রাজধানীতে পশু কোরবানির জন্য খোলা স্থান না থাকায় রাস্তাতেই বেশিরভাগ পশু কোরবানি হয়। এ বছরও এর ব্যতিক্রম হয়নি। তবে ঈদের আগে ঢাকা দুই সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বর্জ্য অপসারণের ঘোষণা দিয়েছিলেন। উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম ৬ ঘণ্টা এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস ২৪ ঘণ্টার আগেই কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণের ঘোষণা দেন। মেয়রদ্বয় তাদের কথা রাখার চেষ্টা করেছেন। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে বিষয়টির সত্যতা পাওয়া গেছে।
কোরবানির পর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রতি বছরই বাড়তি প্রস্তুতি রাখে দুই সিটি করপোরেশন। অতীতের ঈদগুলোয় সময়মতো বর্জ্য অপসারণ সম্ভব না হলেও এই ঈদে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে। তাড়াতাড়ি বর্জ্য অপসারণ হওয়ায় স্বস্তির কথা জানিয়েছে নগরবাসী। তবে কিছু এলাকায় বর্জ্য অপসারণ করা হলেও রক্তের দুর্গন্ধ রয়েই গেছে। পর্যাপ্ত পানি ও ব্লিচিং পাউডার না ছিটানোয় এই দুর্গন্ধ বলে জানিয়েছে এলাকাবাসী।
গতকাল ধানমন্ডি লেকে সরেজমিন দেখা যায়, কোরবানি হওয়া পশুর বর্জ্য নির্দিষ্ট সময়ে অপসারণ করা হয়েছে। কিন্তু পশুর রক্ত লেকের পাশেই জমাট বেঁধে ছিল। ফলে তা থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। সকালে লেকে হাঁটতে আসা অনেকেই বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এ ছাড়া কয়েকটি এলাকা ঘুরে বর্জ্য অপসারণের চিত্র দেখা গেলেও রক্তের দুর্গন্ধ রয়েই গেছে।
এদিকে পূর্বঘোষিত ছয় ঘণ্টার মধ্যেই শতভাগ কোরবানির বর্জ্য অপসারণের দাবি করেন ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘সবার সহযোগিতায় পূর্বঘোষিত ৬ ঘণ্টায় ঢাকা উত্তর সিটির কোরবানির বর্জ্য শতভাগ অপসারণ করা সম্ভব হয়েছে। সচেতন নাগরিকদের আন্তরিক সহযোগিতায় এটি করতে পেরেছি। আমি নগরবাসীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। আগামী দিনেও ঢাকা শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখতে জনগণ ও সিটি করপোরেশনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’ তিনি আরও জানান, ডিএনসিসির সব ওয়ার্ড থেকে সোমবার রাত ৮টা পর্যন্ত ২ হাজার ১০১ ট্রিপে প্রায় ১০ হাজার ৩৭৪ টন বর্জ্য অপসারণ করা হয়।
ডিএনসিসির বর্জ্য বিভাগ জানায়, ৫৪টি ওয়ার্ডের সব এলাকার শতভাগ বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বর্জ্য অপসারণে ১০ হাজারের অধিক কর্মী কাজে নিয়োজিত ছিল।
মিরপুর-১০ বাসিন্দা আদনান আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগে কোরবানির ঈদের পর দিনের পর দিন রাস্তার পাশে বর্জ্যরে স্তূপ থাকত। দুর্গন্ধে রাস্তা দিয়ে হাঁটা যেত না। কিন্তু এবার নির্দিষ্ট সময়ে বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে। তবে রক্ত পুরোপুরি পরিষ্কার করা হয়নি। পর্যাপ্ত ব্লিচিং পাউডার না ছিটানোয় এই দুর্গন্ধ। তবে সর্বোপরি আমরা খুশি। এই ধারা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে বলে প্রত্যাশা করি।’
এদিকে পশুর বর্জ্য অপসারণ করতে সক্ষম হয়েছে বলে দাবি করেছেন ডিএসসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে পুরান ঢাকার কিছু এলাকায় ঈদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনেও পশুর বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা গেছে; যা থেকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে।
গতকাল সকালে দক্ষিণ সিটির ওয়ারী, দয়াগঞ্জ, ধোলাইখাল এবং দক্ষিণ বনশ্রীসহ বেশ কিছু এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, রাস্তার পাশে আজও বর্জ্য স্তূপ করে রাখা। কোরবানির বর্জ্য অপসারিত না হওয়ায় দুর্গন্ধে টেকা দায় হয়ে পড়েছে সেখানকার বাসিন্দাদের।
দক্ষিণ সিটির ধোলাইখাল এলাকার বাসিন্দা আবু জাফর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখনো কিছু কিছু জায়গায় কোরবানির বর্জ্য দৃশ্যমান। তবে তা আগের বছরের তুলনায় খুবই কম। আগে ঈদের কয়েক দিন পরেও কোরবানির বর্জ্য ময়লার ভাগাড় হয়ে থাকত। কিন্তু এ বছর তেমনটি নেই। আশা করি আগামী বছর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই সব বর্জ্য অপসারণ করা হবে।’ তবে ডিএসসিসির কর্মকর্তাদের দাবি, ঈদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনেও অনেকে কোরবানি করে থাকেন, তাই এই বর্জ্য রয়ে গেছে। সেগুলো পরিষ্কার করা হচ্ছে।
ডিএসসিসির জনসংযোগ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এবার কোরবানির হাট ও জবাই করা পশুর বর্জ্য অপসারণে ১০ হাজার ২৪৭ জন জনবল কাজ করেছে। আর কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণে ২৪ ঘণ্টার লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হলেও প্রথম দিনে তা ১০ ঘণ্টা ১৫ মিনিটে সম্পন্ন করা হয়েছে এবং দ্বিতীয় দিনে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সময়ে ৭৫ ওয়ার্ডের মধ্যে ৫৯টি ওয়ার্ডের বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে মঙ্গলবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত ৩ হাজার ৬৫৫টি ট্রিপের মাধ্যমে ১৭ হাজার ৬৯২ টন বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার বিকেলে ডিএসসিসির নগর ভবনের শীতলক্ষ্যা হলে স্থাপিত কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষের মাধ্যমে অনলাইন প্ল্যাটফরমে সংযুক্ত হয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন শেখ ফজলে নূর তাপস। এ সময় নগরের বেশ কয়েকটি জায়গায় বর্জ্য পড়ে থাকা নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তাপস বলেন, কোরবানির পশু জবাই বিভিন্ন সময়ে হয়ে থাকে। একেকজন একেক সময়ে তা করে থাকে। সুতরাং আমরা পরিষ্কার করে আসার পরে অনেকেই জবাই করা সেই সব পশুর বর্জ্য বিভিন্ন জায়গায় ফেলে রাখে। এ ধরনের বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা থাকে। এ ছাড়া অনেকেই কোরবানির পশুর বর্জ্যরে সঙ্গে হাটের বর্জ্য মিলিয়ে ফেলে। এ ছাড়া দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনেও অনেকেই কোরবানি করে থাকে। কিন্তু শতভাগ পরিষ্কার হওয়ার পরেই আমরা তা ঘোষণা দিই এবং প্রথম দিনের বর্জ্য বেশ কয়েকটি জায়গায় পরে তা অপসারণ করা হয়নি, সে বিষয়টি সঠিক নয়।’