হয় না।

খুব গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে বৃদ্ধ মায়ের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য নিয়ে; নাতি-নাতনিকে কী করে নানি-দাদির সাহচর্য ও মায়ার বাতাবরণ দেওয়া যায়; কী করে তাকে সঙ্গে রেখে ‘গ্লোরিফায়েড ন্যানি’ না বানিয়ে বা এম্পটি নেস্ট ও বৃদ্ধাশ্রমে আমৃত্যু কারাদণ্ড না দিয়ে, জন্মদাত্রী হিসেবে সর্বশ্রেষ্ঠ মর্যাদার আসনে আসীন রাখা যায়, তা নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে, ভাবার প্র্যাকটিস করতে হবে।

এবারের মা দিবসটি উৎসর্গ করছি প্যালেস্টাইনে গণহত্যার শিকার মায়েদের জন্য। সভ্যতার কী প্রহসন যে আমাদের চোখের সামনে ইসরায়েল গাজা উপত্যকায় মাতৃ-গণহত্যা চালাচ্ছে, আর আমরা নির্বিকার আমাদের খেলনা জীবনের অপ্রয়োজনীয় কথকতায়। গাজায় হাজার হাজার মায়ের মৃত্যুতে হাজারো সন্তান মতৃহারা হয়েছে; হাজার হাজার মা সন্তানহারা হয়েছেন তাদের সন্তান হত্যার বিষাদসিন্ধুতে। যে পৃথিবীতে মাতৃহন্তাও জাগাতে পারে না ভূ-রাজনীতির ঘুম, সেই রাজনীতি তো কৃতঘ্ন ও ঘাতক মাংসের কারবার।

কবে ঝড় থামবে, কবে পৃথিবী আবার শান্ত হবে; যেদিন মা ও সন্তানের জন্য নিরাপদ এক ধরিত্রী সৃজন হবে! যে পৃথিবী মায়ের জন্য মাইন পাতা ভূমি; যুদ্ধবিমান থেকে ফেলা গণহত্যাকারীর বোমার কারসাজি, সেটা নিশ্চয়ই পৃথিবী নয়, অন্য কোনো গ্রহের দোজখ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত