আগ্নেয়াস্ত্র গ্রেনেড উদ্ধার, আরসার ২ সদস্য আটক

কক্সবাজারের উখিয়ার গহিন পাহাড় থেকে বেশ কিছু অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে র‌্যাব। আটক করা হয়েছে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) দুই সদস্যকে।

গতকাল বুধবার ভোররাত থেকে সকাল পর্যন্ত উপজেলার রাজাপালং ইউনিয়নের কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২০ এক্সটেনশনের পশ্চিমের লাল পাহাড়ে গড়ে ওঠা আরসার আস্তানা থেকে এসব উদ্ধার করা হয়।

র‌্যাব বলছে, উখিয়ায় আরসার আস্তানায় এই প্রথম উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন হ্যান্ড গ্রেনেড উদ্ধার করা হয়েছে। অস্ত্র ও গোলাবারুদের মধ্যে রয়েছে, ৫টি গ্রেনেড, ৩টি রাইফেল গ্রেনেড, ১০টি দেশীয় তৈরি হ্যান্ড গ্রেনেড, ১৩টি ককটেল, ১টি বিদেশি রিভলবার, ৯ রাউন্ড নাইন এমএম পিস্তলের গুলি, ১টি এলজি ও ৩টি ১২ বোর কার্তুজ। দুপুর ১টার দিকে আদালতের নির্দেশে সেনাবাহিনীর একটি বম্ব ডিস্পোজাল টিম গ্রেনেড ও ককটেল নিষ্ক্রিয় করেছে।

গ্রেপ্তার করা দুই আরসা সদস্য হলেন উখিয়ার ১৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক ও কমান্ডার মো. শাহনুর ওরফে মাস্টার সলিম (৩৮) এবং বালুখালী ৮/ডব্লিউ রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ব্লক-এ/২৩-এর মো. রিয়াজ।

র‌্যাব সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মোহাম্মদ আরাফাত ইসলাম গতকাল দুপুরে উখিয়ার লাল পাহাড়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানিয়েছেন।

সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, শাহনুর ওরফে মাস্টার সলিম ২০১৭ সাল থেকে উখিয়ার ওই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাস করছেন। তিনি মিয়ানমার থাকাকালে আরসার সেখানকার জোন কমান্ডারের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। এ ছাড়া আরসাপ্রধান আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনির দেহরক্ষী হিসেবে দুই মাস দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশে আসার পর মৌলভি আকিজের মাধ্যমে আবার আরসায় যোগ দেন তিনি। রিয়াজও ২০১৭ সালে বাস্তুচ্যুত হয়ে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন এবং বসবাস শুরু করেন। তিনি ২০১৮ সালে মৌলভি মো. ইব্রাহিমের মাধ্যমে আরসায় যোগদান এবং প্রাথমিকভাবে আরসার হয়ে পাহারাদারের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে আবার মিয়ানমার ফিরে যান রিয়াজ এবং সেখানে ৬ মাস মাইন, বোমা, হাতবোমা ও বিস্ফোরক তৈরির প্রশিক্ষণ নেন। পরে আবার বাংলাদেশে প্রবেশ করে মাস্টার সলিমের অন্যতম সহযোগী হয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকা- চালান। তার বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা রয়েছে।

র‌্যাব কর্মকর্তা আরাফাত ইসলাম জানান, মিয়ানমারের রাখাইনে চলমান সংঘাতকে কাজে লাগিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নতুন করে খুনখারাবি ও অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যভিত্তিক সন্ত্রাসী গ্রুপ আরসা। তারা রাখাইন থেকে অস্ত্রশস্ত্র এনে নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। এ ছাড়া কিছুদিন ধরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হেড মাঝিসহ কয়েক রোহিঙ্গাকে গুলি ও গলা কেটে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে র‌্যাব ক্যাম্পে গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি করে। তারই ধারাবাহিকতায় সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে উখিয়ার ক্যাম্পসংলগ্ন পাহাড়ে আরসার আস্তানা শনাক্ত করা হয়।

তিনি জানান, বর্তমানে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে হত্যা, অপহরণ, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, অগ্নিসংযোগ, মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকা-ে জড়িত আরসা। কেউ আরসার অনৈতিক কর্মকা-ের বিরোধিতা করলে কিংবা তাদের কথা না শুনলে তারা বেশিরভাগই অপহরণ ও হত্যার শিকার হন। রোহিঙ্গা নাগরিক প্রত্যাবাসনের পক্ষে কাজ করায় ২০২১ সালে রোহিঙ্গা নেতা মাস্টার মহিবুল্লাহকে খুন করে আরসা। ২০২২ সালে গোয়েন্দা সংস্থা ও র‌্যাবের মাদকবিরোধী যৌথ অভিযানের সময় আরসা সন্ত্রাসীদের হামলায় গোয়েন্দা সংস্থার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিহত হন। আহত হন একজন র‌্যাব সদস্য।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০২৩ সালে আরসার সন্ত্রাসীদের হাতে ৬৪ জন সাধারণ রোহিঙ্গা ও রোহিঙ্গা কমিউনিটি লিডার এবং চলতি বছরের এ পর্যন্ত ১৬ জন রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে।

এ ছাড়া ক্যাম্প ও ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে র‌্যাব এ পর্যন্ত ১১০ জন আরসা সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। তাদের কাছ থেকে ৫১ দশমিক ৭১ কেজি বিস্ফোরক, ১২টি বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, ৫৩টি দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র, ১৫৩ রাউন্ড গুলি, ৬৭ রাউন্ড খালি খোসা, ৪টি আইইডি ও ৩৫টি ককটেল উদ্ধার করা হয়।