বৃষ্টি বন্যায় ঈদ পর্যটনে ভাটা

বৃষ্টির বাধা কক্সবাজার ও রাঙ্গামাটিতে ঈদ পর্যটনে এবার ভাটার টান দেখা গেছে। অন্যদিকে সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে বন্যার কারণে ধস নেমেছে পর্যটনে।

পর্যটনসেবীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, প্রতিবার ঈদ মৌসুমে কম করে হলেও দুই লক্ষাধিক দেশি-বিদেশি পর্যটক কক্সবাজারে আসে। তবে এটি পর্যটন মৌসুম না হওয়ায় এবং টানা বৃষ্টি হওয়ায় এ সংখ্যাটা লাখের কাছে নেমে এসেছে। এবারের ঈদে কক্সবাজারের হোটেল-মোটেল, রেস্ট হাউজ ও কটেজের ৮০ শতাংশ কক্ষে দেশীয় দর্শনার্থী অবস্থান করছেন। ২১ জুন পর্যন্ত কক্ষগুলো বুকিং করা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত ছাড়াও, ইনানী, হিমছড়ি, পাটোয়ারটেক, রামুর বৌদ্ধবিহার, মহেশখালীর আদিনাথ মন্দির ও টেকনাফ সমুদ্রসৈকত, বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে মানুষ বেড়াতে এসেছে। তাদের ভ্রমণ নির্বিঘ্ন করতে জেলার সব পর্যটন স্পটে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

গতকাল বুধবার বিকেল ৪টার দিকে সৈকতের লাবণী পয়েন্টে গিয়ে দেখা গেছে, ৫ কিলোমিটার লম্বা এই সৈকতের বালুচরে হাজারো মানুষের পদচারণে মুখরিত। সূর্যের দেখা না মিললেও তারা উত্তাল ঢেউ গুনছে, কেউবা ঢেউয়ের তালে সমুদ্রস্নানে মগ্ন।

শরীয়তপুর থেকে আসা পর্যটক সোহেল বলেন, ‘দীর্ঘদিন যাবৎ ভাবছিলাম কক্সবাজারে আসব। কিন্তু সময় আর সুযোগ এক হচ্ছিল না। অবশেষে এলাম। এবারের সমুদ্র দর্শনটা অন্যবারের চেয়ে আলাদা। প্রতিবার প্রচন্ড ভিড় থাকে। এবার তেমন ভিড় নেই।’

কক্সবাজার হোটেল গেস্ট হাউজ মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, ঈদ উপলক্ষে পর্যটকদের জন্য বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছে।

কক্সবাজার হোটেল-মোটেল ও রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মুখপাত্র কলিম উল্লাহ বলেন, ‘এটি পর্যটন মৌসুম নয়। এই সময়ে হোটেলের দুই-একটি কক্ষ ভাড়া থাকার কথা। সেই জায়গায় ৮০ শতাংশ কক্ষ বুকিং। বিষয়টি আনন্দের।’

পর্যটকদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ বলেন, ‘পর্যটকদের নিরাপত্তায় আমরা সব সময় প্রস্তুত। সৈকত এলাকায় চার স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখা হয়েছে।’

হ্রদ-পাহাড়ের শহর রাঙ্গামাটিতেও বেশিরভাগ হোটেল-মোটেলে বুকিং রয়েছে। ঈদের ছুটি শেষ হয়েছে মঙ্গলবার। ওই দিন পর্যটকদের উপস্থিতি কিছুটা কম থাকলেও গতকাল সকাল থেকেই এই হার বাড়তে শুরু করেছে। শুক্র ও শনিবার সরকারি ছুটির দিন হওয়ায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা আসছে। শহরের রিজার্ভ বাজার বাসস্ট্যান্ডে দেখা যায়, পর্যটকবাহী গাড়ির উপস্থিতি। অনেকে দলগতভাবে বাস নিয়ে আবার অনেকে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে বেড়াতে এসেছে রাঙ্গামাটি।

রাঙ্গামাটির ঝুলন্ত সেতু, পলওয়েল পার্কসহ সব পর্যটন স্পটে রয়েছে পর্যটকের সরব পদচারণ। ‘সিম্বল অব রাঙ্গামাটি’খ্যাত ঝুলন্ত সেতু এখন পর্যটকদের পদচারণে মুখর।

কুমিল্লা থেকে বেড়াতে আসা পর্যটক কাকন দাশ বলেন, ‘আমরা বন্ধুরা আজ (বুধবার) ভোরে কুমিল্লা থেকে বাইক নিয়ে রওনা দিয়ে চট্টগ্রাম হয়ে রাঙ্গামাটি এসেছি। প্রথমেই ঝুলন্ত সেতু দেখতে এলাম। এরপর আরও কয়েকটি স্পটে যাব।

রাঙ্গামাটি সত্যিই খুব সুন্দর।’

রাঙ্গামাটি ট্যুরিস্ট বোট মালিক সমিতির সহসভাপতি রমজান আলী বলেন, ‘ঈদের ছুটির কথা মাথায় রেখে আগে থেকেই আমাদের প্রস্তুতি সেরে রেখেছিলাম। আমরা আশা করেছিলাম বিপুল পর্যটকের সমাগম হবে। পর্যটকরা এসেছে, তবে আজ হয়তো আরও কিছু পর্যটক আসবে।’

হোটেল মতি মহলের ব্যবস্থাপক চন্দন কুমার বর্মণ বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে আমরা যেমন পর্যটক আশা করেছিলাম, তেমনটি না হলেও মোটামুটি পর্যটক এসেছে। আমাদের হোটেলের ৬০ শতাংশ বুকিং আছে। আশা করছি বুকিং আরও বাড়বে।’

তবে এবার সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে জেলার তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার হাওর, নিলাদ্রী লেকসহ উপজেলার সব পর্যটনকেন্দ্র।

গত মঙ্গলবার তাহিরপুরের এসব পর্যটনকেন্দ্রে পর্যটকদের আগমনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সালমা পারভিন।

তিনি জানান, পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।  এতে পর্যটকদের নিরাপত্তার কথা ভেবে টাঙ্গুয়ার হাওর, নিলাদ্রী লেক, বারেকটিলা, শিমুলবাগানসহ বিভিন্ন পর্যটন স্পট  বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই নির্দেশ বহাল থাকবে।

পবিত্র ঈদুল আজহার টানা তিন দিনের ছুটিতে চায়ের রাজ্যখ্যাত মৌলভীবাজার জেলায় পর্যটনে ধস নেমেছে। টানা বৃষ্টির ফলে জেলার পর্যটন উপজেলা শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জে ঈদের দিন থেকে গতকাল পর্যন্ত পর্যটকেন্দ্রগুলোয় পর্যটকের আনাগোনা লক্ষ করা যায়নি। ঈদের দিন কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে মাত্র ২০০ ও পরের দুদিনে আরও প্রায় আড়াইশো পর্যটক টিকিট কেটে প্রবেশ করেছে। এবার ঈদে পর্যটকদের হোটেল বুকিং কম ছিল এবং প্রায় রিসোর্ট ফাঁকা বলে জানিয়েছেন হোটেল-রিসোর্ট মালিকরা।

শ্রীমঙ্গলের হোটেল-রিসোর্টগুলোয় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঈদে শ্রীমঙ্গল শহরের হোটেলগুলোয় ১৫ শতাংশ ও বাকি রিসোর্টগুলোয় প্রায় ২৫ শতাংশ রুম বুকিং করে পর্যটকরা। অথচ ঈদ কিংবা অন্য কোনো লম্বা ছুটি পেলেই প্রকৃতিপ্রেমী পর্যটকরা ভিড় জমায় চায়ের রাজধানী মৌলভীবাজারে।

কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের টিকিট মাস্টার শাহিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনাকালের পর এই ঈদে পর্যটকের ধস নেমেছে চায়ের রাজ্যে। ঈদের দিন সোমবার ২০০, দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার ১০১ ও গতকাল দুপুর ১টা পর্যন্ত ৭০ জন পর্যটক লাউয়াছড়ায় টিকিট কেটে প্রবেশ করে। অথচ অন্যান্য ঈদে কয়েক হাজার পর্যটক প্রবেশ করত লাউয়াছড়ায়।’

শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও গ্র্যান্ড সেলিম রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী সেলিম আহমেদ বলেন, ‘প্রতি ঈদেই এক সপ্তাহ আগ থেকেই হোটেল-রিসোর্টে বুকিং হয়। তবে বৃষ্টিপাতের ফলে এবার পর্যটক নেই এই অঞ্চলে। বৃষ্টি না থাকলে হয়তো ঈদের পরের শুক্র ও শনিবার কিছু পর্যটক বাড়তে পারে।’

[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন আমাদের কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, সুনামগঞ্জ ও কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি]