কোরআনের বর্ণনায় কোরবানি

কোরবানির শাব্দিক অর্থ নৈকট্য অর্জন করা। শরিয়তের পরিভাষায় আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের আশায় জিলহজ মাসের দশ, এগারো ও বারো তারিখের যে কোনো একদিন নির্দিষ্ট পশু জবাই করাকে কোরবানি বলা হয়। কোরবানি সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে একাধিক বর্ণনা হয়েছে। কোরবানির নিয়ত এবং বিভিন্ন নবীর যুগে কোরবানির ইতিহাস সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

কোরবানির নিয়ত সঠিক হওয়া : মানুষের প্রত্যেক আমল তার নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। আর মহান আল্লাহই আমাদের প্রত্যেক ইবাদতের হকদার। তাই কোরবানি পরিশুদ্ধ করতে প্রয়োজন নিয়তকে পরিশুদ্ধ করা। কোরবানির পশু আল্লাহর নামে উৎসর্গ করা। আল্লাহতায়ালা নবী (সা.)-কে উদ্দেশ করে বলেন, ‘হে নবী! তাদের বলুন, আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন, আমার মরণ এবং আমার সবকিছুই বিশ্ব জাহানের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য। তিনি একক ও অদ্বিতীয়। এ আদেশই আমি পেয়েছি। আমি সমর্পিতদের মধ্যে প্রথম।’ ( সুরা আনআম ১৬২-১৬৩)

আদম (আ.)-এর সন্তানদের কোরবানি : আল্লাহ মানুষকে পরিশুদ্ধ করার জন্য পৃথিবীর শুরু লগ্ন থেকেই কোরবানির নির্দেশ দিয়েছেন। আদম (আ.)-এর দুই সন্তান হাবিল ও কাবিল সর্বপ্রথম কোরবানি দিয়েছেন। আহলে কিতাবদের সেই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়ার জন্য আল্লাহ বলেন, ‘হে নবী! আহলে কিতাবদের আদমের দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের ঘটনা ভালো করে বর্ণনা করুন। তারা যখন কোরবানি করেছিল তখন একজনের কোরবানি কবুল হলো। কিন্তু অন্যজনের কোরবানি কবুল হলো না। ক্ষিপ্ত হয়ে সে বলল, আমি তোমাকে খুন করব। অপরজন বলল, আল্লাহ তো শুধু মুত্তাকিদের কোরবানিই কবুল করেন।’ ( সুরা মায়েদা ২৭)

ইব্রাহিম (আ.)-এর কোরবানি : কোরবানি ধারাবাহিকভাবে প্রত্যেক নবীর যুগেই ছিল। আমাদের কোরবানি হজরত ইব্রাহিম ও ইসমাইল (আ.)-এর যুগ থেকে এসেছে। মহান আল্লাহ ইব্রাহিম (আ.)-কে পরীক্ষা করার জন্য তার নিজ সন্তান ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘ছেলে যখন পিতার কাজকর্মে অংশগ্রহণ করার মতো বড় হলো, তখন ইব্রাহিম একদিন তাকে বলল, হে আমার প্রিয় পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখেছি, তোমাকে কোরবানি দিতে হবে। এখন বলো, এ ব্যাপারে তোমার মত কী? ইসমাইল জবাবে বলল, ‘হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তাই করুন। ইনশাল্লাহ, আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে বিপদে ধৈর্যশীলদের একজন হিসেবেই পাবেন।’

( সুরা সাফফাত ১০২)

আল্লাহতায়ালা অন্য আয়াতে আরও বলেন, ‘মনে রেখো, এ ছিল এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তাকে মুক্ত করলাম এক মহান কোরবানির বিনিময়ে। আর এ বিষয়টি পরবর্তীদের জন্য স্মরণীয় করে রাখলাম। ইব্রাহিমের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত করে থাকি।’ (সুরা সাফফাত ১০৬-১১০)

রাসুল (সা.)-এর কোরবানি : একজন মুসলমানের নামাজ যেমন আল্লাহর জন্য ঠিক তেমনি কোরবানিও আল্লাহর জন্য হওয়া উচিত। কোরবানির পশু ক্রয়ে লৌকিকতা না করা। আল্লাহতায়ালা নবী (সা.)-কে এ সম্পর্কে বলেন, ‘অতএব আপনি আপনার প্রতিপালকের জন্যই নামাজ আদায় ও কোরবানি করুন। নিশ্চয় আপনার প্রতি যে বিদ্বেষ পোষণ করবে, বিলুপ্ত হবে তার বংশধারা।’ ( সুরা কাওসার ২-৩)

কোরবানি যুগে যুগে নবীদের ইবাদত : আল্লাহতায়ালা প্রত্যেক নবীর যুগে যেসব ইবাদত ধার্য করেছেন তন্মধ্য থেকে কোরবানি অন্যতম। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে এ সম্পর্কে বলেন, ‘আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কোরবানিকে ইবাদতের অংশ করেছি। যাতে জীবনোপকরণ হিসেবে যে গবাদিপশু তাদের দেওয়া হয়েছে, তা জবাই করার সময় তারা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। আর সব সময় যেন মনে রাখে একমাত্র আল্লাহই তাদের উপাস্য। অতএব তার কাছেই পুরোপুরি সমর্পিত হও। আর সুসংবাদ দাও সমর্পিত বিনয়াবনতদের, আল্লাহর নাম নেওয়া হলেই যাদের অন্তর কেঁপে ওঠে, যারা বিপদে ধৈর্যধারণ করে, নামাজ আদায় করে এবং আমার প্রদত্ত জীবনোপকরণ থেকে দান করে।’ ( সুরা হজ ৩৪-৩৫)

কোরবানি ইসলামের বিশেষ প্রতীক : প্রতি বছর পৃথিবীতে কোটি কোটি পশু কোরবানি করা হয়। কোরবানি নবী (সা.)-এর উম্মতের জন্য মিল্লাতে ইব্রাহিমের সুন্নত। মহান আল্লাহ কোরবানির গোশত সবাইকে নিয়ে সম্মিলিতভাবে ভক্ষণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। কোরবানিকে কোরআনে ইসলামের অন্যতম প্রতীকও বলা হয়েছে। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘কোরবানির পশুকে আল্লাহ তার মহিমার প্রতীক করেছেন। তোমাদের জন্য এতে রয়েছে বিপুল কল্যাণ। অতএব এগুলোকে সারিবদ্ধভাবে বাঁধা অবস্থায় এদের জবাই করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করো। এরপর এরা যখন জমিনে লুটিয়ে পড়ে, তখন তা থেকে গোশত সংগ্রহ করে তোমরা খাও, যে অভাবী মানুষের কাছে হাত পাতে না এবং যে অভাবী চেয়ে বেড়ায় তাদের সবাইকে খাওয়াও। এভাবেই আমি গবাদিপশুগুলোকে তোমাদের প্রয়োজনের অধীন করে দিয়েছি, যাতে তোমরা শুকরিয়া আদায় করো।’ ( সুরা হজ ৩৬)

কোরবানিতে তাকওয়া অবলম্বন করা : প্রত্যেক সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য কোরবানি দেওয়া ওয়াজিব। ওয়াজিব আমল ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দেওয়া পাপ। তবে কোরবানি দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় পশু বা ছোট পশু কোনো বিষয় নয়। কেননা মহান আল্লাহর কাছে পশুর রক্ত বা গোশত পৌঁছায় না। পৌঁছায় বান্দার তাকওয়া। মহান আল্লাহ কোরআনে বলেন, ‘কোরবানির গোশত বা রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, আল্লাহর কাছে পৌঁছায় শুধু তোমাদের তাকওয়া। এই লক্ষ্যেই কোরবানির পশুগুলোকে তোমাদের অধীন করে দেওয়া হয়েছে। অতএব আল্লাহ তোমাদের সৎপথ প্রদর্শনের মাধ্যমে যে কল্যাণ দিয়েছেন, সে জন্য তোমরা আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করো। হে নবী! আপনি সৎকর্মশীলদের সুসংবাদ দিন, আল্লাহ বিশ্বাসীদের রক্ষা করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ কোনো বিশ্বাসঘাতক ও অকৃতজ্ঞকে পছন্দ করেন না।’ ( সুরা হজ ৩৭-৩৮)