পাপ একটি ভয়ঙ্কর শব্দ। এ শব্দ শোনামাত্রই মুমিনের অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। আল্লাহর অবাধ্যতাই পাপের আসল রূপ। পাপের কারণে শুধু পরকালীন ক্ষতি হয় এমন না, বরং দুনিয়ার জীবনেও ভোগ করতে হয় এর তিক্ত ফল। দুনিয়াতে পাপীর কোনো মূল্যায়ন নেই। লাঞ্ছনা ও বঞ্চনা উভয় জগতে পাপীর প্রায়শ্চিত্ত। আর পরকালের কঠিন শাস্তির কথা তো কোরআন ও হাদিসের বহু স্থানে উল্লেখ আছেই। পাপ যে বঞ্চনা ডেকে আনে, উম্মতের কল্যাণের জন্য রাসুল (সা.) তা বিষদভাবে বলে দিয়েছেন। হাদিসে এসেছে, ‘মানুষ তার কৃত পাপের কারণে রিজিক থেকে বঞ্চিত হয়।’ (ইবনে মাজাহ)
অপর হাদিসে এসেছে, ‘মানুষ পাপ করার ফলে এমন রিজিক থেকে বঞ্চিত হয়, যা তার জন্যে বরাদ্দ ছিল।’ (আল মাকাসিদুল হাসানাহ)
অনেকেই বলে থাকেন, সম্পদের পাহাড় তো পাপীদের পায়ের নিচেই। হ্যাঁ, তাদের এই কথা ঠিক। এটা অনস্বীকার্য সত্য। তবে কাড়ি কাড়ি অর্থ পেয়েও যাদের জীবনে একটুও স্বস্তি নেই, নেই বিন্দু পরিমাণ সুখ, তা কেমন সম্পদ? হাদিসের ভাষায় এর সবই দুনিয়ার সামান্য ভোগ সম্ভোগমাত্র।
রাসুল (সা.) বলেন, ‘পাপ সত্ত্বেও আল্লাহ যাকে দুনিয়া দান করেন, মূলত তিনি তাকে অবকাশ দিচ্ছেন। এ কথা বলে রাসুল (সা.) সুরা আনআমের এই আয়াত তেলাওয়াত করেন, তাদের যে উপদেশ দেওয়া হয়, তারা যখন তা ভুলে যায়, তখন আমি তাদের জন্য সবকিছুর দরজা খুলে দিই। আর তা নিয়ে তারা উল্লসিত হয়। আর যখন আমি অতর্কিতভাবে তাদের পাকরাও করি তখন তারা নিরাশ হয়ে যায়।’ (তাবরানি)
কথা খুবই সরল। আখেরাতে যাদের কোনো অংশ নেই তাদের জন্য আল্লাহ পার্থিব জগতের সবকিছুই অনেক পরিমাণে দেন। যদি দুর্বল বিশ্বাসীরা পথহারা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা না হতো, তাহলে তাদের সবই দিয়ে দিতেন। বিন্দুমাত্রও বাকি থাকত না। সুতরাং তাদের এই সম্পদ ফাঁসির আসামির শেষ ইচ্ছা পূরণের মতোই। বিপরীতে যাদের জন্য রয়েছে আখেরাতের কল্যাণ, এই পার্থিব ভোগবিলাস তাদের প্রধান বিষয় নয়। অন্যায়-অপরাধ কিছু হয়ে গেলে তার অভিশাপে পরকালের মহাকল্যাণ যেন ছাই না হয়ে যায় সে জন্য পার্থিব জগতে তাদেরও শাসন করেন। রিজিক কমিয়ে দেন। এই বঞ্চনাই পাপের অভিশাপ।
অবশ্য মহান আল্লাহ এই অভিশাপ থেকে বাঁচার পথও রেখেছেন। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং তার দিকে ফিরে আসো। তিনি তোমাদের একটি নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত উত্তম জীবন উপভোগ করাবেন এবং তিনি প্রত্যেক মর্যাদাবান ব্যক্তিকে তার প্রাপ্য মর্যাদা দান করবেন। আর তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিলে তোমাদের ব্যাপারে মহাদিবসের শাস্তির আশংকা করি।’ (সুরা হুদ ৩)
অপর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি তাদের বলেছি, নিজ প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। তিনি মহাক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং সমৃদ্ধ করবেন ধন-সম্পদ ও সন্তানসন্ততিতে। আর ব্যবস্থা করবেন উদ্যান ও প্রবাহিত নদী-নালার।’ (সুরা নুহ ১০-১২)
অভাবের তাড়না আর প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার কয়েদখানা থেকে বেরিয়ে আসার কত সহজ উপায়! তা হলো আল্লাহর দরবারে কৃত পাপের জন্য ক্ষমা চাওয়া। তিনি আকাশ ও পৃথিবীর সব নেয়ামতের দরোজা খুলে দেবেন। ধন-সম্পদে ভরে দেবেন বিরান সংসার। মহান প্রভুর এই দুয়ার ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। যেখানে রয়েছে সফলতার অঙ্গীকার। পাপীরা দৃশ্যত ক্ষুদ্র ও বৃহৎ পরিসরে ধন-সম্পদ পায়। কিন্তু স্বস্তি ও শান্তির পায় না একটুও। তওবা বা ক্ষমা প্রার্থনার প্রকৃত মর্ম তো এটাই। এতে রয়েছে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ। আছে বেহিসাব দানের অঙ্গীকার।