দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলছে ইউক্রেন যুদ্ধ। পশ্চিমা মিত্রদের অর্থ ও অস্ত্র নিয়ে রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছেন দেশটির সেনারা। অন্যদিকে রাশিয়াও একটু একটু করে দখলে নিচ্ছে ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলের ভূখণ্ড। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে, দুই বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে ইউক্রেন। বিষয়টি এত দিন স্বীকার না করলেও সম্প্রতি ফুটতে শুরু করেছে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির কণ্ঠেও। তিনি এখন শিগগিরই সম্ভব যুদ্ধ বন্ধ করতে রাশিয়ার ওপর চাপ প্রয়োগ করতে তার পশ্চিমা মিত্রদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। আবার তাদের রাশিয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোরও আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকরা বলেছেন, রাশিয়ার হামলা জোরদার করার মধ্যে তীব্র রকমের অস্ত্রসংকটে ভুগছে ইউক্রেন। পশ্চিমা মিত্রদের থেকে দেশটি যেসব অস্ত্র পেয়েছে, সেগুলোও শর্তের কারণে রাশিয়ার ভূখণ্ডে ব্যবহার করতে পারছে না। এদিকে জেলেনস্কিও পড়েছেন এক রাজনৈতিক সংকটে। ২০ মে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেয়াদ শেষ হয়েছে; কিন্তু তিনি এখনো পদে বহাল আছেন। কারণ, ইউক্রেনে সামরিক আইন চলমান থাকায় নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হচ্ছে না। যুদ্ধ থেমে গেলেও যে সহসা নির্বাচনের আয়োজন করা সম্ভব না, সেটিও নিশ্চিত। তাই নির্বাচন দীর্ঘ সময়ের জন্য পিছিয়ে দেওয়াই জেলেনস্কির এখন একমাত্র বিকল্প। কিন্তু সেটি হয়তো নানাভাবে পরাজয়ের হুমকির মুখে থাকা ইউক্রেনের জন্য মঙ্গলজনক কিছু হবে না। কারণ জেলেনস্কির সঙ্গে কোনো ধরনের শান্তি আলোচনা সম্ভব না বলে জানিয়ে দিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন।
এ ছাড়া জেলেনস্কির পশ্চিমা সমর্থকরাও তার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছেন। এখন এমন একজন রাজনীতিবিদকে তাদের দরকার, যিনি লম্বা সময় ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবেন। এ কারণেই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন নির্বাচন আয়োজনের ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছেন। নানা সমীকরণের পর নির্বাচন যদিও হয়, তাতে জেলেনস্কির হেরে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে হচ্ছে।
এদিকে পর্যাপ্ত অস্ত্র সরবরাহ এবং সেটি চলমান রাখার স্পষ্ট আশ্বাস ছাড়া লড়াই চালিয়ে যাওয়া জেলেনস্কির পক্ষে কঠিন। আবার তার জন্য সমঝোতায় আসাটাও এখন আরও ক্ষতিকর হতে পারে। পশ্চিমাদের কাছ থেকে বারবার সামরিক সহায়তা চাওয়া বাদ দিয়ে নিজের রাজনৈতিক দক্ষতাকে কাজে লাগানোর সময় এসেছে তার।
কিন্তু সেটি করতে গিয়েই তিনি নিজেকে এক নবিশ নেতা হিসেবে প্রমাণ করছেন দফায় দফায়। গত সোমবার স্পেনে গিয়ে দেওয়া এক ভাষণে তিনি পশ্চিমা নেতাদের বলেছেন, তারা যেন যেকোনো মূল্যে রাশিয়াকে শান্তি আলোচনায় আনতে রাজি করেন। কারণ রাশিয়া এখন যেভাবে আগ্রাসী হয়ে উঠেছে, তাতে করে ইউক্রেনের পক্ষে তার প্রতিরোধ টিকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। কারণ, রাশিয়া ইউক্রেনকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতে চায়। অবশ্য তিনি শর্ত দিয়ে বলেছেন, শান্তি আলোচনার আগে ইউক্রেন থেকে রাশিয়ার সব সেনা প্রত্যাহার করতে হবে এবং ক্রিমিয়াসহ দখল করা ভূখণ্ড ফিরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, সেটি রাশিয়া কখনো করবে না। বরং জেলেনস্কির বৈধতা নিয়ে ইউক্রেনবাসীকেই উসকে দিতে পারে তারা। কারণ পুতিনের প্রধান লক্ষ্য, জেলেনস্কিকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে সেখানে তার পছন্দের কাউকে প্রেসিডেন্ট বানানো।
জেলেনস্কিও হয়তো সেটি অনুধাবন করেন। এজন্যই তিনি কয়েক ঘণ্টা পরপর তার সুর পাল্টান। শান্তির জন্য আকুতি জানানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার আরেকটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে, যাতে তিনি মিত্রদের সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
গত সোমবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি বলেন, এটি সদিচ্ছার বিষয়। কিন্তু প্রত্যেকে শুধু একটি কথাই বলবে, তা হলো সবাই যুদ্ধ ভয় পায়। তিনি বলেন, প্রত্যেকেই এটা দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে ইউক্রেনীয়রা মারা যাচ্ছে। মানুষ মারা যাচ্ছে তা কেউ দেখতে পাচ্ছে না।
জেলেনস্কি প্রস্তাব করেন, সামনের দিনগুলোয় রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে লড়তে ইউক্রেনকে সহায়তা করতে পারে প্রতিবেশী ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর সশস্ত্র বাহিনী।
জেলেনস্কি জানান, রাশিয়া ইউক্রেন ভূখণ্ডে ৩০০টি বিমান দিয়ে হামলা চালিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের আকাশপথে হামলা প্রতিহত করার জন্য অন্তত ১২০-১৩০টি বিমান দরকার। সাক্ষাৎকারে পশ্চিমা মিত্রদের তিনি আরও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের আহ্বান জানান।’
জেলেনস্কি জানান, ইউক্রেন সীমান্তে এবং রাশিয়ার ভেতরে সামরিক সরঞ্জামের ওপর হামলা করার জন্য পশ্চিমাদের অস্ত্র ব্যবহারে আন্তর্জাতিক মিত্রদের সঙ্গে তিনি আলোচনা করছেন। তবে তিনি হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, যতদূর মনে হয়, সেখানেও ইতিবাচক কিছু হবে না।