আন্তর্জাতিক আইন ও অনুরোধ উপেক্ষা করে প্রায় ৯ মাস ধরে গাজায় লাগাতার হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। হামলা হচ্ছে পশ্চিম তীরেও। দুই এলাকায় আলোচ্য সময়ে ৩৮ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে প্রায় ১ লাখের কাছাকাছি। ক্ষয়ক্ষতি ইসরায়েলেরও হয়েছে। প্রথম দিনই তাদের ১ হাজার ২০০ জনের মতো নাগরিককে হত্যা করে গাজার শাসক ও ফিলিস্তনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। সেদিন তারা কয়েক শ ইসরায়েলিকে জিম্মি করে নিয়ে আসে। হামাসের পরিকল্পনামতোই সে জিম্মিরাই যুদ্ধের বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছেন। এর আগে বেশ কয়েকজন জিম্মিকে মুক্তি দেওয়ার শর্তে হয় সাময়িক যুদ্ধবিরতিও। তবে এক সপ্তাহের সেই যুদ্ধবিরতির পর অনেক প্রচেষ্টাই ভেস্তে গেছে। কাতার, মিসর, যুক্তরাষ্ট্র কারও প্রচেষ্টাই হামাস-ইসরায়েল সংঘাত থামাতে পারেনি। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বারবার বলেছেন, হামাসকে নির্মূল না করা অবধি তারা হামলা বন্ধ করবেন না। তবে জিম্মি মুক্তির বিষয়টি নিয়ে নিজ দেশেই কিছু দিন ধরে চাপে আছেন তিনি। সব শেষ দেশটির শীর্ষ জেনারেলরা বলেছেন, গাজায় জিম্মি থাকা প্রায় ১২০ জন ইসরায়েলিকে মুক্ত করার সর্বোত্তম উপায় হতে পারে যুদ্ধবিরতি।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসকে একাধিক সেনা কর্মকর্তা জানান, তারা মনে করেন লেবাননের হিজবুল্লাহ বাহিনীর বিরুদ্ধে স্থল যুদ্ধ শুরু হলে, তাদের বাহিনীর প্রস্তুতির জন্য সময় লাগবে। তাদের ভাষ্য, হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির ফলে হিজবুল্লাহর সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো সহজ হতে পারে। কারণ হিজবুল্লাহ বলেছে, গাজা উপত্যকায় ইসরায়েল যুদ্ধ বন্ধ না করা পর্যন্ত তারা ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলে হামলা চালিয়ে যাবে।
জেনারেল স্টাফ ফোরাম নামে পরিচিত ইসরায়েলের সামরিক নেতৃত্ব প্রায় ৩০ জন সিনিয়র জেনারেলের সমন্বয়ে গঠিত। এর মধ্যে রয়েছেন সামরিক প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হার্জি হালেভি। তিনি সেনা, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর কমান্ডার এবং সামরিক গোয়েন্দা বিভাগেরও প্রধান।
গত বছরের শুরু পর্যন্ত ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করা আইয়াল হুলাতা বলেন, সেনাবাহিনী একটি জিম্মি চুক্তি ও যুদ্ধবিরতিতে পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছে। হুলাতা বলেন, তারা বুঝতে পেরেছেন যে গাজায় যুদ্ধবিরতি লেবাননে উত্তেজনা প্রশমনের সম্ভাবনা বাড়াবে। এ ছাড়া আগের তুলনায় তাদের যুদ্ধাস্ত্র, খুচরা যন্ত্রাংশ এবং জনবল সবকিছুই কমে গেছে। তাই তারা মনে করেন গাজায় যুদ্ধবিরতিতে তারা প্রস্তুতির জন্য আরও সময় পাবেন, যদি হিজবুল্লাহর সঙ্গে আরও বড় যুদ্ধ শুরু হয়।
সংবাদমাধ্যমটি বলছে, সামরিক নেতৃত্ব নেতানিয়াহুর কাছে তাদের মতামত জানিয়েছেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। যদিও সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে হতাশার ছায়া স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। অন্যদিকে, জেনারেলদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর হতাশাও বোঝা যাচ্ছে।
নেতানিয়াহু যুদ্ধবিরতিতে রাজি নন। তার মতে, এতে হামাস ফের শক্তি সঞ্চয় করবে। এ ছাড়া তিনি যুদ্ধবিরতিতে রাজি হলে তার জোট সরকারও ভেঙে যেতে পারে।
কিছুদিন আগ পর্যন্ত সামরিক বাহিনী প্রকাশ্যে বলে আসছিল যে সরকারের পক্ষে যুদ্ধের প্রধান দুটি লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব : হামাসকে পরাজিত করা এবং ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলার সময় হামাস ও তার মিত্রদের হাতে বন্দি জিম্মিদের উদ্ধার করা। তবে এখন জেনারেলদের মধ্যে এ বিষয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। যুদ্ধ শুরুর এত দিন পর এখন সামরিক হাইকমান্ড এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে লক্ষ্য দুটি পারস্পরিক অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
অক্টোবরে গাজায় আগ্রাসন চালানোর পর থেকে ইসরায়েল হামাসের প্রায় সব ব্যাটালিয়নকে পরাজিত করেছে এবং বেশিরভাগ অঞ্চল দখল করে নিয়েছে। তবে গত অক্টোবরে অপহৃত ২৫০ ইসরায়েলি জিম্মির মধ্যে অর্ধেকেরও কম বন্দিকে মুক্ত করতে পেরেছে তারা।
হাইকমান্ড আশঙ্কা করছেন, জিম্মিদের উদ্ধারে সামরিক অভিযান চালিয়ে গেলে এসব জিম্মির প্রাণ সংশয়ের ঝুঁকি তীব্র হতে পারে।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে গাজা দখল বা ফিলিস্তিনের অন্যান্য নেতার কাছে গাজার নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দিতে অনিচ্ছুক হওয়ায় সামরিক বাহিনী একটি ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধের’ আশঙ্কা করছে।
এই পরিস্থিতিতে জিম্মিদের ফিরিয়ে আনার বিনিময়ে হামাসকে আপাতত ক্ষমতায় রাখাই ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে খারাপ বিকল্প বলে মনে হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন। যুদ্ধবিরতি সমর্থন করেন কি না এ প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে সামরিক বাহিনী একটি বিবৃতি দিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, সামরিক বাহিনী হামাসের সামরিক ও শাসনক্ষমতা ধ্বংস, জিম্মিদের ফিরিয়ে আনা এবং দক্ষিণ ও উত্তরাঞ্চল থেকে ইসরায়েলি বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপদে তাদের বাড়িঘরে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।
তবে সাম্প্রতিক অন্যান্য বিবৃতি ও সাক্ষাৎকারে সামরিক নেতারা ব্যক্তিগতভাবে যুদ্ধবিরতিতে সমর্থন জানানোর বিষয়ে প্রকাশ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান মুখপাত্র রিয়ার অ্যাডমিরাল ড্যানিয়েল হ্যাগারি গত ১৯ জুন এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘যারা মনে করেন আমরা হামাসকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারব, তারা ভুল করছেন।’ তিনি বলেন, ‘হামাস একটি মতাদর্শ। হামাস একটি রাজনৈতিক দল। এর শিকড় মানুষের হৃদয়ে প্রোথিত।’ এ সময় নেতানিয়াহুর প্রচ্ছন্ন সমালোচনায় তিনি বলেন, জনগণের চোখে ধুলা দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, হিজবুল্লাহর সঙ্গে বৃহত্তর যুদ্ধ শুরু হলে সেনাবাহিনীর প্রস্তুতির জন্য এ পদক্ষেপটি আবশ্যক। দেশটির বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল আগামী সপ্তাহগুলোতে লেবাননে হিজবুল্লাহর বিভিন্ন ঘাঁটিতে আক্রমণের পরিকল্পনা করতে পারে।
চার দশকের মধ্যে ইসরায়েল যত যুদ্ধ লড়েছে এর মধ্যে এটিই সবচেয়ে তীব্র এবং গাজায় এযাবৎকালের সবচেয়ে দীর্ঘ যুদ্ধ। দেশটির সেনাবাহিনী মূলত রিজার্ভদের ওপর নির্ভরশীল। অক্টোবরের পর থেকে কেউ কেউ তৃতীয় বারের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করছেন। এতে তাদের পেশাদার এবং পারিবারিক জীবনে ভারসাম্য বজায় রাখা কষ্টকর হচ্ছে।
চার সামরিক কর্মকর্তার মতে, রিজার্ভদের সংখ্যা কম। অক্টোবরে হামাসের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতার কারণে সামরিক নেতৃত্বের প্রতি আস্থার সংকট যেমন দেখা দিয়েছে, তেমনি কর্মকর্তারাও তাদের কমান্ডারদের প্রতি ক্রমে অবিশ্বাসী হয়ে উঠছেন।
সামরিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত চার হাজারের বেশি সেনা আহত হয়েছে, যা ২০১৪ সালে গাজায় চলা যুদ্ধের তুলনায় ১০ গুণ বেশি।
দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা আজকাল গাজার বেশ কয়েকটি ট্যাংক কিছুটা খালি রাখছেন। কারণ হিজবুল্লাহর সঙ্গে আরও বড় যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা থাকায় সামরিক বাহিনী তার স্টক সংরক্ষণের চেষ্টা করছে। সেনাবাহিনীর গোলাবর্ষণ কমানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পাঁচ কর্মকর্তা ও অফিসার।
সেনাবাহিনীর ট্যাংক, সামরিক বুলডোজার ও সাঁজোয়া যানের খুচরা যন্ত্রাংশের অভাব রয়েছে বলেও জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তারা।
মি. হুলাতা ও অন্য অফিসাররা বলেছেন, ইসরায়েলের কাছে এখন পর্যন্ত লেবাননের হিজবুল্লাহর সঙ্গে লড়াই করার জন্য পর্যাপ্ত অস্ত্র রয়েছে। তবে সব মিলিয়ে সেরাটা দেওয়ার সামর্থ্য হয়তো ইসরায়েলি বাহিনীর নেই।