সংসদে অর্থমন্ত্রী

বিদেশিরা ১০ মাসে সাড়ে ১৩ কোটি ডলার নিয়ে গেছেন

অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেছেন, গত বছর জুলাই থেকে চলতি বছর এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে বিদেশি নাগরিকরা তাদের আয় থেকে ১৩০ দশমিক ৫৮ মিলিয়ন (১৩ কোটি ৫৮ লাখ) মার্কিন ডলার নিজ নিজ দেশে নিয়ে গেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৫০ দশমিক ৬০ মিলিয়ন (৫ কোটি) ডলার গেছে ভারতে।

গতকাল সোমবার বিকেলে জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য আবদুল কাদের আজাদের (এ কে আজাদ) এক প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য জানান। স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠকের শুরুতে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপন করা হয়।

এ কে আজাদের লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশে বসবাসকারী বিদেশি নাগরিকদের বছরে আয় সংশ্লিষ্ট তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকে সংরক্ষিত নেই। তবে গত ১০ মাসে কোন দেশের নাগরিকরা কত ডলার নিজ নিজ দেশে নিয়েছেন, সে তথ্য তুলে ধরেন তিনি। বর্তমানে ১ মার্কিন ডলার সমান ১১৭ টাকা। অর্থমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ মাসে সবচেয়ে বেশি ৫০ দশমিক ৬০ মিলিয়ন ডলার গেছে ভারতে। এ ছাড়া চীনে ১৪ দশমিক ৫৬ মিলিয়ন ডলার, শ্রীলঙ্কায় ১২ দশমিক ৭১ মিলিয়ন ডলার, জাপানে ৬ দশমিক ৮৯ মিলিয়ন ডলার, কোরিয়ায় ৬ দশমিক ২১ মিলিয়ন ডলার, থাইল্যান্ডে ৫ দশমিক ৩০ মিলিয়ন ডলার, যুক্তরাজ্যে ৩ দশমিক ৫৯ মিলিয়ন ডলার, পাকিস্তানে ৩ দশমিক ২৪ মিলিয়ন ডলার, যুক্তরাষ্ট্রে ৩ দশমিক ১৭ মিলিয়ন ডলার, মালয়েশিয়ায় ২ দশমিক ৪০ মিলিয়ন ডলার ও অন্যান্য দেশে গেছে ২১ দশমিক ৯২ মিলিয়ন ডলার।

সংসদ সদস্য মোরশেদ আলমের লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, দেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সরকারি ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ৫১ হাজার ৩৯১ কোটি ৮৯ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ৫৬টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ব্যাংকগুলোর সবচেয়ে বেশি ১৫ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা পাওনা আছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) কাছে। এ ছাড়া বড় অঙ্কের টাকার মধ্যে চিনি কলগুলোর কাছে পাওনা প্রায় ৭ হাজার ৮১৩ কোটি, সার, রাসায়নিক ও ওষুধ শিল্পের কাছে পাওনা ৭ হাজার ২৫০ কোটি, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) কাছে পাওনা ৫ হাজার ১৮ কোটি ও বাংলাদেশ বিমানের কাছে পাওনা ৪ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা।

সরকারি দলের সংসদ সদস্য মাহবুব উর রহমানের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশে কোনো ব্যাংকে আর্থিক সংকট নেই। তবে কতিপয় ব্যাংকে উচ্চ খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি ও তারল্য সমস্যা রয়েছে। এ সমস্যা নিরসনে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন করে কর্মকর্তা নয়টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পর্যবেক্ষক হিসেবে এবং সাতটি ব্যাংকে কো-অর্ডিনেটর হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন।

আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আবদুল লতিফের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, মূল্যস্ফীতির চলমান সংকটের মূলে যে কারণগুলো রয়েছে তা হলো বৈশ্বিক পণ্য বাজারে সরবরাহে অনিশ্চয়তা, মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়া এবং দেশের বাজারে সরবরাহ শৃঙ্খলে ত্রুটি। অর্থনৈতিক এ সংকট কাটিয়ে দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার জন্য সরকার বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানত হ্রাস পাওয়াসংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাহীনতা বা মূল্যস্ফীতির কারণে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানত কমছে না। বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হওয়ায় মানুষ আমানত তুলে বিনিয়োগ করছে।

নিবন্ধিত সিমের প্রায় অর্ধেক নিষ্ক্রিয় : মোবাইল কোম্পানিগুলোর গ্রাহকদের নিবন্ধিত সিমের প্রায় অর্ধেক নিষ্ক্রিয় অবস্থায় আছে। গতকাল জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের দেওয়া তথ্যে এ চিত্র পাওয়া গেছে। প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশে নিবন্ধিত সিমের সংখ্যা ৩৩ কোটি ২৭ লাখ ৫৬ হাজার। এর মধ্যে সক্রিয় ১৯ কোটি ৩৭ লাখ ৩০ হাজার।

সরকারদলীয় সংসদ সদস্য আবদুল মালেক সরকারের প্রশ্নের জবাবে টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্তমানে বাংলাদেশে সেলুলার মোবাইল ফোন অপারেটর এর সংখ্যা চারটি। এগুলো হলো গ্রামীণফোন লিমিটেড, রবি আজিয়াটা লিমিটেড, বাংলালিংক ডিজিটাল কমিউনিকেশনস লিমিটেড এবং টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেড। গ্রামীণফোনের নিবন্ধিত সিমের সংখ্যা ১১ কোটি ৯৫ লাখ ৬৭ হাজার ৯২৫টি। বাংলালিংকের ৯ কোটি ৭ লাখ ৬৫ হাজার ৯৬২টি, রবির ১০ কোটি ৭৯ লাখ ৬১ হাজার ৮০০টি এবং টেলিটকের ১ কোটি ৪৪ লাখ ৬১ হাজার ২৮৩টি।

প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, দেশে মোট ১৯ কোটি ৩৭ লাখ ৩০ হাজার সক্রিয় সিম রয়েছে। এর মধ্যে গ্রামীণফোনের সক্রিয় সিম সংখ্যা ৮ কোটি ৩৯ লাখ ৫০ হাজার, রবির ৫ কোটি ৮৫ লাখ ১০ হাজার, বাংলালিংকের ৪ কোটি ৪৭ লাখ ২০ হাজার এবং টেলিটকের ৬৫ লাখ ৫০ হাজার।

আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য নাসের শাহরিয়ার জাহেদী এক লিখিত প্রশ্নের উত্তরে প্রতিমন্ত্রী পলক জানান, দেশে বর্তমানে লাইসেন্সধারীর ইন্টারনেট সরবরাহকারীর সংখ্যা ২ হাজার ৬৫০টি। সারা দেশে ইন্টারনেট সেবা দ্রুত বিস্তার এবং গুণগত মানসম্পন্ন ইন্টারনেটসেবা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। বিটিআরসি থেকে ন্যাশনওয়াইড, বিভাগীয়, জেলা ও থানা বা উপজেলাভিত্তিক এ চার ধরনের আইএসপি লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। ফলে দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় দ্রুত ইন্টারনেট সেবা পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, গুণগত মানসম্পন্ন ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একই এলাকায় একাধিক আইএসপি প্রতিষ্ঠানের ইন্টারনেট সেবা প্রদানের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। যার ফলে ইন্টারনেট সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ায় আইএসপি অপারেটররা সেবার মান বৃদ্ধির প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আইএসপি গাইডলাইনের বিধান মোতাবেক সব আইএসপি অপারেটরকে আইআইজি প্রতিষ্ঠান হতে ব্যান্ডউইথ গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ফরিদা ইয়াসমিনের প্রশ্নের জবাবে জুনাইদ আহমেদ পলক জানান, ২০১৯ সালে বিটিসিএলের গ্রাহক সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ১৯ হাজার ৯২২ জন। বর্তমানে ২০২৪ সারেল ১২ জুন সে সংখ্যা কমে দাড়িয়েছে ৩ লাখ ৭৩ হাজার ৯৫০ জন। অর্থাৎ গত পাঁচ বছরে বিটিসিএলের গ্রাহক সংখ্যা কমেছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯৭২টি।

সংসদ ভবনে ‘মুজিব ও স্বাধীনতা’র উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী : জাতীয় সংসদ ভবনে নির্মিত ‘মুজিব ও স্বাধীনতা’র উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা। উদ্বোধনের পর গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদ ভবনের প্রথমতলায় স্থাপিত এ কক্ষটি ঘুরে দেখেন তিনি। এ সময় জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীও উপস্থিত ছিলেন। পরিদর্শন শেষে প্রধানমন্ত্রী পরিদর্শন বইতে স্বাক্ষর করেন এবং এ উদ্যোগের প্রশংসা করেন। এ সময় স্পিকার ‘মুজিব ও স্বাধীনতা’ এ প্রদর্শিত বিভিন্ন স্থিরচিত্র ও ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন।

এ সময় ডেপুটি স্পিকার মো. শামসুল হক টুকু, চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী, হুইপ ইকবালুর রহিম, হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, হুইপ নজরুল ইসলাম বাবু, হুইপ সাইমুম সরওয়ার কমল, হুইপ মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা এবং হুইপ সানজিদা খানম উপস্থিত ছিলেন।

দুর্নীতির মচ্ছব বন্ধে বিশেষ কমিশন চান মেনন : দেশে ‘দুর্নীতির মচ্ছব’ বন্ধ করতে এখনই বিশেষ কমিশন গঠন, দুর্নীতিবাজদের অর্থসম্পদ বাজেয়াপ্ত করা এবং ঋণখেলাপি, অর্থ আত্মসাৎকারীদের বিচারে ট্রাইব্যুনাল গঠন করার দাবি জানিয়েছেন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন।

গতকাল সোমবার ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে এ দাবি জানান সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেনন।

মেনন বলেন, সাবেক পুলিশপ্রধান (বেনজীর আহমেদ) ও সাবেক সেনাপ্রধানের (আজিজ আহমেদ) দুর্নীতির চিত্র হিমশৈলের ক্ষুদ্র উপরিভাগমাত্র, এ কথা এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই। এখনই বিশেষ ব্যবস্থা নিয়ে দুর্নীতির এই বিস্তার রোধ করা না গেলে হিমশৈলের ধাক্কায় দেশের উন্নয়ন অগ্রগতির সলিলসমাধি হবে।

তিনি আরও বলেন, বিএনপি আমলে বাংলাদেশ দুর্নীতিতে পাঁচ-পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। দেশ এখন সে কলঙ্ক থেকে মুক্ত হলেও এখনো শীর্ষ দশের মধ্যে রয়েছে। বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্নীতির যে চিত্র সম্প্রতি বেরিয়ে আসছে, তা দেশের ভাবমূর্তি কেবল নয়, সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জনমনে অনাস্থা সৃষ্টি করছে।

দুর্নীতি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের দেওয়া বিবৃতিরও সমালোচনা করেন এই প্রবীণ রাজনীতিক। তিনি বলেন, ‘দুর্ভাগ্য, আমরা এখানে দেখলাম, পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন থেকে দুর্নীতির খবর প্রকাশ করার জন্য সাংবাদিকদের ধমক দেওয়া হয়েছে।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক ভারত সফরের প্রসঙ্গ টেনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক দলের নেতা মেনন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে তিস্তার পানিপ্রবাহ বৃদ্ধি ও সংরক্ষণের ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি কোথায় গেল, আমরা জানি না। তিস্তার পানিচুক্তি না করে এই সহযোগিতা গাছের গোড়া কেটে ওপর দিয়ে পানি ঢালার শামিল।’

‘নিষ্ঠুর অলিগার্কিরা (ক্ষমতাসীনদের মদদপুষ্ট একদল ধনী ব্যক্তি) দেশের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে’ উল্লেখ করে মেনন বলেন, সেই অলিগার্কির স্বার্থ রক্ষার্থে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা যায়নি। দ্রব্যমূল্যের ক্রমবর্ধমান ঊর্ধ্বগতি, দুর্নীতি, অর্থ পাচার, ব্যাংক খাতে লুট ও নৈরাজ্য, খেলাপি ঋণের বিশাল পাহাড় দেশের অর্থনীতিকে ভঙ্গুর অবস্থায় উপনীত করেছে।