ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ ভূখন্ড গাজায় গত বছরের সাত অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে দখলদার ইসরায়েলের আগ্রাসন। হামলার সাত মাস পেরিয়ে গেলেও যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ নেই এখন পর্যন্ত। যুদ্ধবিরতির নানা আলোচনাও ভেস্তে গেছে আগে। যুদ্ধ কবে থামবে তা জানে না কেউ। এর মধ্যে অবশ্য বিশ্বজুড়ে নানামুখী চাপে পড়েছে ইসরায়েল। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) ইতিমধ্যে গাজায় অভিযান বন্ধ করার রায় দিয়েছে। তবে দক্ষিণ আফ্রিকার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত শুক্রবার আদালতের এই রায়ের পর উল্টো হামলা বাড়িয়েছে ইসরায়েল। এর মধ্যে অবশ্য ইউরোপের তিন দেশ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে। আইসিজেতে করা আফ্রিকার গণহত্যা মামলার অংশ হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে মেক্সিকো। ব্রাজিল তাদের রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে ইসরায়েল থেকে। ইসরায়েলের সম্পর্ক খারাপ হয়েছে প্রতিবেশী মিসরের সঙ্গেও। এরমধ্যে খবর পাওয়া গেছে গাজা-মিসর সীমান্তে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘ফিলাডেলফি করিডরের’ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। পাশাপাশি দেশটি জানিয়েছে, এখনই গাজায় অভিযান বন্ধ করার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। গাজায় যুদ্ধ চলতে পারে আরও সাত মাস। অর্থাৎ চলতি বছরের শেষ পর্যন্ত গাজায় যুদ্ধ চলতে পারে।
এদিকে আলজাজিরা জানাচ্ছে, আগের ২৪ ঘণ্টায় অর্থাৎ বুধবার দিন ও রাতে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় গাজা জুড়ে আরও অন্তত ৫৪ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে আরও ৩৫৭ জন। হতাহতদের মধ্যে বেশিরভাগই নারী ও শিশু।
সব মিলিয়ে গত ৭ অক্টোবর হামাসের নজিরবিহীন হামলার মধ্য দিয়ে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে, তাতে গাজায় মোট নিহতদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার ২২৪ জনে। এ ছাড়া পশ্চিম তীরে নিহত হয়েছে আরও কয়েক’শ মানুষ। দুই অঞ্চলের আহত মানুষের সংখ্যাও ৮০ থেকে ৮৫ হাজার। আর এখনো নিখোঁজ আছে ১৩ হাজার। অন্যদিকে হামাসের হামলায় প্রায় ১৩০০ ইসরায়েলির মৃত্যু হয়েছে; যাদের মধ্যে আছেন সেনা সদস্যও।
ইসরায়েল বলছে, তারা যতদিন না হামাসকে নির্মূল করতে পারবে ততদিনই তারা হামলা চালিয়ে যাবে। ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জাচি হানেবি অবশ্য ইঙ্গিত দিয়েছেন এই অভিযান চলতে পারে আরও সাত মাস। গত বুধবার ইসরায়েলের সরকারি রেডিও কানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা জানান হানেবি। হানেবি বলেন, ‘হামাস ও প্যালেস্টাইন ইসলামিক জিহাদের (পিআইজে) সামরিক ও শাসন করা সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করতে আরও সাত মাস যুদ্ধ চলবে বলে মনে করছি।
শুধু তাই নয়, তিনি জানান এ লক্ষ্যে ইতিমধ্যে তারা নানা পদক্ষেপও নিয়েছেন যার মধ্যে আছে গাজা-মিসর সীমান্ত জুড়ে বাফার জোনের ৭৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। হানেবি রাফা শহরে চলমান অভিযানের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে বলেন, ২০০৭ সালে হামাস গাজার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে সীমান্ত সংলগ্ন এলাকাকে চোরাচালানের রাজ্য হিসেবে গড়ে তুলেছে। তিনি দাবি করেছেন, ওই এলাকায় ২০টি সুড়ঙ্গ পাওয়া গেছে, যে পথ দিয়ে অস্ত্র পাচার করে আসছিল হামাস।
তবে মিসরীয় টিভি দেশটির কর্মকর্তার বরাতে বলেছে, ওই সুড়ঙ্গের কথা বলে ইসরায়েল গাজার দক্ষিণের শহর রাফায় তাদের অভিযানকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে। মিসরের উচ্চ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা আল-কাহেরা নিউজকে বলেছেন, রাফায় অভিযান চলমান রাখতে ইসরায়েল এখন হামাসের সুড়ঙ্গের ধুয়া তুলছে এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে চাইছে।
হামাসের বিরুদ্ধে অভিযানের কথা বলে ইসরায়েল তিন সপ্তাহ আগে রাফা ক্রসিং পয়েন্টের গাজা অংশের নিয়ন্ত্রণ নিলে মিসরের সঙ্গে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। এ সপ্তাহর শুরুতে রাফা সীমান্তে ইসরায়েল সেনাদের সঙ্গে গোলাগুলিতে এক মিসরীয় সেনা নিহত হন। মিসর বরাবরই ফিলিস্তিনকে সমর্থন দিয়ে আসছে এবং গাজায় ইসরায়েলি অভিযানে হাজারো বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির নিন্দা জানিয়ে আসছে।
২০০৬ সালে হামাস ক্ষমতায় আসার পর ইসরায়েলের মতো মিসরও গাজা সীমান্ত বন্ধ রেখেছে। তবে হামাসের সঙ্গে যোগাযোগের পথ তারা খোলা রেখেছে এবং ইসরায়েলের সঙ্গে হামাসের যুদ্ধবিরতির আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে দেশটি।
এদিকে মেক্সিকো ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আইসিজের গণহত্যা মামলায় যোগদানের কথা জানিয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকা ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গণহত্যা সংক্রান্ত জাতিসংঘের কনভেনশন ভঙ্গ করার দায়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মামলাটি করেছিল। সেই মামলার অংশ হওয়ার জন্য আইসিজের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে মেক্সিকো। বিষয়টি গত বুধবার আইসিজে থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। আইসিজের বিবৃতি অনুসারে, মেক্সিকো আইসিজে আইনের ৬৩ অনুচ্ছেদ এবং জাতিসংঘের ১৯৪৮ সালের গণহত্যা প্রতিরোধ ও শাস্তি সংক্রান্ত কনভেনশন কীভাবে গাজায় চলমান গণহত্যার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সে বিষয়ে মতামত দিতে আগ্রহ দেখিয়েছে। এর আগে তুরস্ক, লিবিয়া, নিকারাগুয়া এবং কলম্বিয়াও এ মামলায় যোগ দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিল।
এদিকে গাজায় ইসরায়েলের হামলা ঘিরে দেশটির সঙ্গে কয়েক মাস ধরে টানাপড়েন চলছিল ব্রাজিলের। এ উত্তেজনার মধ্যেই ইসরায়েলে নিযুক্ত ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট লুলা ডা সিলভা। গত বুধবার প্রজ্ঞাপন জারি করে ইসরায়েল থেকে রাষ্ট্রদূত ফ্রেডেরিকো মেয়ারকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার ঘোষণা দেয় ব্রাজিল। ইসরায়েল অবশ্য ব্রাজিলের এ পদক্ষেপের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। ফ্রেডেরিকো মেয়ারকে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় বদলি করা হয়েছে। সেখানে তিনি জাতিসংঘে ব্রাজিলের স্থায়ী মিশনে যোগ দেবেন।