ঘরেই হত্যাকারী খুঁজছে পুলিশ

রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর মোমেনবাগে সফিকুর ও ফরিদা দম্পতি খুনের ঘটনায় পাঁচটি কারণ বিবেচনায় নিয়ে তদন্তে নামলেও এখন ঘরের দিকেই মনোযোগ দিয়েছেন তদন্তকারীরা।

খুন হওয়া দম্পতির ছেলে পুলিশের বিশেষ শাখায় কর্মরত উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুল্লাহ আল মামুন ওরফে ইমন, তার স্ত্রী ও শাশুড়িকে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। বাদ যাচ্ছে না নিহত দম্পতির মেয়ে ইবু ও তার স্বামী আরিফুর রহমানসহ মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকজনও।

এছাড়া বাড়ির গৃহপরিচারিকা মহিমাসহ খুব কাছের স্বজনরদেরও পর্যায়ক্রমে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। পুলিশের নজরদারিতেও রয়েছেন তারা। এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও পারিবারিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। থানা-পুলিশের পাশাপাশি এই হত্যাকাণ্ডের ছায়া তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন ও র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)।

কোরবানির ঈদের তিনদিন পর গত ২০ জুন নিজ বাড়ি থেকে সফিকুর-ফরিদা দম্পতির রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কুপিয়ে সফিকুর রহমানের ক্ষতবিক্ষত দেহ ফেলে রাখা হয় বাড়ির গ্যারেজে। তার স্ত্রী ফরিদা ইয়াসমিনের রক্তাক্ত মরদেহ পড়ে ছিল দোতলার শোবার ঘরের বিছানায়। চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডটির ১৮ দিন পেরিয়ে গেলেও গ্রেপ্তার হয়নি কেউ। হত্যাকাণ্ডটির পেছনে খুন হওয়া দম্পতির গ্রামের বাড়ি দাগনভূঞায় জমিসংক্রান্ত দ্বন্দ্ব, পুরনো শত্রুতা ও সম্পত্তি বাগিয়ে নেওয়াসহ পাঁচটি কারণ চিহ্নিত করে তদন্তে নামে পুলিশ। তবে খুনিরা সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ঘটানোয় বারবার বিভ্রান্তিতে পড়ছেন তদন্তকারীরা।

নিহত সফিকুর রহমানের ভাই মজিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশ এখন ছেলে (ইমন), ছেলের বউ আর তার শাশুড়িকে বারবার জিজ্ঞাসাবাদ করছে। ছেলের শাশুড়িকে বলা হচ্ছে তিনিই না-কি খুন করেছেন।’ বিষয়য়টি দেশ রূপান্তরের কাছে স্বীকার করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার মো. ইকবাল হোসাইন। তিনি বলেন, ‘খুব কৌশলে হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয়েছে। আমরা বেশ কিছু কারণ ধরে হত্যাকাণ্ডটি তদন্ত করছি। তদন্তের প্রয়োজনে ভুক্তভোগীর ছেলে, ছেলের স্ত্রী, তার শ্বশুরবাড়ির লোকসহ মেয়ে, মেয়ের জামাতা ও তার পরিবারের লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করছি। এছাড়া পুরনো লেনদেনের বিষয়টি মাথায় রেখে খুব কাছের স্বজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।’

নিহত দম্পতির ঘনিষ্ঠজনদের মোবাইল ফোনের যোগাযোগ ও হত্যাকাণ্ডের আগে-পরের গতিবিধি পর্যালোচনা করে নানা বিষয়ে সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে তদন্তের জন্য ঘটনাস্থলের আশপাশের দুই বর্গ কিলোমিটার এলাকার ২০০ সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে ফুটেজগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণও চলছে। 

ঘটনার রাত ১৯ জুন বাড়িতে ছিলেন না নিহত দম্পতির ছেলে ইমন ও তার স্ত্রী। ঈদের ছুটি হওয়ায় চারতলা এই বাড়ির অন্য ভাড়াটিয়ারাও বেশিরভাগই ছিলেন গ্রামের বাড়িতে। একপ্রকার ফাঁকা বাসাতেই খুনিরা এসে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে নির্বিঘেœ চলে যায়। বাড়ি জুড়ে ছিল খুনিদের হাত ও পায়ে লাগা রক্তের ছাপ। পরদিন সকালে খবর পেয়ে ছেলে ইমন ও তার স্ত্রীসহ অন্য স্বজনরা আসেন। ২০ জুন ইমন বাদী হয়ে যাত্রাবাড়ী থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় তিনি বলেন, ‘২০ জুন সকালে আমার ভাড়াটিয়া বন্ধু কাউসার মোবাইল ফোনে আমার স্ত্রীকে জানায়, আমার বাবার রক্তাক্ত মরদেহ বাসার নিচতলায় ফাঁকা জায়গায় পড়ে আছে। স্ত্রীর থেকে খবর পেয়ে আমি তাৎক্ষণিক বাড়িতে আসি। তারপর বাড়িতে উপস্থিত লোকজনের কাছে জানতে পারি, আমার বাবার মুখে ও মাথার ডান পাশে ঘাড় বরাবর ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয়েছে। তার মরদেহ নিচতলায় ফাঁকা জায়গায় পড়ে ছিল। তারপর বাড়ির দোতলার কোনার ঘরে বিছানায় মায়ের মরদেহ পড়ে ছিল। তারও মুখে ধারালো অস্ত্রের আঘাত ছিল। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর পেয়ে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ এসে তাদের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য নিয়ে যায়।’

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয় নিহত দম্পতির ছেলে আবদুল্লাহ আল মামুন ওরফে ইমনের কাছে। পেশা জীবনে এমন অনেক ঘটনার রহস্য উন্মোচন করা এই পুলিশ কর্মকর্তা নিজের পরিবারের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ওই ঘটনার কোনো সুরাহা করতে পারছেন না। এজন্য আক্ষেপ নিয়ে তিনি বলেন, ‘অনেক ঘনিষ্ঠজনদেরই জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। অথচ কোনো কূলকিনারা পাওয়া যাচ্ছে না। প্রকৃত অপরাধী আইনের আওতায় আসুক, বিচার হোক।’

নিহত সফিকুর রহমান জনতা ব্যাংকের সাবেক গাড়িচালক। তার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ফেনীর দাগনভূঞার গ্রামের বাড়িতে জমিসংক্রান্ত বিরোধ চলছে চাচাতো ভাইয়ের ছেলেদের। ওই বিরোধের জেরে চারটি মামলা করেছে চাচাতো ভাইয়ের স্ত্রী নূর জাহান। মামলাগুলোর মধ্যে দুটি খারিজ হয়ে গেছে আর দুটি চলমান। ফলে পারিবারিক ঘনিষ্ঠজনদের সন্দেহ না করে এই জমি নিয়ে যাদের সঙ্গে বিরোধ তাদের প্রাধান্য দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন নিহতদের স্বজনরা।

নিহতের ভাই মজিবুর রহমান বলেন, ‘পুলিশ বলছে সম্পত্তি বাগাতে তার ছেলে, ছেলের বউ আর শাশুড়ি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে কিন্তু তাদের তো সম্পদের অভাব নেই। তারা কেন এটা করবে। আমার মনে হয়, জমি নিয়ে যাদের সঙ্গে বিরোধ, তাদের দিকে নজর দেওয়া উচিত।’

বাড়িতে আসা-যাওয়া করা এক তরুণ ও নারীকে ঘিরে রহস্য : নিহত দম্পতির বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত ছিল এক তরুণ আর এক নারীর। এই দুজন সম্পর্কে মা- ছেলে। ছেলেটি সফিকুর রহমানের বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত করত এবং বিভিন্ন ফুট-ফরমাশ খাটত। এই দুজনের সঙ্গে খুন হওয়া দম্পতির খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। তাদের বিভিন্ন সময় মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে সাহায্য-সহযোগিতা করতেন সফিকুর রহমান।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা যাত্রাবাড়ী থানার উপপরিদর্শক মৃগাংক শেখর তালুকদার বলেন, ‘এটি খুবই সংবেদনশীল হত্যাকাণ্ড। যাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে তাদের থেকে যা পেয়েছি সেটা নিয়ে কিছু বলতে চাই না। শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে কিছুই বলার সুযোগ নেই।’