উপজেলায় উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে নেই ৩০% রোগীর

দেশের উপজেলা পর্যায়ে ৩০ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপের রোগী রোগটি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিতভাবে চিকিৎসা নেয় না। ৫৭ শতাংশ রোগী নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছে ও তাদের রোগটি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বাকি ১৩ শতাংশ রোগী কখনোই চিকিৎসা নেয় না বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসে না।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি দেশের ১৮২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ কর্নারের (এনসিডি) মাধ্যমে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।

এ ব্যাপারে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের উচ্চ রক্তচাপ কার্যক্রমের ডেপুটি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর শামীম জুবায়ের দেশ রূপান্তরকে জানান, ১৮২ উপজেলায় উচ্চ রক্তচাপের রোগীর সংখ্যা ৩ লাখ ৬০ হাজার ও ডায়াবেটিক রোগী ২ লাখ ৬০ হাজার। উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের মধ্যে নিয়মিত এনসিডি কর্নারে এসে সেবা নিচ্ছে ৫৭ শতাংশ। সে হিসাবে এসব উপজেলায় ৫৭ শতাংশ বা ২ লাখ ৫ হাজার ২০০ রোগীর রোগটি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ৩০ শতাংশ বা ১ লাখ ৮ হাজার রোগী নিয়মিত আসে না। বাকি ১৩ শতাংশ বা ৪৬ হাজার ৮০০ রোগী কখনোই এসব কেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে আসে না।

এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আরও বলেন, যে ৩০ শতাংশ রোগী চিকিৎসা নিতে নিয়মিত আসে না, তাদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আনার জন্য এনসিডি কর্নার থেকে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে দুটি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। একটি হলো রোগীদের কল করা। আরেকটি খুদে বার্তা পাঠানো। দেখা গেছে, যারা খুদে বার্তা পেয়েছে তাদের ২৫ শতাংশ এই স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা নেওয়ার জন্য ফেরত এসেছে। অথচ তারা এত দিন আসছিল না। আর কল পেয়ে স্বাস্থ্যসেবা নিতে এসেছে ৫০ শতাংশ রোগী।

শামীম জুবায়ের বলেন, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ বয়স্ক মানুষের বেশি হয়। অথচ তাদের একটি অংশ নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ করতে উপজেলায় আসতে পারে না। সে কারণে কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে সরকারিভাবে দুটি ওষুধের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই ক্লিনিক থেকে তারা যাতে ওষুধ নিতে পারে, সেজন্য হার্ট ফাউন্ডেশন ক্লিনিকে কাজ করে যাচ্ছে। পরে এই অভিজ্ঞতার তথ্য সরকারকে জানানো হবে।

প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি চারজনে একজন রোগী : গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিএমএ ভবনে প্রজ্ঞা আয়োজিত ‘বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ পরিস্থিতি ও করণীয়’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় জানানো হয়, দেশে প্রতি চারজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে একজন উচ্চ রক্তচাপে ভুগছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ গ্লোবাল রিপোর্ট অন হাইপারটেনশন-২০২৩-এর তথ্য অনুযায়ী ২০১৯ সালে বাংলাদেশে ২ লাখ ৭৩ হাজার মানুষ হৃদরোগজনিত অসুস্থতায় মৃত্যুবরণ করেছে, যার ৫৪ শতাংশের জন্য দায়ী উচ্চ রক্তচাপ। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যানসার, কিডনি রোগ, শ্বাসতন্ত্রের রোগ, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের অন্যতম প্রধান ঝুঁকি উচ্চ রক্তচাপ।

নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত উচ্চ রক্তচাপ মাপা ও ওষুধ সেবনের পরামর্শ : এ ব্যাপারে প্রজ্ঞার অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অসংক্রামক রোগের প্রকোপ অনেকটাই কমানো সম্ভব। বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তবে ওষুধ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে এ খাতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।

একই অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) ড. মো. এনামুল হক বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে যে উচ্চ রক্তচাপ পরীক্ষা ও ওষুধে ১ টাকা বিনিয়োগ করলে সামগ্রিকভাবে ১৮ টাকার সুফল পাওয়া যায়। এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষভাবে তা ব্যবহার করা সম্ভব হলে উচ্চ রক্তচাপজনিত অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

এ ব্যাপারে ডা. শামীম জুবায়ের দেশ রূপান্তরকে বলেন, মানুষ জানে না তার শরীরে এই রোগটি আছে। এই রোগকে বলা হয় নীরব ঘাতক। প্রাপ্তবয়স্করাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। সে কারণে ১৮ বছরের তদূর্ধ্ব প্রাপ্তবয়স্ক সবাইকে নিয়মিত রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস মাপতে হবে। সরকার এটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিনামূল্যে দিচ্ছে। তাই সবাই যেন সেবাটা নেয়।

আজ বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস : বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ বছর দিবসের প্রতিপাদ্য ‘সঠিকভাবে রক্তচাপ মাপুন, নিয়ন্ত্রণে রাখুন এবং দীর্ঘজীবী হন’। ওয়ার্ল্ড হাইপারটেনশন লিগের সদস্য হিসেবে হাইপারটেনশন কমিটি অব ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ ২০০৬ সাল থেকে ১৭ মে দিবসটি পালন করে আসছে।