আকাশে মেঘ আর নদীর পানির উচ্চতা বাড়লেই আতঙ্ক বাড়ে বরগুনাসহ উপকূল জুড়ে। সেই সঙ্গে আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিপদসংকেত আতঙ্কের তীব্রতা বাড়িয়ে দেয় কয়েক গুণ। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হওয়া গভীর নিম্নচাপ ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিলে তা আজ রবিবার সন্ধ্যা নাগাদ বরগুনাসহ দেশের অন্যান্য উপকূলে আঘাত হানতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এই নিম্নচাপের প্রভাবে গতকাল শনিবার বিকেল থেকেই বরগুনায় শুরু হয় বৃষ্টি ও দমকা হাওয়া। আর এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন ভাঙা বেড়িবাঁধ ও বেড়িবাঁধের বাইরে বসবাস করা হাজার হাজার মানুষ।
এদিকে খুলনার ৯ উপজেলায় ৯৯৫ দশমিক ২৪ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে ঝুঁকিতে রয়েছে সাড়ে ১৪ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ। এর মধ্যে উপকূলীয় কয়রা, পাইকগাছা, দাকোপ ও বটিয়াঘাটা উপজেলায় ঝুঁকিতে রয়েছে ১৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ। বড় ধরনের জলোচ্ছ্বাস বা জোয়ারের পানি বেড়ে ৫ থেকে ৬ ফুট উঁচু হলে লোকালয়ে ঢুকে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছেন এসব বেড়িবাঁধ লাগোয়া জনপদের বাসিন্দারা।
বরগুনার বিষখালী, বুড়িশ্বর, পায়রা ও বলেশ্বর নদ এলাকার বেড়িবাঁধের বাইরের বাসিন্দারা প্লাবিত হয় স্বাভাবিক জোয়ারেও। তবু জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকির মধ্যে নদীতীরে বসবাস করে সেখানকার লক্ষাধিক বাসিন্দা। পোহাতে হয় নানা ভোগান্তি। এসব এলাকার বেশিরভাগ মানুষকে বসবাস করতে হয় জোয়ার-ভাটার নিয়ম মেনে। সেখানে নদীর স্রোত আর ভাঙন কেড়ে নিচ্ছে জনপদ, মাথা গোঁজার ঠাঁই বসতভিটাও। জোয়ার-ভাটার নির্দয় খেলায় সহায় সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে অসংখ্য পরিবার।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বরগুনা সদর উপজেলার ঢলুয়া ইউনিয়নের পোটকাখালী, ডালভাঙা ও নলী এলাকা, নলটোনা ইউনিয়নের নিশানবাড়িয়া, নলটোনা, সোনাতল ও কুমিড়মারা, বুড়িরচর ইউনিয়নের গুলবুনিয়া, বাঁশবুনিয়া, চালিতাতলী, আয়লা পাতাকাটা ইউনিয়ন, বদরখালী ইউনিয়নের ফুলঝুড়ি, কুমড়াখালী ও গুলিশাখালী এলাকা, পাথরঘাটা উপজেলার সদর ইউনিয়নের পদ্মা, জীনতলা, টেংরা, কালমেঘা, কাকচিড়া, তালতলী উপজেলার নিশানবাড়িয়া, ছোটবগী, নিদ্রার চর, তেঁতুলবাড়িয়া, খোট্টার চর, সোনাকাটা, নিউপাড়া, আমতলী উপজেলার সদর ইউনিয়ন, গুলিশাখালী, বামনা উপজেলার রামনা, বদনীখালী, বেতাগী উপজেলার কালিকাবাড়ি, ঝিলবুনিয়া, ছোট মোকামিয়া এলাকায় বাঁধের বাইরের লক্ষাধিক মানুষের বাড়িঘর অধিক জোয়ারে নিমজ্জিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বরগুনা জেলা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বরগুনার পায়রা (বুড়িশ্বর), বিষখালী ও বলেশ্বর নদীর ২৯ কিলোমিটার ঝুঁকিতে রয়েছে। জেলার ২২টি পোল্ডারে ৮০৫ কিলোমিটার বাঁধের মধ্যে ২৯ কিলোমিটার বাঁধ নদীতে বিলীনের ঝুঁকিতে রয়েছে। বরগুনা সদর উপজেলার ১৫ স্থানে ৬.৩২০ কিলোমিটার, আমতলীতে ৫.২২০ কিলোমিটার, তালতলীর ১.৯৫০ কিলোমিটার, পাথরঘাটার ৮.৫৫ কিলোমিটার, বামনা উপজেলার ৬.৫১৫ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় নদীতে বিলীনের মুখে রয়েছে। জেলার মোট ৮০৫ কিলোমিটার বাঁধের মধ্যে ৫০০ কিলোমিটারের উচ্চতা ১৩ ফুট বা তার কম। বাকি ৩০৫ কিলোমিটারের উচ্চতা ১৩ থেকে ১৬ ফুট। অতি জোয়ারে নদ-নদীর পানির উচ্চতা ১২ ফুট বৃদ্ধি পেলে ৫০০ কিলোমিটার বাঁধের অধিকাংশই উপচে লোকালয়ে পানি প্রবেশের সম্ভাবনা রয়েছে। বাকি ৩০০ ফুট এলাকা মোটামুটি ঝুঁকিমুক্ত রয়েছে।
বরগুনার মাঝের চর এলাকার বাসিন্দা জয়নাল বলেন, ‘আকাশে ম্যাঘ আর বৃষ্টি হইলেই আমাদের মনের মধ্যে আতঙ্ক শুরু হয়। বর্ষা মৌসুম তো পুরোই আতঙ্কের মধ্যে কাটে। হুনছি ঘূর্ণিঝড় আইতেছে, এহন কি হইবে আল্লায় জানে।’
পোটকাখালী এলাকার বাসিন্দা খাদিজা বেগম বলেন, ‘ঝড় বইন্না আইলে আমাগো দুখের শ্যাষ থাকে না। ঘর দুয়ার ভাইসা যায়। কয়েক দিন ধরে রান্না বান্না বন্ধ হইয়া যায়।’
ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) বরগুনা সদর উপজেলার টিম লিডার মো. জাকির হোসেন মিরাজ বলেন, জেলার নদীতীরবর্তী বিভিন্ন স্থানে চার-পাঁচ ফুট উচ্চতারও বেড়িবাঁধ আছে। এ ছাড়া সিডর ও আয়লায় যেসব বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাও পুরোপুরি মেরামত করা হয়নি। এজন্য বরগুনার মানুষ জলোচ্ছ্বাসে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাঁধের কারণে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। বরগুনায় যুগোপযোগীভাবে বাঁধ নির্মাণ করা অত্যাবশ্যক। এটা এখন এ জেলার মানুষের প্রাণের দাবি হয়ে উঠেছে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পাউবোর বরগুনা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় আমাদের মাঠপর্যায়ে কর্মীরা কাজ করছেন। এ ছাড়া দ্রুত ভাঙন রোধে ৮০০ জিওব্যাগ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আমরা সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রয়েছি।’
ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় গতকাল দুপুরে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের মিলনায়তনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভা হয়েছে। সভায় উপজেলা পর্যায়ে প্রস্তুতির পাশাপাশি বরগুনায় প্রায় ১০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রাখার সিদ্ধান্ত হয়।
বরগুনার জেলা প্রশাসক মোহা. রফিকুল ইসলাম বলেন, ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় বরগুনায় ৬৭৩টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যেখানে একসঙ্গে ৩ লাখের বেশি মানুষ আশ্রয় নিতে পারবে। এ ছাড়া জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে ৪২টি মেডিকেল টিম এবং রেড ক্রিসেন্ট, সিপিপিসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পক্ষ থেকে ৯ হাজার ৬১৫ জন স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
খুলনা জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় জেলায় ৬০৪টি সাইক্লোন শেল্টার প্রস্তুত রয়েছে। সেখানে পরিস্থিতি অনুযায়ী ঝুঁকিপূর্ণ ৩ লাখ ১৫ হাজার ১৮০ জন মানুষ আশ্রয় নিতে পারবে। এ ছাড়া ৩টি মুজিব কিল্লায় ৪৩০ জন মানুষ ও ৫৬০টি গবাদি পশু রাখা যাবে। উপকূলীয় উপজেলা কয়রা, দাকোপ ও পাইকগাছায় ৫ হাজার ২৮০ জন স্বেচ্ছাসেবককে প্রস্তুত রয়েছে।
খুলনা জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রুবায়েত আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সতর্ক থাকার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজ নিজ কর্মস্থলে থাকার জন্যও বলা হয়েছে। ইতিমধ্যে উপকূলীয় এলাকায় সতর্কতায় মাইকিং করা শুরু হয়েছে। শুকনো খাবার, ওষুধ, ঢেউটিন ও নগদ টাকা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রস্তুত রয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড ও পানি উন্নয়ন বোর্ড।
অন্যদিকে পাউবো কর্মকর্তারা জানান, জেলার ৯ উপজেলায় (কয়রা, পাইকগাছা, বটিয়াঘাটা, দাকোপ, ডুমুরিয়া, রূপসা, দিঘলিয়া, তেরখাদা ও ফুলতলা) ৯৯৫ দশমিক ২৪ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে ঝুঁকিতে রয়েছে সাড়ে ১৪ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ। উপকূলীয় কয়রা, পাইকগাছা, দাকোপ ও বটিয়াঘাটায় উপজেলায় ঝুঁকিতে রয়েছে ১৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ।
কয়রার বাসিন্দা সৌরভ বলেন, ‘কয়রা উপজেলার কাটকাটা, জোড়শিং বাজার, মঠবাড়িয়া, ঘড়িনাল বাজার, হরিণখোলা-ঘাটাখালী, মহারাজপুর, কাশিয়াবাদ, দশহালিয়া এলাকায় বেড়িবাঁধ নাজুক অবস্থায় রয়েছে। বাঁধ ভাঙলে গ্রামের পর গ্রাম প্লাবিত হয়ে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হবে।
এ ব্যাপারে খুলনা পাউবোর পওর বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলম বলেন, ‘বেশি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে সংস্কার করা হয়েছে। তবে জোয়ারের পানি ৫ থেকে ৬ ফুট উঁচু হলে বাঁধ উপচে লোকালয়ে প্রবেশ করতে পারে। সে ক্ষেত্রে কোথাও বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হলে জরুরি ভিত্তিতে মেরামতের জন্য জিওব্যাগ মজুদ রাখা হয়েছে।’