আদর্শ মানুষের পরিচয়

মানুষ আল্লাহর সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। অন্যান্য সৃষ্টির পরিচয় আর মানুষের পরিচয় এক নয়। আল্লাহতায়ালা মানুষকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা সৃষ্টির সেরা করে সৃষ্টি করেছেন। বিশ্ব চরাচরে সৃষ্টিকুলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সম্মান ও মর্যাদাবান হচ্ছে মানুষ। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে মানবজাতির পরিচয় এভাবে তুলে ধরেছেন, ‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি। মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১১০) তবে মানুষ মানবীয় গুণাবলিতে গুণান্বিত হলেই সে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিতে পরিণত হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে আদর্শ শব্দের অর্থ হলো, যা অনুসরণ করার যোগ্য বা অনুসরণীয়। যা দেখে মানুষ অনুপ্রেরণা পায়, অনুকরণ বা অনুসরণ করতে চায়, তাকেই আদর্শ বলা হয়। ইসলামের আলোকে আদর্শ মানুষ হচ্ছে তারা, যারা মহান আল্লাহ ও রাসুল (সা.)-এর ভাষায় আদর্শবান। যেমন : পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হও। তার চেয়ে উত্তম গুণ আর কার আছে? আর আমরা তারই ইবাদতকারী।’ (সুরা বাকারা ১৩৮) অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা আল আহজাব, আয়াত ২১)

নবী-রাসুল মানবজাতির জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। কেননা তারা ছিলেন মাসুম তথা আল্লাহ কর্র্তৃক সুরক্ষাপ্রাপ্ত এবং তাদের সমগ্র জীবন ছিল ঐশী নির্দেশনায় পরিচালিত। সাইয়েদ কুতুব শহীদ (রহ.) বলেন, ‘রাসুল (সা.)-এর জীবনচরিত, তার বাস্তব জীবন এবং তাতে যা কিছু আছে তার সব আসমানি আহ্বানের প্রকৃতি দ্বারা সুবাসিত। তিনি আসমানি আলোয় পা ফেলে এগিয়েছেন। যার বিভা প্রকাশ পেয়েছে তার পরিবার ও নিকটজনদের জীবনে। ফলে তারা হয়ে ওঠেন মুক্তিপ্রাপ্ত মানুষের দৃষ্টান্ত।’ (ফি যিলালিল কোরআন ৭/২৫৩)

হজরত রাসুল (সা.)-এর অনুসরণ করা মুমিনের ইমানের দাবি। তবে কারও ইমান যদি দুর্বল হয় এবং রাসুল (সা.)-এর প্রতি তার ভালোবাসা দুর্বল হয়, তবে তার প্রতি আল্লাহর নির্দেশ হলো, ‘আপনি বলুন, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রাসুলের আনুগত্য করো।’ (সুরা নুর, আয়াত ৫৪)

মানবজাতির জন্য করণীয় হলো মহানবী (সা.)-এর আনুগত্য করা। এটা ঐচ্ছিক নয়; বরং আবশ্যিক। কেননা মহান আল্লাহ তার নবীর আনুগত্যকে নিজের আনুগত্য বলে ঘোষণা করেছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘কেউ রাসুলের আনুগত্য করলে সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল। আর কেউ মুখ ফিরিয়ে নিলে আপনাকে তাদের ওপর তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে প্রেরণ করিনি।’ (সুরা নিসা ৮০)

হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে আমার আনুগত্য করল সে আল্লাহরই আনুগত্য করল। আর যে আমার অবাধ্য হলো সে আল্লাহরই অবাধ্য হলো।’ (সহিহ বুখারি ৭১৩৭) সুতরাং মহান আল্লাহ ও তার রাসুলের আদর্শ তথা ইসলাম ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোনো মানুষের মতবাদকে আদর্শরূপে গ্রহণ করা যাবে না। সেগুলো আল্লাহ ও তার রাসুলের ভাষায় অনুকরণীয় আদর্শ নয়। তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্যও নয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য দ্বীন তালাশ করে, তা তার থেকে গ্রহণ করা হবে না। আর পরকালে সে হবে ক্ষতিগ্রস্ত।’ (সুরা আলে ইমরান ৮৫) তাই মানুষকে আল্লাহ ও তার রাসুলের আদর্শে আদর্শবান হতে হবে।

মানবিক উন্নত বৈশিষ্ট্যের অধিকারী, নৈতিকতার বিশেষণে ভূষিত এবং উত্তম চারিত্রিক গুণে গুণান্বিত মানুষকেই আদর্শ মানুষ বলা যায়। আদর্শ মানুষ ইসলামের প্রতি অনুগত ও ইবাদতকারী। এসব মানুষ আল্লাহ ও তার রাসুলের আদেশ-নিষেধ মেনে জীবনযাপন করে। আল্লাহভীতি আদর্শ মানুষের সবচেয়ে উত্তম গুণ। তারা স্বীয় জীবনকে পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র রাখে। এই আদর্শ মানুষই সমাজের মূলভিত্তি। তারা দেশ, জাতি ও সমাজের জন্য আদর্শ। তাদের দ্বারাই সমাজ সুন্দরভাবে চলে এবং মানবতা হয় উপকৃত। জাতি- ধর্ম নির্বিশেষে সবার কল্যাণে সে নিবেদিত হয়। সে অন্ধকারকে আলোকিত করে, অসুন্দরকে সুন্দর করে।

এসব গুণে কোনো মানুষ গুণান্বিত হলে তাকেই আদর্শ মানুষ বলে। আদর্শ সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের জন্য আদর্শ মানুষ দরকার। তাই দেশ, জাতি, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য মানুষকে আদর্শ হিসেবে গড়ে উঠতে হবে। তাহলে তাদের দ্বারা ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র সবাই কল্যাণ লাভ করবে এবং সবাই সুখ-শান্তিতে বসবাস করতে পারবে।