সেমিনারে ডা. বিমল ছাজেড়

অর্থনৈতিক কারণে বাইপাস সার্জারি ও রিংয়ের ব্যবহার বাড়ছে

অর্থনৈতিক কারণে বাইপাস সার্জারি ও রিংয়ের ব্যবহার বাড়ছে বলে মন্তব্য করেছেন হৃদরোগ ও লাইফস্টাইল বিশেষজ্ঞ ভারতের প্রখ্যাত চিকিৎসক ডা. বিমল ছাজেড়। তিনি বলেন, ভারতে বছরে ৩৫ লাখ মানুষ মারা যায় হার্টের অসুখে। বাংলাদেশেও হার্টের অসুখে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। মানুষ বড় বড় হাসপাতাল দেখেই মনে করেন অপারেশন করিয়ে ফেলি। অথচ এটা যে প্রকৃতির বিপক্ষে তা তারা বুঝতে চায় না। বাইপাস করার পরও আবার সেই হার্টের সমস্যা ফিরে আসে। কেননা হার্টের কাটাছেঁড়া আমাদের শরীরের প্রকৃতিবিরোধী।

গতকাল শুক্রবার সকালে রাজধানীর জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ভবনের শহীদ ক্যাপ্টেন শেখ কামাল অডিটোরিয়ামে সাওলের সেমিনারে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ডা. বিমল ছাজেড় এসব কথা বলেন।

সকাল ৯টায় সাওল হার্ট ও লাইফস্টাইলের এ সেমিনার শুরু হয়। সায়েন্স অ্যান্ড আর্ট অব লিভিং যার সংক্ষিপ্ত নাম সাওল, বাংলায় বলা যায় বিজ্ঞানসম্মতভাবে বাঁচার শিল্পিত কৌশল। এ পদ্ধতিতে বিনা রিং, বিনা অপারেশনে হার্ট ব্লকের চিকিৎসার পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, যোগব্যায়াম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জীবনযাপন পদ্ধতি পরিবর্তনের দ্বারা হৃদরোগীরা সুস্থ হতে পারবেন। আমেরিকার বিখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ডিন অর্নিশ এ চিকিৎসা পদ্ধতির উদ্ভাবন করেন।

ডা. বিমল ছাজেড় বলেন, ‘আগে দিল্লিতে ২টা হাসপাতাল ছিল, এখন ২৫টা। আগের চেয়ে এই ভবনগুলো আরও বড় হয়েছে, কিন্তু রোগী কমছে না। ইন্ডিয়ান চিকিৎসকদের দেখেছি তারা হার্ট অ্যাটাকের প্রকৃত কারণ না খুঁজে কেবল বাইপাস কিংবা রিং পরানোকেই সমাধান মনে করেন। কিন্তু এর ফলাফল হিসেবে আমরা রোগীর সংখ্যা কিংবা মৃত্যু কমতে দেখছি না। আমরা যদি যেসব কারণে হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে তার কারণ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে পারি কেবল তবেই হার্টের অসুখ থেকে মানুষের মুক্তি মিলবে। তাই আমি এই কাটাছেঁড়ার বিপক্ষে গিয়ে নিজেদের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে হার্টের সুস্থতার পক্ষে।’

সেমিনারে সাওলের তিন শাখা ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের পাশাপাশি সারা দেশ থেকে মানুষ অংশ নেয়। বিভিন্ন সেশনে ডা. বিমল ছাজেড় বক্তব্য দেন এবং সাওল চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে অব্যহিত করেন। সেমিনারে অংশ নেওয়া মানুষদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরও দেন তিনি।

সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘হৃদরোগ এখন ধনী-গরিব সবার হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবার অতি বাণিজ্যিকীকরণের ফলে অনেক রোগ সৃষ্টি হচ্ছে। ওষুধ বিক্রি করতে এক ধরনের চাপ থাকে। আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মধ্যে অতি বাণিজ্যিকীকরণ ঢুকে পড়েছে। একে প্রতিহত করা দরকার। নিজের স্বাস্থ্যের দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হবে। স্বাস্থ্য ভালো রাখার সহজ নিয়মকে মেনে চলতে হবে। আমি মনে করি, হৃদরোগ হবে না সেই জায়গায় যাওয়াটা সমাজের এজেন্ডা হওয়া উচিত। ডা. বিমল ছাজেড়, মোহন রায়হানরা যে লড়াই চালাচ্ছেন সেখানে আমাদের একাত্মতা জানাতে হবে। আশা করি এটা একটা সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হবে।’

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম বলেন, ‘দুনিয়ায় মানুষকে পাঠানো হয়েছে খাওয়ার জন্য। এখন সিঙ্গারা খেতে পারব না, পুড়ি খেতে পারব না এটা মানতে পারি না। কিন্তু সাওল বলে সুস্থ থাকতে তেলযুক্ত খাবার পরিহার করতে হবে, মসলাকে না বলতে হবে। খাবারের স্বাদ যতক্ষণ মুখে থাকে সেই পর্যন্ত। অথচ রসনার এই স্বল্প সময়ের পরিতৃপ্তির জন্য আমরা নিজেদের ক্ষতি করছি। আমরা অল্প মসলা অল্প তেলের খাবারে অভ্যস্ত হলেই রোগ থেকে মুক্তি মিলবে এমনটাই বলে থাকে সাওল।’

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘মানুষের ভালো থাকার সুস্থ থাকার ক্রমাগত চেষ্টার মাধ্যমে আয়ু বেড়েছে। স্বাস্থ্যবিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের কিছু মৌলিকবিষয় রয়েছে। মানুষের খাবারের যে ক্রমবর্ধমান বিবর্তন তার দিকে তাকালে দেখা যায় ফল, শাকসবজি ও লতাপাতা দিয়ে মানুষের খাবার গ্রহণ শুরু হয়। এরপর মানুষ শস্যদানা হয়ে, ছোট প্রাণী হয়ে এখন বড় বড় প্রাণী খাবার হিসেবে গ্রহণ করছে। কোনো প্রাণী খাবারে লবণ ও মসলা গ্রহণ না করলেও মানুষ করে। ফলে আমাদের পরিপাকতন্ত্রে ক্ষতি হয়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিংবা কম খেলে তার প্রভাব আমাদের জীবনে পড়ে।’

সাওল হার্ট সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা কবি মোহন রায়হান অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া অতিথি ও দর্শকদের স্বাগত জানান। তিনি বলেন, ‘সাওল পদ্ধতি মানুষের সুস্থ থাকার পদ্ধতি খুঁজে দিতে চায়। সাওলকে একটা আন্দোলনে পরিণত করতে চাই। আমরা দেশের একটা মানুষকেও হার্ট অ্যাটাকে মারা যেতে দিতে চাই না।’