শ্রদ্ধা ভালোবাসায় হায়দার আকবর খান রনোকে বিদায়

দলমত-নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা আর রাষ্ট্রীয় সম্মানে চিরবিদায় নিলেন মার্কসবাদী তাত্ত্বিক বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার আকবর খান রনো। গতকাল সোমবার বিকেলে রাজধানীর বনানী কবরস্থানে বাবা, মা ও ছোট ভাইয়ের পাশে তাকে শায়িত করা হয়।

এর আগে সকাল ১০টায় হিমঘর থেকে হায়দার আকবর খান রনোর মরদেহ রাজধানীর পুরানা পল্টনে সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের মুক্তি ভবনে আনা হয়। সেখানে দলের পক্ষ থেকে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। এ সময় দলটির সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা শ্রদ্ধা জানান।

এ সময় সিপিবি সভাপতি মোহাম্মদ শাহ আলম বলেন, ‘ষাটের দশকের কাঁধে ভর করে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন হায়দার আকবর খান রনো। ষাটের দশকের প্রজন্ম একে একে সবাই চলে যাচ্ছে। আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, ৬২ শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধসহ সব লড়াইয়ে হায়দার আকবর খান রনোর অসাধারণ অবদান রয়েছে। হায়দার আকবর খান রনো যেই মতাদর্শে বিশ্বাস করতেন, সেই আদর্শ অবিনাশী। তার যে লড়াই তা আজ দুনিয়া জুড়ে চলছে। তার আদর্শ ধারণ করে এই পতাকা আমরা এগিয়ে নিয়ে যাব।’

মুক্তি ভবনে শ্রদ্ধা জানানো শেষে একটি শোক মিছিল নিয়ে মরদেহ বেলা সাড়ে ১১টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। ঢাকা জেলা প্রশাসকের পক্ষে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এ কে এম হেদায়েতুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশের একটি চৌকস দল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে গার্ড অব অনার দেয়। এ সময় বিউগলে বাজানো হয় করুণ সুর।

এরপর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সাংস্কৃতিক সংগঠনে নেতাকর্মীরা একে একে হায়দার আকবর খান রনোর কফিনে শ্রদ্ধা জানান। এ সময় আওয়ামী লীগ, বিএনপি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, বাসদ, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর), গণতন্ত্রী পার্টি, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণফোরাম, গণসংহতি আন্দোলন, ঐক্য ন্যাপ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টিসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাবিদ এবং পেশাজীবী নেতারাও শেষবারের মতো বিদায় জানাতে আসেন। এ সময় ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়।

শ্রদ্ধা শেষে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, হায়দার আকবর খান রনো শুধু একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তিনি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের মধ্যেও একজন ছিলেন। তিনি ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর ডাকে যুদ্ধ করেছিলেন। তিনি সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন এ দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য। হায়দার আকবর খান রনোরা যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা বাস্তবায়নের পথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাজ করে যাচ্ছেন। দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, হায়দার আকবর খান রনো সারাজীবন আদর্শের প্রতি অবিচল থেকে মানুষের মুক্তির জন্য কাজ করেছেন। তার চলে যাওয়া আদর্শবাদী রাজনীতিতে বিরাট শূন্যতা সৃষ্টি করবে। তিনি যে বাংলাদেশকে দেখতে চেয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তিনি তা দেখে যেতে পারেননি। 

বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘কমরেড হায়দার আকবর খান রনোর নাম ইতিহাসে অক্ষয় হয়ে থাকবে। প্রতিটি সংগ্রামে তিনি আপসহীন লড়াই করেছেন। তিনি দেশ, জাতি ও জনগণের স্বার্থরক্ষা ও জনগণের ভবিষ্যৎ রচনার জন্য চেষ্টা করেছেন। তিনি আমাদের আদর্শের প্রতীক হয়ে থাকবেন।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, হায়দার আকবর খান রনো আগাগোড়া বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি কোনো দিন আপস করেননি, কখনো বিচ্যুত হননি। তিনি মার্কসবাদী-লেলিনবাদী ছিলেন। ওই আদর্শের জন্য তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন। রাজনীতির ক্ষেত্রে কোনো সুবিধাবাদিতা তার চরিত্রের ধারে-কাছেও আসতে পারেনি। তিনি কৈশোরে যেভাবে সংগ্রাম শুরু করেছিলেন, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন।

জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, যখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করার চেষ্টা করছি, তখন অনেকে বিভ্রান্তিতে ভুগছেন। রনো ভাই থাকলে ঐক্যের ধারাটা আবার তৈরি করা যেত।