অনেক প্রত্যাশা জাগিয়ে, ঢাকঢোল পিটিয়ে দেশের সব নাগরিককে পেনশন সুবিধার অন্তর্ভুক্ত বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালু হয় গত বছরের ১৭ আগস্ট। ওইদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পেনশন স্কিমের উদ্বোধন করেন। এই স্কিম চালুর বেশ ভালোই সাড়া মিলেছিল। যারা মাসিক ৫০০ টাকা জমাবেন, তাদের জন্য শুরু থেকেই সরকারের আরও ৫০০ টাকার ভর্তুকি ঘোষণা করা হয়। সব মিলিয়ে সবার জন্যই নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে বাড়তি কয়েকগুণ মুনাফার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। সরকারের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, সর্বজনীন পেনশন খাতে জমা হওয়া অর্থ যাবে লাভজনক বিনিয়োগে, তা থেকে প্রাপ্ত মুনাফা জমা হবে স্কিমের খাতায়। আর পেনশনের জন্য নির্ধারিত চাঁদা বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য করে কর রেয়াত পাওয়ার যোগ্য হবেন এবং মাসিক পেনশন বাবদ প্রাপ্ত অর্থ আয়কর মুক্ত থাকবে, যা সর্বজনীন পেনশন আইনেও উল্লেখ করা হয়।
শুরুতে বেসরকারি চাকরিজীবী, স্বকর্ম বা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের নিয়োজিত কর্মী, স্বল্প আয়ের মানুষ এবং প্রবাসীদের অংশ নেওয়ার সুযোগ রেখে চারটি আলাদা স্কিমের ঘোষণা দেওয়া হয়। স্কিমগুলোতে মোট ১০ কোটি মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য নেয় জাতীয় পেনশন কর্র্তৃপক্ষ। যদিও এই পেনশন স্কিম জনমনে আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়। স্কিম চালুর পর আট মাসে মাত্র ৪০ হাজার মানুষ রেজিস্ট্রেশন করেছে। এই পেনশন স্কিম সব মহলে প্রশংসিত হলেও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো এ নিয়ে আপত্তি তোলে। গোল বেধেছে সব স্বশাসিত, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, সংবিধিবদ্ধ বা সমজাতীয় সংস্থা এবং তাদের অধীন অঙ্গ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় ‘প্রত্যয় স্কিম’ নামে নতুন স্কিম চালু করার ঘোষণায়। আগামী ১ জুলাই থেকে এসব প্রতিষ্ঠানে নতুন যোগদান করা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য এই স্কিমটি বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত এক প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পরই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রতিবাদী হয়ে ওঠে।
‘প্রত্যয় স্কিম’ সম্পর্কে বলা হয়েছে, খুব কম সংখ্যক স্বশাসিত, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত বা ওই জাতীয় প্রতিষ্ঠানে পেনশন স্কিম চালু রয়েছে। এ ধরনের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মচারীরা আনুতোষিক স্কিমের আওতাভুক্ত এবং তাদের জন্য সিপিএফ ব্যবস্থা প্রযোজ্য। তারা চাকরির পরে অবসর সুবিধা হিসেবে এককালীন টাকা পেলেও মাসিক পেনশন পান না। তাই তারা আর্থিক সমস্যার মুখে পড়েন। তাদের অবসরোত্তর জীবনের আর্থিক ও সামাজিক সুরক্ষা দিতে বিদ্যমান ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে ‘প্রত্যয় স্কিম’ প্রবর্তন করা হয়েছে। প্রত্যয় স্কিমে অংশগ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান তার কর্মীদের মূল বেতনের ১০ শতাংশ বা সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা, যেটা কম হয় তা বেতন থেকে কাটতে পারবে। যত টাকা কাটা হবে ঠিক সেই পরিমাণ টাকা দিতে হবে ওই সংস্থাকে। এই টাকা ওই প্রতিষ্ঠান জাতীয় পেনশন কর্র্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত সেই কর্মচারীর ‘কর্পাস’ হিসাবে জমা করবে। এতে তাদের জন্য পেনশন ফান্ড গঠিত হবে। তা লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করে পাওয়া মুনাফা এবং ‘চাঁদা’ হিসেবে জমা অর্থের ভিত্তিতে পেনশন প্রদান করা হবে। অবসরগ্রহণ করার পরে ওই কর্মীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সেই টাকা প্রতি মাসে জমা হবে। ‘প্রত্যয় স্কিমের’ বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বিভিন্ন সমিতি। তাদের যুক্তি, এই স্কিম সর্বজনীন হলে সেটি সবার জন্যই হওয়া উচিত। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাইরে রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্ত করা হলে এই ব্যবস্থা বৈষম্য উসকে দেবে। তাদের শঙ্কা, এই স্কিম কার্যকর হলে আগামীতে যোগ দেবেন এমন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আর্থিক সুবিধা কমে যাবে। শুধু তাই নয়, অবসরকালীন নিশ্চয়তা একই রকম না থাকলে আগামীতে মেধাবীরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় আসতে নিরুৎসাহিত হবেন। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই নন, বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার প্রতিনিধিরাও প্রত্যয় স্কিমের সমালোচনা করছেন। তাদের শঙ্কা, অবসরের পর এককালীন আর্থিক সুবিধা না মিললে এ খাতের ভবিষ্যৎ কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
এই স্কিমের বিরোধিতাকারীদের বক্তব্যে যুক্তি আছে। জীবনে কেউই আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে চায় না। আর তা যদি হয় সরকারি নীতির কারণে, তাহলে মানুষের ক্ষুব্ধ হওয়াটাই স্বাভাবিক। আসলে এই স্কিমের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, এটি নামে ‘সর্বজনীন’ হলেও আদতে ‘সর্বজনীন’ নয়। সরকারের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র ও বিচার বিভাগকে এই প্রক্রিয়ার বাইরে রেখে একে ‘সর্বজনীন’ বলার সুযোগ নেই। স্কিমটি যদি সত্যিই সর্বজনীন করতে হয়, সবার আগে সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র ও বিচার বিভাগকেও এর আওতায় আনতে হবে। তা না হলে তড়িঘড়ি করে জারি করা অন্যায্য ও বৈষম্যমূলক স্কিম নিয়ে সমালোচনা-প্রতিবাদ হবেই। যেখানে একটি কার্যকর ও সন্তোষজনক পেনশন স্কিম বিদ্যমান, সেখানে নতুন স্কিম চালু করা কতটা যুক্তিযুক্ত, সে প্রশ্নও রয়েছে। প্রজ্ঞাপন মতে, ১ জুলাই থেকে ওইসব প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপ্রাপ্তরা নতুন স্কিমে অন্তর্ভুক্ত হলে পুরনোদের সঙ্গে তাদের সুবিধাগত পার্থক্য ও বৈষম্য তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংস্থাগুলোকে আগামী ৩০ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত দুই ধরনের পেনশন বিধি অনুসরণ করতে হবে। একই ব্যক্তি একটি সংস্থায় নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চাকরি করার পর পদোন্নতির পরিবর্তে বিজ্ঞাপিত শূন্য পদে সরাসরি নিয়োগ লাভ করতে পারেন। তখন তার পেনশন ব্যবস্থাপনা/হিসাব-নিকাশ কীভাবে হবে? এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর নেই। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, পরিবর্তিত আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় সবারই চাহিদার বিস্তৃতি ঘটছে। শিক্ষকরাও এর বাইরে নন। সামাজিক অবস্থান ও পদমর্যাদার সঙ্গে তাদের আর্থিক সক্ষমতার বিস্তর ফারাক। আমাদের দেশে সরকারি কর্মকর্তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে গ্রেড বিবেচনায় অনেক জুনিয়র হওয়া সত্ত্বেও গাড়ির সুবিধা ভোগ করেন। গাড়ি ক্রয়ের জন্য প্রায় বিনা সুদে লোন এবং ওই গাড়ি ব্যবহারের জন্য মাসিক ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত পরিচালনা ব্যয় দেওয়া হয়। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ে সিলেকশন গ্রেডের প্রফেসর, ডিন, বিভাগীয় প্রধান কারও জন্যই আলাদা গাড়ি বরাদ্দ নেই। গাড়ি কেনার জন্য লোন এবং পরিচালনা ব্যয় বরাদ্দও নেই। সরকারি চাকরিজীবীর তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা আর্থিক ও পেশাগত সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছেন। নতুন পেনশন স্কিমে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে যদি তাদের আরেক ধাপ পিছিয়ে দেওয়া হয়, সেটা গ্রহণযোগ্য হবে না।
শুরুতে এই স্কিমটি ঐচ্ছিক ছিল। বলা হয়েছিল, আট-দশ বছর পর প্রয়োজনে বাধ্যতামূলক করা হবে। কিন্তু হুট করে নতুন একটি স্কিম যুক্ত করে তা বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হলো কেন? মনে রাখা দরকার যে, জোর করে কাউকে দিয়ে কোনো কাজ করানো যায় না। সেটা উচিতও নয়। আমাদের সংবিধানে প্রতিটি মানুষের চিন্তা ও কর্মের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। সমাজের কল্যাণের জন্য রাষ্ট্র নানা উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু কারও ওপর জোর-জবরদস্তি করতে পারে না। গায়ের জোরে কোনো কিছু প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে তাতে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। জোরজবরদস্তি করে অন্যের ওপর কোনো নীতি এমনকি ধর্মাদর্শও চাপিয়ে দেওয়াটা এক ধরনের জুলুমবাজি। রাষ্ট্রের কাছে যা প্রত্যাশিত নয়। সর্বজনীন পেনশন স্কিম যে একটা ভালো উদ্যোগ তাতে সন্দেহ নেই। যেহেতু এটি একটি নতুন ধারণা, মানুষকে সময় দিতে হবে বিষয়টি বুঝতে। এ জন্য প্রচার চালাতে হবে। জনমনে এর সুবিধাগুলো তুলে ধরতে হবে। এই পেনশন স্কিম নিয়ে আস্থার মনোভাব সৃষ্টি করতে হবে। তখন জনগণ এতে স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণ করবে। কারণ পেনশন নাগরিকদের জন্য এক অনন্য অধিকার, নাগরিকদের প্রতি সরকারের আর্থ-সামাজিক দায়বদ্ধতা পালনের এক গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা। পেনশন কেবল কাজের পুরস্কার নয়, তা হলো আর্থ-সামাজিক ন্যায়। এই ন্যায় মানুষকে স্বেচ্ছায় গ্রহণ করার সুযোগ দিতে হবে। ‘বাধ্যতামূলক’ ফরমান জারি করে বা চাপিয়ে দিয়ে নয়।
লেখক: কলাম লেখক
chiros234@gmail.com