মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলির আতঙ্কে কক্সবাজারের টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌপথে সাত দিন ধরে সব ধরনের পণ্য ও যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে দ্বীপটিতে দেখা দিয়েছে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট। আর এতে অনেকটা বন্দি দশায় চরম ভোগান্তিতে দিন পার করছে দ্বীপের প্রায় ১০ হাজার বাসিন্দা। তবে দ্রুতই দ্বীপটিতে বিকল্প পথে খাদ্যদ্রব্য পাঠানোর পরিকল্পনা করছে জেলা প্রশাসন। কিন্তু কবে নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে কিংবা নৌ চলাচল শুরু হবে, তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না কেউ।
জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এবং সেন্টমার্টিন দ্বীপবাসীর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের অভ্যন্তরে দেশটির জান্তা সরকারের বাহিনীর সঙ্গে জাতিগত বিদ্রোহীদের সংঘাত চলছে। এর মধ্যে দেশটির সীমান্ত থেকে বাংলাদেশের দিকেও গুলি ছোড়া হচ্ছে।
টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌপথে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনার নাম বদরমোকাম। এর আধাকিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে মিয়ানমারের নাইক্ষ্যংদিয়া পয়েন্ট। সেখানে অবস্থান নিয়েছে মিয়ানমারের অজ্ঞাতপরিচয় অস্ত্রধারী গোষ্ঠীর সদস্যরা। যারা কোনোভাবেই টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌপথে ট্রলার বা স্পিডবোট চলাচল করতে দিচ্ছে না। ট্রলার বা স্পিডবোট দেখার সঙ্গে সঙ্গেই গুলি করছে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার একটি স্পিডবোট লক্ষ্য করে ১০ থেকে ১২টি গুলি ছোড়া হয়। এমন পরিস্থিতিতে ভয়ে সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে সেন্টমার্টিনে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে।
প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে প্রায় ১০ হাজার মানুষের বসবাস। তাদের যোগাযোগসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের একমাত্র মাধ্যম নৌযান। দ্বীপের বাসিন্দারা বলছেন, নৌযান বন্ধ থাকায় গত এক সপ্তাহ ধরে টেকনাফের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে সেন্টমার্টিন। খাদ্য ও পণ্যবাহী ট্রলার চলাচল না করায় সেন্টমার্টিনের দোকানগুলোতে মজুদ খাদ্যপণ্য শেষ হতে চলেছে। ইতিমধ্যেই পণ্যের অভাবে প্রায় ৬০ শতাংশ দোকানপাট বন্ধ রাখা হয়েছে।
দ্বীপের মুদি দোকানি মোহাম্মদ ইসলাম বলেন, ‘ট্রলার বন্ধ থাকায় গত কয়েক দিন টেকনাফ থেকে কোনো পণ্য আনতে পারিনি। চাল ছাড়া দোকানে কিছু নেই। এভাবে চলতে থাকলে দ্বীপের মানুষদের না খেয়ে থাকতে হবে।’
সেন্টমার্টিন দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান খান বলেন, ‘দ্বীপে দুই শতাধিক দোকানপাট রয়েছে। পণ্য না থাকায় এর মধ্যে ১২০টিরও বেশি দোকানপাট বন্ধ রেখেছেন মালিকরা। যেসব দোকান খোলা রয়েছে তাতেও সামান্য পরিমাণ পণ্য রয়েছে। যা বৃহস্পতিবারের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। আজকালের মধ্যে মালামাল না আনতে পারলে দ্বীপবাসীকে অনাহারে দিন কাটাতে হবে।’
সেন্টমার্টিন বোট মালিক সমিতির সভাপতি আবদুর রশিদ জানান, ট্রলারে প্রকাশ্যে গুলি করতে দেখে ট্রলারচালক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এতে নৌপথে ট্রলার নিয়ে যাতায়াত করতে কেউ রাজি হচ্ছেন না। তাছাড়া নাফ নদীর যে পয়েন্টে গুলি ছোড়া হচ্ছে ওই পথ ছাড়া সেন্টমার্টিনে আসার বিকল্প কোনো ব্যবস্থা বা রুটও নেই। প্রতিদিন সেন্টমার্টিন-টেকনাফ নৌপথে ছয় থেকে সাতটি ট্রলারের মাধ্যমে শতাধিক মানুষ আসা-যাওয়া করার পাশাপাশি খাদ্য ও নিত্যপণ্য বহন করা হতো। নৌযান বন্ধ থাকায় মানুষ খুব বিপদে আছে।
তিনি আরও জানান, সেন্টমার্টিনের খাদ্যসংকট ও যাতায়াতের কথা বিবেচনা করে প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে বিকল্প পথে চলাচলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আবহাওয়া ভালো থাকলে যেকোনো সময় টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে পণ্যবাহী ট্রলার ছেড়ে যাবে। তবে বিকল্প ওই পথে ডুবোচর থাকার কারণে ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেন তিনি
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান বলেন, ‘টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌপথে নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এ কারণে খাদ্যপণ্যসহ কোনো মালামাল আনা যাচ্ছে না। অনেক দোকান খালি পড়ে আছে। এর দ্রুত সমাধান করতে হবে।’
এ বিষয়ে টেকনাফের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আদনান চৌধুরী বলেন, ‘গুলির ঘটনায় টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌপথে নৌযান বন্ধ রয়েছে। আমরা আপৎকালীন রুট হিসেবে শাহপরীর দ্বীপের পশ্চিমে জেটি ঘাটের প্রস্তাব দিয়েছি। এটি ব্যবহার করা গেলে সেখান থেকে নৌযান চলবে। এ ছাড়া বিষয়টি জেলা প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে। শাহপরীর দ্বীপ ঘাট ব্যবহারে সমস্যা হলে সরাসরি কক্সবাজার থেকে পণ্য সরবরাহ করা হবে।’
এ প্রসঙ্গে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিএম) মো. ইয়ামিন বলেন, ‘সেন্টমার্টিন পণ্য পাঠাতে করণীয় নির্ধারণে আজ (গতকাল) বিকেলে একটি বৈঠক করা হবে। বৈঠক থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে আমরা যেকোনো উপায়ে দুয়েক দিনে দ্বীপটিতে পণ্য পাঠাতে বদ্ধপরিকর।’