ঘূর্ণিঝড় রিমালের প্রভাবে রাজধানী ঢাকায় গতকাল সোমবার ভোর থেকেই তুমুল বৃষ্টি হয়। এতে ডুবে যায় অনেক এলাকার রাস্তাঘাট, আর এর ফলে সড়কে ছিল না পর্যাপ্ত গণপরিবহন। এ সুযোগে ও বৃষ্টির কারণ দেখিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও রিকশাচালকরা বাড়তি ভাড়া আদায় করেন। কোনো কোনো এলাকায় জলাবদ্ধতার শঙ্কা থাকায় অটোরিকশার চালকরা বাড়তি ভাড়ায়ও যেতে রাজি হননি। সব মিলিয়ে ভোগান্তিতে পড়েন কর্মক্ষেত্রে যাওয়া ও খেটে খাওয়া মানুষ এবং স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা।
ঘূর্ণিঝড় রিমালের প্রভাবে বন্দরনগরী চট্টগ্রামেও টানা বৃষ্টি হয়। এতে নগরী জুড়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। নগরীর কোথাও হাঁটুপানি আবার কোথাওবা কোমরসমান পানিতে থইথই করে। এতে দুর্ভোগে পড়েন নগরবাসী।
রাজধানী ঢাকায় গতকাল সকাল থেকেই বৃষ্টি শুরু হয়। একটানা চলা এ বৃষ্টি কখনো বাড়ে, কখনো কিছুটা কমে। বৃষ্টির সঙ্গে ছিল ঝড়ো বাতাস। ভোর থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টিতে ডুবে যায় বিভিন্ন এলাকার সড়ক। জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১০১টি দল মাঠে নামে। উভয় সিটি করপোরেশন জলাবদ্ধতার খবর জানাতে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ ও হটলাইন নম্বর চালু করে।
রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, ধানমন্ডির ২৭ নম্বর, গ্রিনরোড, নিউ মার্কেট, মিরপুরের কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে মিরপুর-১৪ নম্বর যাওয়ার রাস্তাসহ পুরান ঢাকার বেশ কিছু নিচু এলাকায় বৃষ্টির পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া বৃষ্টিতে নিউ মার্কেট, কারওয়ান বাজার, মগবাজার এলাকার আশপাশসহ রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আবু নাসের দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করপোরেশনের আওতাধীন এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে মাঠপর্যায়ে কাজ করছে ৯১টি দল। কোথাও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলে নগরবাসী নিয়ন্ত্রণ কক্ষের (০১৭০৯৯০০৮৮৮) নম্বরে ফোন করতে পারেন। কোথাও থেকে ফোন এলেই আমাদের টিম সেখানে ছুটে যাচ্ছে।’
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) জনসংযোগ কর্মকর্তা মুকবুল হোসেন বলেন, ‘জলাবদ্ধতা দূর করতে কাজ করছে কুইক রেসপন্স টিম। আমাদের ১০টি অঞ্চলের জন্য আলাদা করে ১০টি টিম রয়েছে। কোথাও বেশি জলাবদ্ধতা তৈরি হলে সেখানে টিমের সঙ্গে অতিরিক্ত কর্মী যুক্ত করা হচ্ছে। জরুরি সেবার জন্য ১৬১০৬ নম্বরে কল করতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।’
গতকাল সকালে যেসব নগরবাসী পথে নামে তাদের পড়তে হয় ভারী বৃষ্টির মুখে। কাজের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বেরিয়ে অনেকেই রাস্তায় বাস পাননি। সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও রিকশাচালকরা বৃষ্টির কারণে বাড়তি ভাড়া চেয়েছেন। কোনো কোনো এলাকায় জলাবদ্ধতার শঙ্কা থাকায় অটোরিকশার চালকরা যেতে রাজি হননি। অনেকে গণপরিবহনের অপেক্ষায় থেকে বৃষ্টি ও ঝড়ো বাতাসে ভিজে গেছেন। অনেকে কাকভেজা হয়ে বাসা থেকে অফিসে যান, আবার একই অবস্থায় বাসায় ফেরেন।
মগবাজারের বাসিন্দা মিনারা সিদ্দিকী বলেন, ‘বাসা থেকে বের হওয়ার সময়ই বৃষ্টি ছিল। এর মধ্যে রিকশা-সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংকট। এরপর রিকশা পাওয়া গেলেও ভাড়া দিতে হয়েছে বেশি।’ একইরকম অভিজ্ঞতার কথা জানান আরও অনেকে।
কর্মস্থল বারিধারায় যেতে সকাল ৮টার দিকে মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে বের হয়েছিলেন জেসমিন খন্দকার। প্রথমে মোহাম্মদপুরের টাউন হল গিয়ে পাঁচজন অটোরিকশাচালকের সঙ্গে কথা বলেন। কিন্তু বারিধারার নাম শুনে চালকদের কেউ যেতে রাজি হননি। এর বাইরে একজন চালক যেতে রাজি হলেও ভাড়া চেয়েছিলেন তিনগুণ। আধঘণ্টা চেষ্টার পর টাউন হল থেকে রিকশায় করে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে যান (আড়ংয়ের উল্টো দিকে) জেসমিন। সেখানে দাঁড়িয়ে উত্তরা-আবদুল্লাহপুরগামী বাসের জন্য অপেক্ষা করেন। কিন্তু সব বাসই যাত্রীভর্তি করে দরজা লাগিয়ে যাচ্ছিল। সংসদের সামনে বাসগুলো থামেনি।
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে জেসমিন বলেন, ‘বৃষ্টিতে বাস-সিএনজিচালিত অটোরিকশা কিছুই পাইনি। বাসের অপেক্ষায় থেকে বৃষ্টিতে অর্ধেকের বেশি ভিজে গেছি। অফিসে জানিয়ে দিয়েছি, আজ আর যাওয়া সম্ভব নয়।’
সকালে স্কুলে যাওয়ার পথে বিপদে পড়েন শিক্ষার্থীরাও। একদিকে বৃষ্টিতে যানবাহন সংকট, অন্যদিকে বেশি ভাড়ায় যানবাহন পেলেও ভিজে ভিজে স্কুলে যেতে হয়েছে। তবে অনেক অভিভাবক বৃষ্টি দেখে শিক্ষার্থীকে স্কুলে পাঠাননি।
দুপুরে পুলিশের রমনা ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনার জয়নুল আবেদীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সড়কে বৃষ্টির পানি জমে যাওয়ায় গাড়ি ধীরগতিতে চলছে। তবে একে যানজট বলা যায় না।’
দুই ঘণ্টা বন্ধ ছিল মেট্রোরেল : কারিগরি ত্রুটির কারণে সকালে প্রায় দুই ঘণ্টা বন্ধ ছিল মেট্রোরেল। ফলে যাত্রীরা পড়েন ব্যাপক ভোগান্তিতে। পল্লবী মেট্রোস্টেশনের নিচে সকাল ৮টার দিকে কথা হয় বাংলা মোটরের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী শাজাহান খানের সঙ্গে। তিনি জানান, প্রতিদিনের মতো গতকাল সকালে কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য সকাল সাড়ে ৭টার সময় পল্লবী মেট্রোস্টেশনে আসেন। প্রায় আধঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার পর জানতে পারেন মেট্রোরেল বন্ধ রয়েছে। তবে স্টেশনের স্ক্রিনগুলোতে দেখানো হচ্ছিল ৫ মিনিটের মধ্যেই ট্রেন আসবে। এরপর তিনি স্টেশন থেকে নিচে নেমে বাসে ওঠেন। এতে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
ঘূর্ণিঝড় ‘রিমাল’-এর প্রভাবে ২৩৫ মিলিমিটার বৃষ্টিতে জলমগ্ন চট্টগ্রাম : ঘূর্ণিঝড় রিমালের প্রভাবে চট্টগ্রামে সকাল থেকে টানা বৃষ্টিতে নগর জুড়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল সোমবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ২৩৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে সকাল ৬টা থেকে ৯টায় ১৩২ মিলিমিটার। এই তিন ঘণ্টার বৃষ্টিতে পুরো নগরী জলমগ্ন হয়ে পড়ে। সব রাস্তায় পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করে। অফিসগামী মানুষ ছাড়া বাকিদের অনেকেই নিতান্তই কাজ না থাকলে ঘর থেকে বের হয়নি।
এদিকে ভারী বৃষ্টির কারণে নগরের বায়েজিদ চন্দ্রনগর এলাকায় নির্মাণাধীন একটি মাদ্রাসার দেয়াল ধসে সাইফুল ইসলাম হৃদয় নামে এক কারখানা শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সকাল ৮টার দিকে হেঁটে তারাবন এলাকার কর্মস্থলে যাওয়ার সময় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত সাইফুল নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ থানার ভগবতি গ্রামের বাবুল মিয়ার ছেলে বলে জানিয়েছেন বায়েজিদ বোস্তামি থানার ওসি সঞ্জয় কুমার সিংহ।
নগরের মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, বাদুড়তলা, শুলকবহর, মোহাম্মদপুর, কার্পাসগোলা, কাতালগঞ্জ, বাঁকলিয়া, চান্দগাঁও, অলংকার, ওয়্যারলেস, জিইসি মোড়, হালিশহর কে-ব্লক, এল-ব্লক, নয়াবাজার, ফইল্যাতলী বাজার, ফিরোজশাহ কলোনি, হালিশহরসহ বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল এলাকার বেশিরভাগ রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে। দোকানপাট ও বাসাবাড়িতে ঢুকে গেছে পানি। পুরো এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় উন্মুক্ত নালা ও ফুটপাতের ভাঙা স্ল্যাব পথচারীদের জন্য ঝুঁকি বাড়িয়েছে। নগরের উপকূলীয় এলাকা পতেঙ্গার আকমল আলী রোডের জেলেপাড়া পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছে সেখানকার তিন শতাধিক পরিবার। সোমবার জেলার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল।
এদিকে গতকাল সকাল থেকে টানা বৃষ্টির কারণে নগরের প্রধান প্রধান সড়কসহ বিভিন্ন অলিগলি তলিয়ে যায়। চকবাজার ও কার্পাসগোলা ও মুরাদপুর এবং সিডিএ অ্যাভিনিউ সড়ক এলাকার অনেক বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে গেছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েন নগরবাসী। সোমবার সকাল থেকে বিরামহীন বৃষ্টিপাতের কারণে নগরের নিম্নাঞ্চল তলিয়ে যাওয়ায় অফিসগামী মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েন। পানিতে রাস্তাঘাট ডুবে থাকায় অনেকেই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যেতে পারছেন না।
এদিকে টানা বৃষ্টির কারণে নগরের ব্যস্ততম সড়কে যানবাহন চলাচলও কম দেখা গেছে। কয়েকটি রিকশা থাকলেও যাত্রীদের কাছ থেকে তারা দ্বিগুণ ভাড়া চাইছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। এর আগে ৬ মে এক দফা জলাবদ্ধতায় ডুবেছিল চট্টগ্রাম নগর।