পরামর্শকদের বেতন বৃদ্ধি করেছে বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ-বেবিচক। পরামর্শকদের বেতন শতভাগ এবং বাকিদের ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা আগামী ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে। বিষয়টি বেবিচকের ২৯৩তম বোর্ডসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে অনুমোদিত হয়েছে। সভায় এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমতি সাপেক্ষে বেতন বাড়ানোর কথা বলা হলেও, সে পথে হাঁটেনি বেবিচক।
বেবিচক বলছে, এর আগে কমিটির মতামতের ভিত্তিতেই পরামর্শকদের ফি বৃদ্ধি করা হয়েছিল। তাছাড়া বেবিচক কর্তৃপক্ষ একটি সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান এবং বোর্ড কর্তৃক পরিচালিত হওয়ায় পরামর্শকদের ফি বৃদ্ধির ক্ষমতা বোর্ড সংরক্ষণ করে। তাই অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান বা অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতামত নেওয়ার প্রয়োজন নেই।
এদিকে পরামর্শকদের বেতন বৃদ্ধি করায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন বেবিচকের কর্মচারীরা। তারা বলছেন, যারা বেবিচকের স্থায়ী কর্মচারী তারা যোগ্যতা ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করলেও তাদের বেতন অনেক কম। অন্যদিকে পরামর্শকরা চুক্তিভিত্তিক হলেও তাদের বেতন অনেক বেশি। তার ওপর তাদের বেতন বৃদ্ধির ফলে বেবিচক কর্মচারী ও পরামর্শকদের বেতনের মধ্যে বিশাল পার্থক্য দেখা দিয়েছে। একই কাজ করে পরামর্শকরা বেশি বেতন পেলেও কর্মচারীরা কম বেতনে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন, এটা অন্যায়।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন বিভাগে বর্তমানে ৫৪ জন সিনিয়র কনসালট্যান্ট, কনসালট্যান্ট, বিশেষ পরিদর্শক, জুনিয়র কনসালট্যান্ট, ডিএফওআই, ডিএমই, অ্যাভিয়েশন আর্টনি পদে চুক্তি ভিত্তিতে পরামর্শক খাতে কাজ করে যাচ্ছেন। এর মধ্যে ফ্লাইট স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড রেগুলেশনস বিভাগেই কর্মরত রয়েছেন ৪৯ জন, অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি বিভাগে চার ও ফাইন্যান্স বিভাগে একজন পরামর্শক কর্মরত আছেন। বোর্ডসভায় উপস্থাপিত পরামর্শকদের বেতন বৃদ্ধিসংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ৫৪ জন পরামর্শকের মধ্যে সাতজন ডেজিগনেটেড ফ্লাইট অপারেশনস ইন্সপেক্টর ও চারজন অ্যাভিয়েশন মেডিকেল এক্সামিনার (খণ্ডকালীন হিসেবে কর্মরত) ছাড়া বাকি সবাই সার্বক্ষণিকভাবে কর্মরত আছেন। এ পরামর্শকরা নিয়মিত কর্মকর্তাদের মতোই সার্বক্ষণিকভাবে দাপ্তরিক কাজে নিয়োজিত আছেন। তারা রেগুলেটরি ডকুমেন্ট প্রস্তুত থেকে শুরু করে নিয়মিতভাবে রেগুলেটরি অডিট সম্পন্ন করে থাকেন। তাদের নিরন্তর পরিশ্রমের ফলে বর্তমানে কর্তৃপক্ষের রেগুলেটরি কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। ২০১২ সালের ওঈঅঙ ঈড়ড়ৎফরহধঃরড়হ ঠধষরফধঃরড়হ গরংংরড়হ (ওঈঠগ) নামক অডিটে বাংলাদেশকে কালো তালিকা থেকে মুক্ত করা ও ২০১৭ সালে ওঈঅঙ অডিটে আন্তর্জাতিক মানদন্ডে বাংলাদেশের অ্যাভিয়েশনের রেগুলেটরি কার্যক্রমকে অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করার (ওঈঅঙ সেফটি রেটিং ৭৫.৩৪ শতাংশ এবং সিকিউরিটি রেটিং ৭৭.৭ শতাংশে উন্নীত হওয়া) পেছনে নিয়মিত কর্মকর্তাদের পাশাপাশি এসব চুক্তিভিত্তিক পরামর্শকদের ভূমিকা রয়েছে।
বেবিচকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেবিচকে কর্মরত পরামর্শকদের বেতন কাঠামো সর্বশেষ গত ২০১৬ সালে কর্তৃপক্ষের পর্ষদ সভায় ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছিল। সেই বেতনের সঙ্গে বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট কোনো বিধান বিদ্যমান না থাকায় ২০১৬ সালের পর হতে একই বেতনে উপর্যুক্ত চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তারা কর্মরত আছেন। গত আট বছরে দ্রব্যমূল্যের ক্রমবর্ধমান ঊর্ধ্বগতি ও মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফলে দেশের বর্তমান আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট ও মূল্যস্ফীতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে চুক্তিভিত্তিক এসব কর্মকর্তাকে বেতন বা পরামর্শক ফি বৃদ্ধি প্রয়োজন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সরকারের সব শ্রেণির নিয়মিত কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বেতন প্রতি বছর নির্ধারিত হারে বৃদ্ধির বিধান থাকায় তারা প্রতি বছর বেতন বৃদ্ধিসহ পেনশন সুবিধা ও অন্যান্য ভাতা প্রাপ্য হন। অন্যদিকে ২০১৬ সালের পর থেকে উল্লিখিত চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তাদের বেতন বা পরামর্শক ফি অপরিবর্তিত আছে এবং পূর্ব অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি অনুমেয়, এ পর্যায়ে বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব অনুমোদিত হলেও ভবিষ্যতে আরও চার-পাঁচ বছর বর্ধিত বেতন স্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
গত ২৯ মে অনুষ্ঠিত বোর্ডসভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়, প্রতিবেদনে পরামর্শকের বেতন ১০০ শতাংশ এবং বাকিদের ২৫ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়। সভায় বিস্তারিত আলোচনার পর সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে ফ্লাইট স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড রেগুলেশনস বিভাগে কর্মরত তিনজন সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও ফ্লাইট অপারেশনস ইন্সপেক্টর, দুজন স্পেশাল ইন্সপেক্টর (সিনিয়র ফ্লাইট অপারেশনস), দুজন জুনিয়র এয়ার ট্রান্সপোর্ট কনসালট্যান্ট ও দুজন জুনিয়র লাইসেন্সিং কনসালট্যান্টের পরামর্শক ফি ১০০ শতাংশ এবং অন্যান্য পরামর্শকের (সব বিভাগ) পরামর্শক ফি ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয় বোর্ড। এ ছাড়া সভায় পরবর্তীকালে অন্যান্য দেশের এ সংক্রান্ত নীতিমালা যাচাই-বাছাই করে একটি সমন্বিত নীতিমালা তৈরির মাধ্যমে পরামর্শকদের ফি বৃদ্ধিসংক্রান্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নির্দেশনা দেওয়া হয়।
সভায় উপস্থিত বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি যুগ্ম সচিব মুহম্মদ আশরাফ আলী ফারুক কনসালট্যান্টদের ফি বৃদ্ধিতে আর্থিক সংশ্লেষ রয়েছে, এজন্য প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতামত নেওয়ার কথা জানান। এ পরিপ্রেক্ষিতে সভায় বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মফিদুর রহমান বলেন, বেবিচক কর্তৃপক্ষ একটি সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান এবং বোর্ড কর্তৃক পরিচালিত হওয়ায় পরামর্শকদের ফি বৃদ্ধির ক্ষমতা বোর্ড সংরক্ষণ করে। তাই অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান বা অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতামত নেওয়ার প্রয়োজন নেই।
এ বিষয়ে বেবিচকের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, দ্রব্যমূল্য সবার জন্যই বেড়েছে। একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পরও স্থায়ী কর্মচারীদের বেতনের বেশি চুক্তিভিত্তিক পরামর্শকদের বেতন বেশি হওয়া প্রত্যক্ষ বৈষম্য। এতে কাজের গতি কমে যাবে। স্থায়ী কর্মচারীদের বেতন প্রতি বছর বাড়লেও পরামর্শকদের বেতন অনেক বেশি বাড়ানো হয়েছে।