৮ দিন পর খাবার গেল সেন্টমার্টিনে

নাফ নদীতে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে নৌযান লক্ষ্য করে গুলির ঘটনায় ৯ দিন ধরে স্বাভাবিক পথে সেন্টমার্টিনের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। ফলে দ্বীপটিতে তীব্র খাদ্যসংকটের মধ্যেই গতকাল শুক্রবার বিকল্পপথে ভোগ্যপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সরকারি-বেসরকারি ১৫০ টন মালামাল নিয়ে একটি জাহাজ পাঠানো হয়েছে।

গতকাল দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়া বিআইডব্লিউটিএ ঘাট থেকে এমভি ‘বারো আউলিয়া’ নামে জাহাজটি সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। এ সময় জাহাজটিতে দেড় শতাধিক লোক ও সরকারি সহায়তায় খাদ্যপণ্য এবং পাঁচটি কোরবানির গরু রয়েছে।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মো. ইয়ামিন হোসেন বলেন, দ্বীপের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সমন্বয় করে জাহাজটি পাঠানো হয়েছে। এটি বঙ্গোপসাগর দিয়ে টেকনাফ পৌঁছে ঘোলারচর হয়ে সেন্টমার্টিন পৌঁছাবে। পণ্যসামগ্রীর পাশাপাশি কক্সবাজারে আটকা পড়া সেন্টমার্টিনের অনেক বাসিন্দাও এই জাহাজে করে ফিরবেন।

তিনি আরও বলেন, জেলা প্রশাসনের ৭৫ টন খাদ্যপণ্য ভিজিডি ও ভিজিএফ সহায়তা পাঠানো হচ্ছে, কোরবানির জন্য ৫টি গরু এবং ৩০০ প্যাকেট শুকনো খাবার পাঠানো হচ্ছে। চিকিৎসাসামগ্রী ও তিনজন মিডওয়াইফ দ্বীপটিতে যাচ্ছেন। ব্যবসায়ীদের খাদ্যপণ্য মালামালসহ প্রায় দেড়শ টন খাদ্যপণ্য যাচ্ছে। এতে আশা করছি দ্বীপের মানুষের এক মাস পর্যন্ত চলবে।

এমভি বারো আউলিয়ার কক্সবাজার ইনচার্জ বাহাদুর হোসাইন বলেন, জাহাজটিতে সরকারি ৭৫ টন ত্রাণের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের প্রায় ৭৫ টন মালামাল রয়েছে।

চট্টগ্রামে সিটি কলেজে পড়াশোনা করেন সাইফুর রহমান। তিনি ঈদে বাড়ি যাচ্ছেন জানিয়ে বলেন, গত ঈদের পর এবার তিনি বাড়ি যাচ্ছেন। সেন্টমার্টিন যাওয়ার একমাত্র পথ নৌরুটে মিয়ানমারের গোলাগুলি স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনে খুবই প্রভাব ফেলছে, কারণ সেন্টমার্টিনের মানুষদের নিত্যপণ্য দ্রব্যের জন্য শতভাগ টেকনাফের ওপর নির্ভর করতে হয়।

এ ছাড়া পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা নিতে এসে টেকনাফে আটকে ছিলেন ইয়াহিয়া ও তার স্ত্রী-সন্তান। চিকিৎসা শেষে গত ৬ জুন সেন্টমার্টিনে ফেরার কথা থাকলেও ফিরতে পারেননি তিনি। জাহাজে করে ফিরছেন পরিবার নিয়ে।

গতকাল সকাল ১০টায় বিআইডব্লিউটিএ ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, ‘এমভি বারো আউলিয়া’ জাহাজে তোলা হয় চাল, ডাল, পেঁয়াজসহ নানা ধরনের ভোজ্যপণ্য। একই সঙ্গে কক্সবাজারের বিভিন্ন জায়গায় আটকে পড়া সেন্টমার্টিনের বাসিন্দারাও জড়ো হন নিজ এলাকায় ফেরার জন্য।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে বিজিবি ও কোস্টগার্ডের নিরাপত্তায় সেন্টমার্টিন থেকে তিনটি ট্রলারে করে দুই শতাধিক মানুষ টেকনাফ পৌঁছায়। ফের টেকনাফ থেকে চারটি ট্রলারে করে তিন শতাধিক লোক সেন্টমার্টিনে যায়।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আদনান চৌধুরী জানান, গত বৃহস্পতিবার দুপুরে চারটি ট্রলার লোকজন নিয়ে সেন্টমার্টিন দ্বীপে যায়। সেখান থেকে দুই শতাধিক মানুষ টেকনাফে ফিরে আসে। এ সময় বিজিবি ও কোস্টগার্ডের সদস্যরা নিরাপত্তা জোরদার করেছিলেন।

সেন্টমার্টিন থেকে দেখা যাচ্ছে মিয়ানমারের তিনটি যুদ্ধজাহাজ : সেন্টমার্টিন দ্বীপ থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে মিয়ানমারের তিনটি যুদ্ধজাহাজ। এক সপ্তাহ ধরে একই জায়গায় নোঙর করে আছে জাহাজগুলো। সেন্টমার্টিনের স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সেখান থেকেই মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মিকে লক্ষ্য করে ভারী গোলাবারুদ এবং মর্টার শেল ছোড়া হচ্ছে। এ কারণে আতঙ্কিত দ্বীপের বাসিন্দারা।

সেন্টমার্টিন দ্বীপের ডেইলপাড়ার বাসিন্দা মো. হাশিম বলেন, ‘এত কাছ থেকে এর আগে মিয়ানমারের যুদ্ধজাহাজ কখনো দেখা যায়নি। আমাদের জলসীমায় এই জাহাজগুলো অবস্থান করছে এবং আরও কয়েক দিন জাহাজ নিয়মিত চলাচল করেছে। এই জাহাজগুলো থেকে ওরা মিয়ানমারের আরাকান আর্মির সঙ্গে যুদ্ধ করে। গোলাগুলির আওয়াজ শুনি, এ কারণে অনেক ভয় পাচ্ছি।’

সেন্টমার্টিন জেটিঘাটের পাশে বাজারের দোকানদার রহমত উল্লাহ বলেন, ‘আমাদের জলসীমায় জাহাজের অবস্থান। আমি কিছুদিন আগে টেকনাফ থেকে আসার পথেও এ রকম কাছে দেখিনি। আমরা অনেক বেশি আতঙ্কে আছি। ভয় পাচ্ছি কখন কী হয় জানি না।’

আমান উল্লাহ বলেন, ‘আমাদের দেশকে তারা পরোয়া করে না। আমাদের জলসীমায় মিয়ানমারের যুদ্ধজাহাজ চলে এসেছে। মানুষ যাতায়াতের জন্য সবচেয়ে বেশি ভয় পাচ্ছে। আমরা গোলাগুলির শব্দ প্রতিদিন শুনতে পাচ্ছি।’

সেন্টমার্টিনের বিচকর্মীদের সুপারভাইজার জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘সেন্টমার্টিন দ্বীপ থেকে মিয়ানমারের যুদ্ধজাহাজ দেখা যাচ্ছে। এটা বাংলাদেশের জলসীমায় অবস্থান করছে কি না আমরা জানি না। এগুলো নৌবাহিনী বা কোস্টগার্ড বলতে পারবে। তবে জেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে যুদ্ধজাহাজের ব্যাপারে।’