নতুন অর্থমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী অর্থনীতির ছাত্র। কিন্তু তার পুরো ক্যারিয়ার কেটেছে ডিপ্লোম্যাসিতে। আমলাজীবন শেষে রাজনীতিতে এসেছেন, এমপি হয়েছেন, মন্ত্রীও হয়েছেন। মন্ত্রিত্বের প্রথম দায়িত্ব ছিল তার ক্যারিয়ারের সমান্তরাল পররাষ্ট্র। তবে আওয়ামী লীগের টানা চতুর্থ মেয়াদের সরকারে অর্থমন্ত্রী হিসেবে চমকের নাম এ এইচ মাহমুদ আলী। ক্যারিয়ারের শেষ বেলায় এসে তিনি সুযোগ পাচ্ছেন, জীবনের শুরুর পড়াশোনা কাজে লাগানোর। আগের মেয়াদগুলোয় আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন আবুল মাল আব্দুল মুহিত ও আ হ ম মুস্তফা কামাল। তবে মানতেই হবে, আওয়ামী লীগের অর্থনৈতিক নীতি বাস্তবায়িত হয়েছে এ এম এ মুহিতের হাত ধরেই। আওয়ামী লীগের উন্নয়ন পরিকল্পনা আর অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে উচ্চাকাক্সক্ষী সব বাজেট দিয়েছেন তিনি। আর সেই গতিজড়তায় পার পেয়ে গেছেন মুস্তফা কামাল। পুরো এক মেয়াদে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করলেও ছাত্রজীবনে অসম্ভব মেধার স্বাক্ষর রেখে ‘লোটাস’ উপাধি পাওয়া মুস্তফা কামালের কোনো চিহ্ন নেই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। তিনি আসলে ছিলেন অনুপস্থিত অর্থমন্ত্রী।
আওয়ামী লীগ সরকারের সবচেয়ে কঠিন সময়ে অর্থনীতি সামলানোর দায়িত্ব পেয়েছেন এ এইচ মাহমুদ আলী। নিজের জীবনের প্রথম তো বটেই, আওয়ামী লীগ সরকারের টানা চতুর্থ মেয়াদের প্রথম বাজেটটি ছিল তার জন্য সবচেয়ে চ্যালেঞ্জের। সেই চ্যালেঞ্জের ছাপ আছে তার প্রস্তাবিত বাজেটে। তবে তিনি সেই চ্যালেঞ্জ উতরাতে পারবেন কিনা, সেটা দেখার জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অর্থনীতি যে মোমেন্টাম পেয়েছিল, তা প্রথম ধাক্কা খায় কোভিডের সময়। সেই ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিকেও চাপের মুখে ফেলেছে। সেই চাপ ক্রমে বাড়ছে। ৪৮ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ এখন কমতে কমতে ১৮ বিলিয়নে দাঁড়িয়েছে। ডলারের উচ্চমূল্য আমদানিকে বিঘ্নিত করেছে। তাতে উৎপাদন কমেছে, কর্মসংস্থান কমেছে। মূল্যস্ফীতি অনেক দিন ধরেই ১০-এর কাছাকাছি স্থির হয়ে আছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে নির্ভর করতে হচ্ছে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর। সব মিলিয়ে অর্থনীতি প্রবল চাপের মুখে রয়েছে। চাপ কমার কোনো লক্ষণ নেই কোনো দিকে। এতসব চাপের সঙ্গে আছে আইএমএফের নানান শর্ত। অর্থমন্ত্রীর অবস্থা হয়েছে, সেই দরিদ্র মানুষের মতো, যার মাথা ঢাকলে পা উদোম হয়ে যায়, আবার পা ঢাকলে মাথা। কাপড় অনুযায়ী কোট বানানোর পরামর্শ বাজেটের ক্ষেত্রে খাটে না। অন্য সব ক্ষেত্রে আগে আয় হিসাব করে ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু বাজেটে আগে ব্যয়ের হিসাব করে তারপর আয়ের খাত খুঁজতে হয়। কাপড় থাকুক আর নাই থাকুক, কোট তাকে বানাতেই হবে।
অর্থনীতি স্বাভাবিক গতিতে চললে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার শেষ বছরের এই বাজেট হওয়ার কথা ৯ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা। অর্থমন্ত্রী বাজেট দিয়েছেন ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। উন্নয়ন বাজেট হওয়ার কথা, ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। প্রস্তাব করা হয়েছে ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলিত লক্ষ্য থাকার কথা ৮.৫১ শতাংশ। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬.৭৫ শতাংশ। তার মানে বাজেটের কোট বানানোর আগে কাপড়ের মাপটা আসলে অর্থমন্ত্রীর মাথায় ছিল।
অর্থনীতির অত বড় বড় হিসাব সাধারণ মানুষ বোঝে না, বোঝার দরকারও নেই। তারা শুধু চায় দ্রব্যমূল্য তাদের আয়ত্তে থাকুক। সরকারের যেমন ব্যয়ের চেয়ে আয় কম। সাধারণ মানুষের অবস্থাও তাই দাঁড়িয়েছে। আয়-ব্যয়ের হিসাব মিলছে না অনেক দিন ধরেই। সঞ্চয় ভেঙে, জীবনযাত্রার মান নামিয়েও কুলানো যাচ্ছে না। মানুষ গ্রাম থেকে শহরে আসে উপার্জনের আশায়। কিন্তু এখন ঢাকায় টিকতে না পেরে অনেকেই গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন। সরকারের সামনে এখন এক নম্বর অগ্রাধিকার মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারেও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। সরকার গঠনের পর থেকে নয়া বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রীও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে নানা চেষ্টা করে যাচ্ছেন। অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবিত বাজেটেও তার প্রতিফলন আছে। অর্থমন্ত্রী মূল্যস্ফীতি ৬.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছেন। অনেকেই বলছেন, অঙ্গীকার থাকলেও তা বাস্তবায়নের রোডম্যাপ নেই। আসলে অর্থমন্ত্রী এখানে অনেকটা অসহায়। তার কাছে কোনো জাদুর কাঠি নেই, যার ছোঁয়ায় তিনি অর্থনীতি ঠিক করে ফেলবেন বা মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনবেন। তিনি আন্তরিকভাবে চেষ্টা করতে পারেন। সেই চেষ্টাটা আছে তার বাজেট প্রস্তাবনায়।
বাজেট বড় হলে অর্থনীতির লাগাম নিয়ন্ত্রণ মুশকিল হয়। আবার বাজেট ছোট হলে অর্থনীতি গতি হারায়, বিনিয়োগ-উৎপাদন-কর্মসংস্থান সবই শ্লথ হয়ে যায়। অর্থমন্ত্রী তাই সত্যিকার অর্থেই উভয় সংকটে আছেন। সামনের বছরটা তাকে আসলে হাঁটতে হবে সুতার ওপর দিয়ে। একটু এদিক সেদিক হওয়ার উপায় নেই।
অর্থমন্ত্রীর বাজেটের প্রস্তাবনায় আয় বাড়ানোর একটা বেপরোয়া চেষ্টা আছে। আইএমএফের শর্ত তো আছেই, আছে নিজের দায়ও। আবার আয় বাড়াতে হলে তা জনগণের পকেট থেকেই নিতে হবে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে পিষ্ট মানুষের ওপর আরও করভার চাপানোটা অন্যায়। তবুও ভারসাম্য রক্ষার একটা চেষ্টা করেছেন অর্থমন্ত্রী। অনেক পণ্যে নতুন করে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। শুল্ক বসছে এমপিদের আমদানি করা গাড়িতেও। আয়করের সর্বোচ্চ সীমা বাড়ানো হয়েছে। মোবাইলে কথা, মেট্রোরেলের মতো জনপ্রিয় সেবাতেও কর বাড়ছে। শেয়ারবাজারে বসানো হচ্ছে গেইন ট্যাক্স।
তবে অর্থমন্ত্রীর পক্ষে একা এই উত্তাল সাগর পাড়ি দেওয়া সম্ভব নয়। তার সহকর্মী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যবসায়ী, এমনকি সাধারণ মানুষের সহায়তা লাগবে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যদি অপচয় কম করেন, দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন; ব্যয় অনেকটাই কমে আসবে। ব্যবসায়ীরা যদি সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আদায় করা ভ্যাট পুরোটাই সরকারের কোষাগারে জমা দেন; তাহলে সরকারের আয় বাড়বে। আর বছরে সাড়ে ৩ লাখ টাকার ওপরে আয়, এমন সবাই যদি নিয়মিত আয়কর দেন, তাহলে অর্থমন্ত্রী হেসে খেলে পার হতে পারবেন এই বিপদ। আসলে অর্থনীতি একটা চৌবাচ্চার মতো। ওপর থেকে যতই পানি ঢালেন, নিচে ছিদ্র থাকলে চৌবাচ্চা কখনোই পূর্ণ হবে না। আমাদের বড় লোকেরা ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে, শেয়ারবাজারে লুটপাট চালিয়ে; সেই টাকা পাচার করে দেন। দেশের টাকা বাইরে চলে গেলে অর্থমন্ত্রী কীভাবে অর্থনীতি সামাল দেবেন?
সমস্যা হলো আমাদের কিছু লোক অন্ধভাবে বাজেটের পক্ষে বলেন, কিছু লোক বিপক্ষে বলেন। সবার আসলে বাস্তবতাটা মাথায় রাখা দরকার। দেশটা এ এইচ মাহমুদ আলীর একার নয়। বাজারে গিয়ে অর্থমন্ত্রীকে গালি দিলে লাভ হবে না। দুর্যোগের সময় সবাইকে একসঙ্গে থাকতে হয়, সাহসের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে সমস্যা মোকাবিলা করতে হয়। এখন অর্থনীতি একটা দুর্যোগকাল পার করছে। সবাইকে মিলে এই দুর্যোগ পাড়ি দিতে হবে। অসহায় অর্থমন্ত্রী একা পারবেন না। তিনি এখন গাইতে পারেন, ‘এর চেয়ে বেশি আর আমি কী করতে পারিৃ।’
লেখক: বার্তা প্রধান, এটিএন নিউজ
probhash2000@gmail.com