কলেজের বিভিন্ন পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে জেলা প্রশাসক, টিএনও, এডিসিসহ ট্যাগ অফিসারদের সম্মানী পাঠাতে হয়। এমন একটি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। বক্তব্যটি বরিশাল মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার সরকারি রসিক চন্দ্র (আরসি) কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শহীদুল ইসলামের। গতকাল মঙ্গলবার সকালে ওই ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে। পরে শিক্ষার্থীরা ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শহীদুল ইসলামের পদত্যাগের দাবিতে কলেজের সামনে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন।
ওই ভিডিওর বক্তব্যে দেখা যায়, কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শহীদুল ইসলামকে এক শিক্ষার্থী জিজ্ঞেস করেন, ‘স্যার আমাদের পরীক্ষা দিতে হইলে ৫০০ টাকা দিয়ে প্রবেশপত্র নিতে হইবে?’ উত্তরে অধ্যক্ষ বলেন, ‘এটি তোমাদের কাছে আমার আবেদন’। এ সময় শিক্ষার্থী বলেন, ‘যদি আমরা ৫০০ টাকা দিয়ে অ্যাডমিট কার্ড না নিতে পারি?’ উত্তরে অধ্যক্ষ বলেন ‘তোমার উইস’। এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীর কথায় অধ্যক্ষ ক্ষেপে গিয়ে বলেন, ‘তুমি যদি আমার সঙ্গে যুদ্ধ করতে নামো, যুদ্ধ কন্টিনিউ করতে পারো সমস্যা নেই। সেকেন্ড ইয়ার, থার্ড ইয়ার তুমি যুদ্ধ করেই যেতে পারো।’ এর এক পর্যায়ে শিক্ষার্থী বলেন, ‘২৬০০ টাকা দিয়ে ফরম ফিলআপ করার পরে সব শিক্ষার্থীর তো আবার টাকা দেওয়ার অ্যাবিলিটি থাকে না।’
অধ্যক্ষ আরও বলেন, ‘শোনো, অ্যাবিলিটির কথা বইলো না। যারা গরিব তারা দিয়ে গেছে, রিকশাওয়ালার পোলা দিয়ে গেছে। যারা ধনী, সামর্থ্যবান তারা যুদ্ধ করে প্রিন্সিপালকে কীভাবে হেনস্তা করা যায়, তুমি যে অ্যান্ড্রয়েড ফোন ব্যবহার করো, আমি ছাত্র থাকা অবস্থায় কল্পনাও করতে পারি নাই, তুমি গরিব হলে কোথা থেকে।’
শহীদুল ইসলাম আরও বলেন, ‘টিএনও, ডিসি, এডিসি’র সম্মানী পাঠাইতে হবে। দুইজন ট্যাগ অফিসার আছে তাদের সম্মানী পাঠাইতে হবে। এটি সমঝোতার পদ। তোমরা সমঝোতার পথ বন্ধ করে দিলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তোমরা বলতে পারো; একরকম জোর করে তোমাদের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছি। কারণ আমি কী করব? অনার্সের কেন্দ্র ফি এক টাকাও নেওয়া হয়নি। সেখানে টিএনও, ডিসি, এডিসি’র সম্মানী পাঠানো লাগবে না। ওডা বিএম কলেজের ফাংশন।’ তিনি বলেন, ‘ডিসির সম্মানী নির্ধারিত। ১০ জন পরীক্ষা দিলেও যা আর ১২শ জন পরীক্ষা দিলেও তা। সরকার নির্ধারণ করে দিছে। তারা তো বোঝে না আমার কেন্দ্রের এই অবস্থা।’
এদিকে কলেজের সামনে সড়ক অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করলে মেহেন্দিগঞ্জ থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রাজিব হোসেন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন এবং শিক্ষার্থী ও কলেজের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেন।
মেহেন্দিগঞ্জ সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রাজিব হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের ইউএনও স্যার আমাকে বিষয়টি জানিয়ে ছিলেন। পরে আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত দেখেছি। তবে অধ্যক্ষের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক অবগত রয়েছেন। তাই প্রশাসনিকভাবে যে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার সেটি নেওয়া হবে।’
মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার কাজী আনিসুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি ওই কলেজের কেউই না।’ তবে ‘টিএনও, ডিসি, এডিসি’র সম্মানীর বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘এই বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই। এই বক্তব্য যিনি দিয়েছেন তিনিই এই বিষয়ে বলতে পারবেন।’
বিষয়ে বরিশাল অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রুম্পা সিকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ব্যাপারটি অনানুষ্ঠানিক ভাবে আমি শুনেছি। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে উনি বেশি টাকা নিচ্ছেন। তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল হিসেবে বিধিবহির্ভূত কাজ করছেন। বোর্ড কর্তৃক ফি তো নির্ধারিত করাই থাকে। এটা তিনি বিধিবহির্ভূত কাজ করছেন। এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পরে তদন্তপূর্বক বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক শহিদুল ইসলাম বলেন, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের বক্তব্য ও কার্যক্রম বিধিবহির্ভূত। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি।