নিষেধাজ্ঞার কূটনীতি ভোটের রাজনীতি

বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার নজির আছে। অন্যান্য দেশও এমন নিষেধাজ্ঞা দেয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র এমন নিষেধাজ্ঞা দেওয়াকে তার স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার বানিয়ে ফেলেছে। দেশটির প্রত্যাশামতো কাজ না হলেই ‘নিষেধাজ্ঞার কূটনীতির’র আশ্রয় নিয়ে থাকে। তবে এবার সবাইকে চমকে দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং হামাসের তিন নেতার বিরুদ্ধে আইসিসির প্রধান প্রসিকিউটরের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদনের পর এমন হুমকি দিল দেশটি। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই হুমকি যতটা না ইসরায়েলের নেতাদের রক্ষার স্বার্থে তার চেয়ে বেশি দেশটির আসন্ন ভোটের স্বার্থে। এক দিকে দেশটিতে চলমান ইসরায়েল বিরোধী বিক্ষোভ অন্যদিকে ইসরায়েলের পক্ষ নিয়ে রিপাবলিকান নেতাদের চাপের মুখে ক্ষমতাসীন ডেমোক্র্যাট প্রশাসন অনেকটাই দিশেহারা। মাত্র কয়েক দিন আগেই ইসরায়েলের সঙ্গে কিছু ইস্যুতে দূরত্ব বাড়াতে শুরু করেছিল বাইডেন প্রশাসন। কিন্তু ভোটের আগে ইস্যুটিকে যেন রিপাবলিকানরা বড় ইস্যু তৈরি করতে না পারে সে জন্যই আবার ইসরায়েলমুখী হয়েছে তারা।  যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বা অর্থ দপ্তরের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, সব মার্কিন নাগরিক বা স্থায়ী বসবাসের অনুমতি রয়েছে, এমন সব ব্যক্তি, যেখানেই থাকুন না কেন, অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল (ওএফএসি) নির্দেশনা মেনে চলতে বাধ্য। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র যখন নিষেধাজ্ঞা জারি করে, সেইসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বা দেশের সঙ্গে মার্কিন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কোনো রকম লেনদেন বা সম্পর্ক রক্ষা করতে পারে না। যাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকবে, তারা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারবেন না। যেসব প্রতিষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্র ভর্তুকি বা অনুদান দিয়ে থাকে, অথবা যুক্তরাষ্ট্র পরিচালনা করে, তাদের জন্যও এই নির্দেশনা কার্যকর হবে। যদি কেউ সেটা লঙ্ঘন করে, তাহলে বিভিন্ন অঙ্কের জরিমানার মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু যে সংস্থার কোনো বাণিজ্যিক বা রাজনৈতিক স্বার্থ নেই সেই প্রতিষ্ঠান বা সংস্থাকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার বিষয়টি রাষ্ট্রীয় স্বার্থের চাইতে গোষ্ঠীগত স্বার্থের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসে, যেমনটা হতে পারে আইসিসির ক্ষেত্রে। বিবিসি জানাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন ঘোষণা দিয়েছেন, ইসরায়েলের নেতাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চাওয়া আইসিসির প্রসিকিউটরদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা জারির বিষয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, সেই বিষয়ে তিনি মার্কিন আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে কাজ করবেন। কংগ্রেসের এক শুনানিতে ব্লিঙ্কেন বলেছেন, সম্পূর্ণ ভুল এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তিনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। বিবিসি বলছে, তার এই ঘোষণা এলো এমন সময় যখন আইসিসি কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির জন্য রিপাবলিকানদের চাপ বাড়ছে। খুব তাড়াতাড়ি, হয়তো এই সপ্তাহে এ বিষয়ে ভোট হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র আইসিসির সদস্য দেশ নয়। কিন্তু ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার সিদ্ধান্তের সময় আইসিসির কৌঁসুলিদের সমর্থন করেছে দেশটি।

গত মঙ্গলবার শীর্ষ রিপাবলিকান নেতা জেমস রিশে সিনেটের বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক কমিটিতে ব্লিঙ্কেনকে প্রশ্ন করেন, একটি দেশের স্বাধীন, বৈধ এবং গণতান্ত্রিক বিচারিক প্রক্রিয়া থাকা সত্ত্বেও তাদের বিষয়ে আইসিসির নাক গলানোকে সমর্থন করবেন কি না? জাবাবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা দলমত নির্বিশেষে আপনাদের সঙ্গে কাজ করতে চাই। এটা করতে আমি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এর আগে গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আবেদন করাটা আপত্তিকর। ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে কোনো সমতা নেই। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএন বলছে, ইসরায়েলের গাজা যুদ্ধ পরিচালনার বিষয়ে এই আদালতের তদন্তের পরিধি বাড়ায় কংগ্রেসে আইসিসির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের অন্তত দুইটা কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে।

চলতি মাসের শুরুতে টেক্সাসের রিপাবলিকান চিপ রায়ের উত্থাপন করা একটি বিলের সমর্থনে ক্যাপিটাল হিলে এর সমর্থন বাড়তে শুরু করে। সেই বিলে বলা হয়েছে, আইসিসির যেসব কর্মকর্তা এই মামলার সঙ্গে জড়িত, তাদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধা দেওয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে তাদের যেকোনো ভিসা প্রত্যাহার এবং দেশের ভেতরে তাদের যেকোনো সম্পত্তি লেনদেনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে। এটা অব্যাহত থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সুরক্ষিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার না করে। রিপাবলিকান হাউজের অন্তত ৩৭ জন আইনপ্রণেতা এই প্রস্তাব সমর্থন করেছেন। যদিও ডেমোক্রেটিক আইনপ্রণেতারা এই প্রচেষ্টার পেছনে থাকবেন কি না তা স্পষ্ট নয়। তবে আসন্ন ভোটে জয়ের জন্য হয়তো বিকল্প কোনো পথে হাঁটবে না।