সংলাপে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা

নদী রক্ষা কমিশনকে সৎ হলেই হবে না সাহসীও হতে হবে

বড় বড় কোম্পানি আমাদের নদীগুলোকে মেরে ফেলেছে। হাজার হাজার একর নদীর জমি তারা দখল করে আছে। আমাদের অনেক আইন রয়েছে। আইনের সঠিক ও মজবুত ভিত্তি রয়েছে। যার ওপর আইন প্রয়োগের দায়িত্ব তিনি যদি দায়িত্ব পালন না করেন তাহলে নদী রক্ষা করা যাবে না। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনে যারা রয়েছেন তাদের শুধু সৎ মানুষ হলেই হবে না, তাদের সাহসী হতে হবে। নদী দখলকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত অ্যাকশনে যেতে হবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানী ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘নদী দূষণ বন্ধে গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক নাগরিক সংলাপ অনুষ্ঠানে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মজিবুর রহমান হাওলাদার এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘গরিব মানুষের অর্থ দিয়ে দেশের পার্লামেন্ট চলে। সে পার্লামেন্টে আইন পাস হয়। একটি আইন পাস হতে কত ঘণ্টা লাগে? এতে কত অর্থ খরচ হয়? সে আইন যখন নদীর আইন হয়, সে আইন কেন মন্ত্রীরা প্রয়োগ করছেন না। চেয়ারে বসে থেকে অফিসের ক্ষুদ্র কর্মচারী পাঠিয়ে নদী রক্ষা হবে না। কারণ নদী যারা দখল দূষণ করছেন, তারা আরও অনেক বেশি শক্তিশালী।’

নদী দখলদারদের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যাওয়ার এখনই সময় উল্লেখ করে ড. মজিবুর বলেন, ‘আমরা জানি প্রায় সব নদী এখন দূষণের শিকার। নদীর দুপাশ ক্রমশ চেপে আসছে। আগে নদীতে যে পানির ভলিউম ছিল, সেটা কিন্তু এখন নেই। অর্ধেকের কম রয়েছে। একদিকে নদী দখল হয়েছে এবং আবার উজান থেকে পানির যে স্রোত আসত সেটা আসছে না। সেসব কারণে নদী শুকিয়ে গেছে। নদীর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং গভীরতা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ বা ২০ শতাংশে এসে ঠেকেছে। আবার কিছু নদী মরে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের স্বাধীনতার সেøাগান ছিল, তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা। সেই পদ্মা, মেঘনা, যমুনাকে বাঁচাতে কাজ করতে গেলে আজকে হুমকি আসে। সেসব হুমকিকে মোকাবিলা করার সক্ষমতা আপনারা গণমাধ্যমকর্মীরা দেখিয়েছেন। গণমাধ্যমে রিপোর্ট আসছে। অনেক কোয়ালিটি রিপোর্ট হয় তবে রিপোর্টের কোয়ালিটি আরও বাড়াতে হবে। নদীর আইন কেন প্রয়োগ হচ্ছে না তা নিয়ে কথা বলার সময় হয়েছে। নদী হলো পাবলিক প্রপার্টি। এটাকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের সবার।’

সভাপতির আলোচনায় শরীফ জামিল বলেন, ‘নদীমাতৃক দেশের মানুষ হিসেবে আমাদের নদীকে জানতে হবে। নদী কাকে বলে সেটা আইনে বলা আছে। ইংল্যান্ডের মানুষ টেমস নদীকে দূষণের হাত থেকে রক্ষা করে বাঁচিয়ে তুলেছে। আমাদের দূষিত নদীগুলোকে আমরা হয়তো একদিন দূষণমুক্ত করতে পারব। তবে ঢাকার নদীগুলো অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। দখলদাররা নিয়মিতভাবে দখল করে নিচ্ছে সব নদী। নদী থেকে দখলদারদের উচ্ছেদ করতে হবে।’

খুলনার সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য গ্লোরিয়া ঝর্ণা সরকার বলেন, ‘যে সুন্দরবন আমাদের মায়ের মতো আঁচল দিয়ে ঘূর্ণিঝড় থেকে রক্ষা করে, সেই সুন্দরবনকে আমরা ধ্বংস করছি ভেতর থেকে। সুন্দরবনের মানুষ এখন নানা রোগে আক্রান্ত। নদীর জন্য অর্থ বরাদ্দ দিচ্ছে সরকার কিন্তু স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা তাদের দায়িত্ব পালন করছেন না। প্রধানমন্ত্রী পরিবেশপ্রেমী মানুষ, বিভিন্ন আলোচনার মাধ্যমে তার কাছে তথ্য প্রদান করতে হবে। তাহলেই আমরা নদী-পরিবেশ নিয়ে কাজ করতে পারব। নদীকে বাঁচাতে পারব।’

সাবেক সংসদ সদস্য ও জাতীয় পার্টির নেতা শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, ‘নদীর প্রতি অবহেলা সংশোধনের অযোগ্য। নদী বিষয়ে কাজ করার জন্য নদী গবেষণায় আর্থিক অনুদান এবং প্রণোদনা প্রদান করতে হবে। নদীকে সর্বত্র আলোচনায় আনতে হবে। নদী নিয়ে যে গণমাধ্যমকর্মীরা কাজ করেন তাদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে। এ ব্যাপারে রাষ্ট্র প্রণোদনা প্রদান করতে পারে গণমাধ্যমগুলোকে।’

নাগরিক সংলাপে প্যানেল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআইবি) প্রশিক্ষণ কো-অর্ডিনেটর জিলহাস উদ্দিন নিপুণ, বাংলাদেশ ফেডারেল ইউনিয়ন অব জার্নালিস্টের (বিএফইউজে) কোষাধ্যক্ষ এবং বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সিনিয়র রিপোর্টার খায়রুজ্জামান কামাল, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মিডিয়া বিভাগের প্রধান মোস্তফা আলমগীর রতন, দ্য ডেইলি স্টারের চিফ রিপোর্টার পিনাকী রায়, একাত্তর টেলিভিশনের অ্যাসোসিয়েট চিফ নিউজ এডিটর মো. আহসান হাবীব পলাশ, দৈনিক কালের কণ্ঠের সিনিয়র রিপোর্টার নিখিল চন্দ্র ভদ্র, নেক্সাস টেলিভিশনের এডিটর কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স আমিন আল রশিদ এবং ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের বিরবেক স্কুল অব ল’র সহযোগী প্রভাষক মোহাম্মদ গোলাম সারওয়ার প্রমুখ।