মেয়াদ ফুরোয় শেষ হয় না কাজ

খুলনার কয়রা উপজেলার হেডকোয়ার্টার-আয়াতখালী জিসি থেকে গিলাবাড়ি জিসি সড়কে ৩৬ মিটার দৈর্ঘ্যরে আরসিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণের কাজ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসএ-জেডটি (জেভি)। ৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ ছিল ২০২২ সালের ২৭ জুলাই থেকে ২০২৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু মেয়াদ ফুরোলেও ভৌত অগ্রগতি একেবারে শূন্য। এখনো শুরু হয়নি কাজ।

শুধু কয়রা উপজেলার এই গার্ডার ব্রিজই নয়; খুলনায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধীনে ৪ উপজেলায় ১০টি সেতু নির্মাণকাজের হাল কমবেশি এমনই। বাস্তবায়নের সময় অনেক আগেই ফুরিয়ে গেলেও শেষ হচ্ছে না কাজ। ফলে দীর্ঘসূত্রতায় ভোগান্তি বাড়ছে মানুষের। একই সঙ্গে হচ্ছে অর্থের অপচয়ও।

এলজিইডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গ্রামের মানুষের যাতায়াত সহজ, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ও সামাজিক উন্নয়নে খুলনা-বাগেরহাট-সাতক্ষীরা জেলায় পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন (কেবিএস) শীর্ষক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। যার আওতায় খুলনার চার উপজেলায় (ডুমুরিয়া, তেরখাদা, কয়রা ও দাকোপ) ১০টি আরসিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেতুগুলো নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ৩৫ কোটি টাকা। কিন্তু প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের মেয়াদ ফুরোলেও ১০টির মধ্যে দুটি সেতুর কাজই এখনো শুরু হয়নি। বাকিগুলোর ভৌত অগ্রগতিও হতাশাজনক।

তেরখাদা উপজেলার অজগরা কবীর বটতলার পাশে বাসুয়াখালী খালে ৭৫০ মিটার চেইনেজে ২৪ মিটার দৈর্ঘ্যরে আরসিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণে ভৌত অগ্রগতি শূন্য। প্রথম দফায় ১ কোটি ৯৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসএএন্ড জেভি কাজটি পায়। প্রকল্পটির বাস্তবায়নের মেয়াদ ছিল ২০২৩ সালের ৩ মে। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কোনো কাজই করেনি। এ অবস্থায় আগের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কার্যাদেশ বাতিল করা হয়। পুনরায় দরপত্র আহ্বান করে ২ কোটি ২৯ লাখ টাকা ব্যয়ে মেসার্স জিয়াউল ট্রেডার্সকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এ দফায় বাস্তবায়নের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৪ সালের ৩ মার্চ থেকে ৩১ ডিসেম্বর। কিন্তু এখনো কাজ শুরুই হয়নি।

২ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে দাকোপের বানিশান্তা ইউপি অফিস-বানিশান্তা বাজার সড়কে ৩০ মিটার দৈর্ঘ্যরে আরসিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণের কাজ পায় মেসার্স ইসলাম ব্রাদার্স। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মেয়াদ ছিল ২০২১ সালের ২০ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ১৯ অক্টোবর। মেয়াদ শেষে ভৌত অগ্রগতি মাত্র ৪০ ভাগ।

২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয়ে দাকোপের লাউডোব ইউপি অফিস-হরিণটানা সেতু-বুড়ির ডাবুর চৌমুহনী বাজার সড়কে চেইনেজে ৩০ মিটার দৈর্ঘ্যরে আরসিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণেও অগ্রগতি ৪৫ ভাগ। কাজটি পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ফয়সাল ট্রেডার্স। বাস্তবায়নের মেয়াদ ছিল ২০২১ সালের ১৩ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৭ মার্চ।

২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা ব্যয়ে দাকোপের কামিনবাসিয়া-যশোবন্ধুর বাড়ি থেকে নিশিখালী সড়কে তেঁতুলতলা খালের ওপর ১০ মিটার দৈর্ঘ্যরে আরসিসি গার্ডার ব্রিজ এবং কামিনবাসিয়া-যশোবন্ধুর বাড়ি থেকে নিশিখালী সড়কে ভাইয়ের খালের ওপর ১২ মিটার দৈর্ঘ্যরে আরসিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণের কাজ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান টিএমএন্ডউয়াইএকে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মেয়াদ ছিল ২০২৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। মেয়াদ শেষ হলেও কাজের অগ্রগতি ছিল শূন্য। তাই ফের দরপত্র আহ্বান করে ২০২৪ সালের ৩০ জুন মেয়াদে মোহাম্মদ ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্সকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এখন ভৌত অগ্রগতি ২৫ ভাগ।

৪ কোটি ৮১ লাখ টাকা ব্যয়ে ডুমুরিয়ার চিংড়া-ওয়েস্টপাড়া সড়কে (ট্রলার ঘাটসংলগ্ন ভদ্রা নদীতে) ৪০০ মিটার চেইনেজে ৫৭ মিটার আরসিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ করা হচ্ছে। কাজটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মো. মাহফুজ খান লিমিটেড। বাস্তবায়নের মেয়াদ ছিল ২০২১ সালের ২০ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ১৯ অক্টোবর। মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও ভৌত অগ্রগতি মাত্র ৬৫ ভাগ।

৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ডুমুরিয়ার কুলবাড়িয়া ইউজেডআর-বাগাছড়া সড়কে ৫৬০ মিটার চেইনেজে ৪৫ মিটার দৈর্ঘ্যরে আরসিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণের কাজ পায় একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মো. মাহফুজ খান লিমিটেড। বাস্তবায়নের মেয়াদ ছিল ২০২১ সালের ২০ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ১৯ অক্টোবর। কিন্তু নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলেও কাজের অগ্রগতি মাত্র ৫০ ভাগ।

২ কোটি ৯১ লাখ টাকা ব্যয়ে একই উপজেলার রায়েরমোহল-আলাইপুর সড়কে ৫০০ কিলোমিটার চেইনেজে ৩৯ মিটার দৈর্ঘ্যরে আরসিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মিত হচ্ছে। কাজ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মো. মাহফুজ খান লিমিটেড। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মেয়াদ ছিল ২০২১ সালের ২০ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ১৯ অক্টোবর। মেয়াদ শেষে কাজের অগ্রগতি মাত্র ৪০ ভাগ।

একই উপজেলার হাসানপুর সড়ক ভায়া অ্যাডভোকেট কামরুল হাসান সড়কে ৩৯ মিটার দৈর্ঘ্যরে আরসিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণকাজে অগ্রগতি ৯০ ভাগ। ৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয়ে কাজটি করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এমএফটি অ্যান্ড এমবিবি (জেভি)। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মেয়াদ ছিল ২০২১ সালের ২০ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ১৯ অক্টোবর।

২ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ব্যয়ে তেঁতুলডাঙ্গা শ্মশান সড়কে ৪৫০ মিটার চেইনেজে ৩৩ মিটার দৈর্ঘ্যরে আরসিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণের কাজ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইসলাম ব্রাদার্স। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মেয়াদ ছিল ২০২১ সালের ২০ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ১৯ অক্টোবর। মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও কাজের অগ্রগতি মাত্র ৩০ ভাগ।

সরেজমিনে দেখা যায়, কুলবাড়িয়াসহ কয়েকটি সেতুর নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া কোনো কোনো নির্মাণাধীন সেতুর পাশে রড ও বালু ফেলে রাখা হয়েছে। আর পাইলিংয়ের রডে ধরেছে মরিচা।

শোভনা গ্রামের বাসিন্দা ওহাব সরদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঠিকাদারের লোকজন ইচ্ছেমতো কাজ করে। মনে চাইলে একটু কাজ করে চলে যায়। অনেক দিন আর কোনো খোঁজ থাকে না। এভাবে ধীর গতিতে কাজ হচ্ছে। ঠিকাদাররা প্রভাবশালী হওয়ায় এলাকার মানুষ ভয়ে কিছু বলতে সাহস পায় না।’

কাঁঠালতলার বাসিন্দা শেখ আব্দুস সালাম বলেন, ‘ঠিকাদারের লোকজন প্রথমদিকে কুলবাড়িয়া খালের দুই পাশে পাইলিং করে রেখে দেয়। পরে বছর পার হয়ে গেলেও আর কাজ করেনি তারা। ফলে মানুষের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে খুলনা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী এ কে এম আনিছুজ্জামান বলেন, ‘প্রকল্প বাস্তবায়নে তহবিলের কিছুটা সমস্যা দেখা দেয়। সেই কারণে কিছু ঠিকাদার কাজ ফেলে রাখে। অন্যদিকে কিছু ঠিকাদার কাজ পেয়ে অন্য ঠিকাদারের কাছে কাজ বিক্রি করে দেয়। বিক্রি করা কাজ বাস্তবায়ন নিয়েও জটিলতায় পড়তে হয়েছে। তবে এখন তহবিলের সেই সংকট নেই। বাস্তবায়নের মেয়াদ বৃদ্ধিরও চেষ্টা করা হচ্ছে। বাড়তি মেয়াদে ঠিকাদারদের কাজ শেষ করতে তাগাদা দেওয়া হবে।’

তবে নির্মাণাধীন এসব সেতুর কাজ তদারকি সঠিকভাবে হয়নি বলে অভিযোগ করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) খুলনার সম্পাদক কুদরত-ই-খুদা। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংশ্লিষ্টদের যথেষ্ট গাফিলতির কারণেই এমন দশা হয়েছে। এতে জনগণের ভোগান্তি হচ্ছে। সেই সঙ্গে অর্থেরও অপচয় হচ্ছে। তাই সরকারের উচিত জড়িত সবাইকেই জবাবদিহির মুখোমুখি করা।’