লোকসভা ভোটের পালা শেষ হলো! মানুষ ভোট দিতে পারল! মঙ্গলবার দিনভর গণনা হলো। বুধবার সকালে প্রকাশ্যে এলো, চূড়ান্ত ফলাফল! একদলীয় শাসনের ইতি হলো। লোকসভায় ফিরছে বিরোধী দলনেতার পদ। কার ভাগ্যে যাচ্ছে, দিল্লির মসনদ? যদিও ৩০০ আসন টপকাতে পারেনি বিজেপি, যদিও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি দলটি, যদিও কোনো মতে পার হতে পেরেছে ম্যাজিক ফিগার, তবু এ কথা বলে দেওয়া যায়, আবারও সরকার গঠন করতে যাচ্ছেন মোদি! তবে কথা কিন্তু আছে; যদিও এনডিএ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে গেছে, তবুও তাদের ঘাড়ে কার্যত নিঃশ্বাস ফেলছে ইনডিয়া জোট। যে জোটের অন্যতম শরিক কংগ্রেস। চাল ওলটপালট হলে সরকার গড়ার চেষ্টা করতে পারে তারাও। বলা হচ্ছিল, ইতিহাস গড়তে যাচ্ছেন মোদি! বলা হচ্ছিল, ভূমিধস বিজয় আসছে! ডিজিটাল আওয়াজ চলেছিল লাগাতার বিরামহীন! বুথ ফেরত জরিপের নানা আস্ফালনে সোচ্চার ছিল প্রচার মাধ্যম! গণমাধ্যমও! সব ফিকে করে দিল বুধবারের ফল গণনা! বিজেপির তরী এক ধাঁধার মধ্যে পড়ে গেছে কার্যত! তাতে অনেকগুলো ফুটো আবিষ্কৃত হলো! বিজেপির প্রতি প্রত্যাশার যে চিত্র ছিল, তার অনেকটাই বদলে গেল! ধর্মের ভিত্তিতে ভোটারদের মেরূকরণের চেষ্টা বিজেপির একটা পরীক্ষিত কৌশল! এ বিষয়ে তাদের যে যুক্তি তা অতি সহজ।
জনসংখ্যার হিসাবে মোট জনসংখ্যার অর্ধেকও যদি টেনে আনা যায়, তাহলে আরও একবার বিজয় নিশ্চিত! কিন্তু এই হিসাব ভ-ুল হয়ে গেছে! মোদির গর্বের হিন্দি হার্টল্যান্ড-এ মোদি ম্যাজিক এবার কাজে দেয়নি। মোদির নাম দিয়ে ভোটের লড়াই সত্ত্বেও তাদের ঝুলিতে আসন সংখ্যা মাত্র ২৪১। ৩৭০ টার্গেট থেকে নেমে যেতে হলো আগেই! ম্যাজিক সংখ্যাটাও পেরুতে পারল না দলটি! অথচ ২০১৪ এবং ২০১৯-এ অনায়াসে তা অতিক্রম করে গিয়েছিল তারা। এবার কিং মেকার হয়ে উঠতে পারেন তেলুগু দেশম পার্টির চন্দ্রবাবু নাইডু, হতে পারেন জে ডি’র নীতিশ কুমারও! ১৬ ও ১৮টি আসন নিয়েই জমে উঠতে পারে খেলা! বুথফেরত সমস্ত পূর্বাভাস কার্যত ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। এক দেশ এক ভোট, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি, রামমন্দির নির্মাণ, কোনো কিছু কাজে দিল না। মাত্র ১১ মাস আগে গড়া একটি জোট, ইনডিয়া যার নামকরণে ভূমিকা রাখেন মমতা, যাকে প্রচার পর্বের আগাগোড়া কটাক্ষ করে গেছে মোদি-অমিত শাহ গং তারাই আটকে দিল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথ।
প্রশ্ন হলো, যেমন করেই হোক না কেন, বিজেপির এই বিজয় আমাদের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে কিনা? নিকটতম বড় প্রতিবেশী দেশে সরকার গঠন হলে যে প্রভাব পড়ার কথা, সেই প্রভাব অবশ্যই পড়বে! সেই প্রভাবে আকাশ পাতাল ফারাক তৈরি হবে না। সেই প্রভাবে ফরেন পলিসিতে পরিবর্তন ঘটবে না। সেই প্রভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যে হেরফেরও হবে না। স্বার্থের সংঘাতও নতুন করে তৈরি হবে না। মোদির বদলে ইনডিয়া জোট ক্ষমতায় গেলে যে কোনো প্রভাব তৈরি হয়ে যেত, তেমনটা হওয়ার পূর্ব ইতিহাসও নেই। ভারত ভারতই। যেই ক্ষমতায় যাক না কেন, স্বার্থের প্রশ্নে এক চুল ছাড় দেবে না সে দেশের কোনো সরকার। মোদির এক্সট্রিম সরকার গঠনের তুলনায় ঝুলন্ত সরকার আঞ্চলিক ভারসাম্যের প্রশ্নে, গণতান্ত্রিক, উদারনৈতিক মানস কাঠামোর জনমানুষের আকাক্সক্ষার প্রশ্নে, তুলনামূলক ভাবে বেটার বলে বিবেচিত হতে পারে! আগের নির্বাচনে লোকসভায় বিজেপির আসন সংখ্যা ছিল ৩০৩! এবার তারা ৬৩ আসন কম পেয়েছে! তাই সরকার গঠনের জন্য বিজেপিকে এনডিএ জোটের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে! এই জোটে বিহারের নীতিশ কুমার ও অন্ধ্রপ্রদেশের চন্দ্রবাবু নাইডুর দলের মিলিত আসন সংখ্যা তিরিশের মতো। এই দুজনই খুব অনির্ভরযোগ্য মিত্র। এদের সমর্থন ও করুণার ওপর ভর করেই বিজেপিকে সরকার গড়তে হবে। বিজেপির বিপরীতে সরকার গড়তে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইনডিয়া জোটও নীতিশ ও নাইডু-সহ বিজয়ী আরও কিছু ছোট দলের সমর্থন লাভের উদ্দেশ্যে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে!
‘বলেছিলাম নিঃশব্দ বিপ্লব হবে! যত সময় যাবে তত বিপ্লবের তেজ দেখতে পাবেন’ এই বক্তব্য ছিল মোদি সমর্থিত বর্তমান ভারতের সবচেয়ে দাপটশালী মিডিয়ার এক কথিত দায়িত্বশীল কর্মীর! মোদি ঝড়ের আগাম পূর্বাভাস প্রচারে দায়িত্বশীলতার আড়ালে মিডিয়া কীভাবে পক্ষপাত প্রচার অব্যাহত রেখেছিল, ফল গণনা শুরুর ৪ ঘণ্টা আগের চিত্র তা।
এবার বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আসি। কখন, কোন সরকার পেরেছে সরাসরি ভারতের বিরুদ্ধাচরণ করতে? নাকি এটা সম্ভব! মনে রাখতে হবে, আমাদের ভৌগোলিক অবস্থানটাই এমন যে, তিন দিকে ভারত। আরেক দিকে বঙ্গোপসাগর। কোথায় যাব আমরা? এই কারণেই পাশর্^বর্তী দেশ ভারতের সঙ্গে কৌশলে কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা করতে হবে। এটা তো বলতে দ্বিধা নেই যে, ভারত আমাদের মিত্র দেশ! যদি কেউ এমন কথাও অস্বীকার করেন, তাহলে বলতে হবে, তিনি অন্য কোনো কারণে করছেন। যার সঙ্গে পররাষ্ট্রনীতি বা কূটনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। এই কথাও মনে রাখা দরকার যে, পাশর্^বর্তী দেশের সঙ্গে বিবাদ রেখে বেশি দূর অগ্রসর হওয়া অসম্ভব। আর ভারত তো যেমন তেমন দেশ নয়! তার সঙ্গে চলতে হবে কৌশলেই। এই কৌশলকে যারা, অন্য কিছু বলবেন বলতে দ্বিধা নেই, কূটনীতি সম্পর্কে তাদের মাত্রাজ্ঞান খুবই কম। আমাদের যে কথা কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব। এই বন্ধুত্বের কারণেই ভারত এগিয়ে এসেছে ঐতিহাসিক কারণেই। এখন আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে, নিজের স্বার্থ অক্ষুন্ন রেখে, কৌশলে অর্থনৈতিক উন্নতির দিকে যাওয়া। এর বাইরে যা রয়েছে, তার সমাধান করতে হবে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমেই। এটাই পররাষ্ট্রনীতি। আমরা আমাদের নীতিতে অটল যদি থাকি, তাহলে এ বিষয়ে কারও কোনো কথাই থাকতে পারে না।
কেউ কী বলতে পারে, নিজস্ব সামান্য হলেও স্বার্থ ছাড়া কেউ বাংলাদেশকে সেবা দিয়েছে? আমাদের সম্মান এবং মর্যাদা আমাদেরই ধরে রাখতে হবে। এখানে কেউ কাউকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসবে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের পক্ষের মানুষ অবশ্যই চাইবেন নিজেদের স্বকীয়তা। সেটাই আসল কথা। এ ক্ষেত্রে বিজেপি ক্ষমতায় আবার এসেছে বলেই, গেল গেল রব তোলার কোনো অর্থ হয় না। নিজের অধিকার, সম্মান নিজেকেই রক্ষা করতে হয়। সে ক্ষেত্রে ভারত কোনো বাধা হবে বলে মনে হয় না। অন্তত বিজেপির এতদিনের আচরণে তাই-ই মনে হয়েছে। বাকিটা নির্ভর করে আমাদের কূটনৈতিক যোগ্যতা এবং সাহসিকতার ওপর। ইতিহাসে কিন্তু তার প্রমাণ আছে। বাংলাদেশে নিজের পরিচয় এবং অধিকার সম্পর্কে বরাবরই সচেতন। এটা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। বর্তমান সরকার ভারতের নতুন সরকারের আস্থাভাজন আগেই হয়েছে, এবার আরও পোক্ত হবে। দ্বিপক্ষীয় সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা থাকবে। সম্ভবত এটাই হবে বর্তমান সরকারের কৌশল। আর যা কিছু শোনা যায়, তা কেবলই ভিত্তিহীন এবং মুখরোচক। এর কোনো বাস্তব চেহারা নেই। ভারতের নতুন সরকারের (যদিও পুরনো প্রধানমন্ত্রী) শতভাগ প্রভাবমুক্ত থাকবে, এমনটি আশা করাই যায়। অতীত কিন্তু সেই কথাই বলে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও নির্বাহী পরিচালক, স্পিক আউট ফাউন্ডেশন
supan@speakout.com.bd