বিশ্ব জুড়ে প্রবল আপত্তি, দেশের ভেতরে তীব্র প্রতিবাদ উপেক্ষা করেই গাজার রাফাহ শহরে হামলা জোরদার করেছে ইসরায়েল। গতকাল রবিবার থেকে বাড়িয়েছে হামলার ব্যাপ্তিও। এদিন উত্তর গাজার জাবালিয়া থেকে সেখানকার বাসিন্দাদের সরে যেতে বলেছে ইসরায়েল।
এদিকে গতকাল গাজার বিভিন্ন অংশে ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছে প্রায় ১০০ জন। সব মিলিয়ে গত ৭ অক্টোবরের পর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি অভিযানে গাজায় নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা ৩৫ হাজার ছাড়িয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গতকাল রবিবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সেখানে ইসরায়েলি হামলায় নিহতের সংখ্যা পৌঁছে গেছে ৩৫ হাজার ৩৪ জনে। আর আহত মানুষের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৭৮ হাজার ৭০০ জন।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা জানাচ্ছে, গত সোমবার থেকে গাজার মিসর সীমান্তবর্তী নগরী রাফায় আকাশ হামলা শুরু করে ইসরায়েল। সাত মাসের বেশি সময় ধরে চলা গাজা যুদ্ধে ছোট্ট এই ভূখণ্ডটির নানা প্রান্ত থেকে প্রাণ বাঁচাতে ১০ লাখের বেশি ফিলিস্তিনি রাফায় আশ্রয় নিয়েছে। ইসরায়েলের নির্দেশে গত সোমবার থেকে তাদের এখন রাফাও ছাড়তে হচ্ছে।
এর মধ্যে ইসরায়েলি বাহিনী গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় নগরী রাফার আরও কিছু এলাকা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। শনিবার ওই নির্দেশ দিয়ে তারা ফিলিস্তিনিদের আল-মাওয়াসির বর্ধিত মানবিক এলাকায় চলে যেতে বলেছে। ইসরায়েলি বাহিনী নতুন করে রাফার যেসব এলাকা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরে যেতে বলেছে, তার মধ্যে নগরীর কেন্দ্রস্থলও রয়েছে। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর একজন মুখপাত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স এ এক পোস্টে গাজার উত্তরাঞ্চলের জাবালিয়া এবং আশপাশের আরও ১১টি এলাকার বাসিন্দা এবং আশ্রয় গ্রহণকারীদের দ্রুত গাজা সিটির পশ্চিম দিকে চলে যাওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন।
গাজার মধ্যাঞ্চলের ছোট্ট শহর আল-জাওয়াইদা। যেখানে গত কয়েক দিনে গাজার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ফিলিস্তিনিদের ঢল নেমেছে। সেখানকার বাসিন্দারা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, ইসরায়েলি বাহিনী নতুন করে রাফার যেসব এলাকা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরে যেতে বলেছে তার মধ্যে নগরীর কেন্দ্রস্থলও রয়েছে। সেখানে খুবই কঠিন পরিস্থিতি বিরাজ করছে, আতঙ্কিত লোকজন নিজেদের বাড়িঘর ছাড়ছে।
রাফাহ অভিযানের বিষয়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী থেকে বলা হয়েছে, তারা রাফার পূর্বাঞ্চলে এবং রাফাহ ক্রসিংয়ের গাজা অংশে হামাস যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে তাদের সক্রিয় অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
রাফায় ইসরায়েল সর্বাত্মক অভিযান শুরু করলে সেখানে দুর্দশাগ্রস্ত ওই মানুষগুলোর ওপর আরও বড় বিপর্যয় নেমে আসবে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা। এমনকি ইসরায়েলের সবচেয়ে প্রভাবশালী মিত্র যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরকারকে রাফায় অভিযান না চালাতে চাপ দিচ্ছে। জো বাইডেন বলেছেন, যদি ইসরায়েল ওয়াশিংটনের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে রাফায় স্থল অভিযান চালায় তবে যুক্তরাষ্ট্র দেশটিতে অস্ত্রের চালান স্থগিত করবে।
কিন্তু ইসরায়েল কোনো চাপ বা হুঁশিয়ারিতে দমতে রাজি নয়। তারা রাফায় সর্বাত্মক অভিযানের বিষয়ে এখনো নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে। তারা বলেছে, হাজারো হামাস যোদ্ধা রাফায় অবস্থান নিয়েছে। তাই রাফাহ অভিযান ছাড়া গাজায় তাদের লক্ষ্য পূরণ অসম্ভব।
এদিকে গাজায় হামাসের হাতে থাকা বাকি জিম্মিদের মুক্ত করে আনার দাবিতে শনিবার ইসরায়েলের রাজধানী তেল আবিবের সড়কে নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন হাজারো মানুষ। তারা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরকারের কাছে জিম্মিদের মুক্ত করে আনতে আরও বেশ কিছু করার দাবি জানিয়েছেন। শনিবারের ওই বিক্ষোভে জিম্মিদের ছবি হাতে তাদের স্বজনরাও অংশ নেন। তাদের একজন নামা উইনবার্গ। তার কাজিন ইটাই সভিরস্কিকে গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েল থেকে জিম্মি করে নিয়ে যায় হামাস।
জিম্মিদের বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, হামাস যদি আজই জিম্মিদের মুক্তি দেয়, তাহলে আগামীকালই গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা সম্ভব। গত শনিবার সিয়াটলে নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহে গিয়ে এমন মন্তব্য করেন তিনি। এর আগে শুক্রবারের বিভিন্ন কর্মসূচিতে গাজায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে করা প্রশ্ন এড়িয়ে যান মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বাইডেন বলেন, ইসরায়েল বলেছে, যুদ্ধবিরতি নির্ভর করছে হামাসের ওপরে। তারা যদি চায়, তাহলে আগামীকালই যুদ্ধবিরতি সম্ভব। তাছাড়া জিম্মিরা মুক্তি পেলে ইসরায়েল এই সংঘাতের সমাপ্তিও টানতে পারে।
ইসরায়েলের ধারণা, হামাসের কাছে এখনো ১২৮ জন জিম্মি রয়ে গেছেন ও তাদের মধ্যে কয়েকজন মারাও গেছেন। দ্য টাইমস অব ইসরায়েল বলছে, তিন জিম্মিকে জীবিত ও ১২ জিম্মির মরদেহ উদ্ধার করেছেন ইসরায়েলি সেনারা। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর দাবি, মারা যাওয়া জিম্মিদের মধ্যে তিনজন ‘ভুলবশত’ সামরিক বাহিনীর অভিযানে নিহত হয়েছেন।
আইডিএফ নতুন গোয়েন্দা তথ্য ও গাজায় পাঠানো সেনাদের প্রাপ্ত তথ্যের বরাত দিয়ে টাইমস অব ইসরায়েলে জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ৩৬ জন জিম্মি মারা গেছেন। আর অক্টোবর থেকে আরও একজন নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত। বাকি জিম্মিদের কপালে কী আছে, তা এখনো অজানা।
এদিকে রাফাহ ক্রসিং দিয়ে ত্রাণ প্রবেশে ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয়ে রাজি নয় বলে জানিয়েছে মিসর। এতদিন ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণের বাইরে একমাত্র মিসরের সঙ্গে রাফাহ ক্রসিং দিয়ে বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পেত গাজার ফিলিস্তিনিরা। গত মঙ্গলবার সেই রাফাহ ক্রসিংয়ের গাজা অংশের দখল নিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। সেখান দিয়ে গাজায় ত্রাণ প্রবেশও বন্ধ করে দিয়েছে তারা। ইসরায়েলি বাহিনী এই ক্রসিংয়ের দখল নেওয়াকে ‘অগ্রহণযোগ্য উত্তেজনা বৃদ্ধি’ বলে বর্ণনা করেছে মিসর। দেশটির সরকার এখন রাফাহ ক্রসিং দিয়ে গাজায় ত্রাণ প্রবেশে ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় স্থাপনে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। মিসরের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন স্টেশন আল কোয়াহেরাতে একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এ খবর প্রকাশ করা হয়েছে।
জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, গাজার দক্ষিণের দুই গুরুত্বপূর্ণ ক্রসিং রাফাহ এবং কেরেম শালম দিয়ে ত্রাণ প্রবেশ না করতে পারার মারাত্মক প্রভাব পড়বে ছোট্ট ওই ভূখণ্ডটিতে গাদাগাদি করে থাকা ২৩ লাখ ফিলিস্তিনির ওপর। কারণ, বেঁচে থাকার জন্য খুব সামান্য উপাদানই তাদের হাতে অবশিষ্ট আছে। মিসরে রেড ক্রিসেন্টের সূত্রে বলা হয়েছে, গাজায় ত্রাণ প্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।