রাজধানীর কদমতলী এলাকায় অভিযান চালিয়ে দেশি-বিদেশি জাল নোট তৈরির একটি চক্রের হোতাসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে ডিবি জানিয়েছে, কোরবানির ঈদ সামনে রেখে জাল নোট কারবারিরা কোরিয়ারে করে মফস্বলেও জাল নোট পাঠাচ্ছেন। তাদের টার্গেট গরুর বাজার।
গতকাল শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে যে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তারা হলেন লিয়াকত হোসেন জাকির ওরফে মাজার জাকির ওরফে গুরু জাকির (৪০), তার স্ত্রী মমতাজ বেগম (২৫), লিমা আক্তার রিনা (৪০) ও সাজেদা আক্তার (২৮)।
ডিবি বলছে, কোরবানির ঈদ ঘিরে অন্যান্য বছরের মতো সক্রিয় টাকার জাল নোট কারবারিরা। সুযোগ কাজে লাগাতে রাজধানীর কদমতলীতে তৈরি করা হচ্ছিল জাল নোট। এই জাল নোট বিক্রির জন্য যোগাযোগ হতো অনলাইনে আর লেনদেন হতো মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে।
ডিবি লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার (অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) মশিউর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ২৫ বছর ধরে জাল নোট খুচরা ও পাইকারি কারবার করে আসছেন লিয়াকত হোসেন জাকির। তিনি ২০১২ থেকে ৫০০ ও ১ হাজার টাকার জাল নোটের পাশাপাশি ১০০ ও ২০০ টাকার জাল নোটও তৈরি করতেন। ১ হাজার টাকার ১০০টি নোটের বান্ডিল ১৮-২০ হাজার টাকায় বিক্রি করতেন। নারী-পুরুষ মিলে তার প্রায় ১৫-২০ জন কর্মচারী আছেন, যাদের মাসে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা বেতন দিতেন। ঝুঁকি এড়াতে অনলাইনে বিশেষত ফেসবুক ও মেসেঞ্জার দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কারবারিদের কাছ থেকে অর্ডার নিয়ে কুরিয়ারের মাধ্যমে জাল নোট দিতেন।
বিভিন্ন জেলায় জাল নোটের ছোট ছোট আস্তানা স্থাপনকারীরা জাকিরের কাছ থেকে কারিগর, সফট কপি, পরামর্শ এমনকি মডেল জাল নোট নিয়ে থাকেন বলে জাকিরকে গুরু জাকির বলে চেনেন অনেকে।
ডিবি কর্মকর্তা বলেন, জাকিরের সহযোগীরা গ্রেপ্তার হলে তিনি মাজারে মাজারে পালিয়ে থাকতেন। মাজারের কচ্ছপ, মাছের খাবার নিয়ে ব্যস্ত থাকেন বলে তাকে মাজার জাকির বলা হয়।
এই কর্মকর্তা বলেন, কয়েক দিন আগে এক নারী ৫০ লাখ টাকা মূল্যমানের জাল নোট নিয়েছেন জাকিরের কাছ থেকে। ফলে বোঝাই যাচ্ছে তারা কী পরিমাণ জাল নোট বাজারে ছাড়ছেন। চক্রে ১৫ থেকে ২০ জন এজেন্ট রয়েছেন, যারা সারা দেশে জাল টাকা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। ঈদুল আজহা সামনে রেখে গরু-ছাগল বিক্রি বা লেনদেনের সময় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে টাকা যাচাই-বাছাই করে নেওয়ার পরামর্শ দেন এই কর্মকর্তা।
একইদিন ডিবি কার্যালয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, চক্রটির বিভিন্ন জেলায় এজেন্ট আছে। ঈদ কেন্দ্র করে মফস্বল পর্যন্ত জাল টাকার চালান ছড়িয়ে দেওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন গরুর ব্যবসায়ীরা। কারণ গরু ব্যবসায়ীরা যা দাম বলে সেই দামেই এজেন্টরা গরু কিনে নেয় জাল টাকা দিয়ে। জাল টাকা পরীক্ষা করার যন্ত্রও নেই গ্রামীণ অনেক হাটে। এসব এজেন্ট খুচরায় অন্যদের কাছে জাল নোটও বিক্রি করে।
জাল নোটের কারবার রোধ করার বিষয়ে এক প্রশ্নে ডিএমপি ডিবিপ্রধান বলেন, ‘শুধু জাল টাকা না, ডাকাতি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন আসামিকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। জেলহাজত থেকে তারা কীভাবে জামিনে বেরিয়ে যান, তা আমাদের পক্ষে বলা সম্ভব নয়। নতুন করে জাল টাকার কারবারে জড়িয়ে যাওয়া কয়েকজনকে আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তারা বলেছেন, জেলে থাকা অবস্থায় জাল টাকার কারবারির সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। তাদের এজেন্ট বানানো হয়। লাখ টাকার জাল নোট বিক্রি করতে পারলে ১০-১৮ হাজার করে দেওয়া হয়। লোভে পড়ে চক্রের মাধ্যমে জড়িয়েছেন জাল টাকার কারবারে।’ কোরবানির ঈদ সামনে রেখে সবাইকে জাল নোটের বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।