দরে আটকা পড়েছে পানি

পানির ‘দরে’ আটকে আছে বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরের পানি সরবরাহ প্রকল্প। পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) পদ্ধতিতে কোরীয় একটি কোম্পানি মিরসরাই থেকে ১৫০ কিলোমিটার দূরের চাঁদপুরের মোহনপুর থেকে দিনে ৫০ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করবে। ২২ হাজার ৬৯ কোটি টাকায় দুই ফেইজে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করার বিষয়ে ২০২২ সালের ৩১ আগস্ট নীতিগত অনুমোদন হলেও এখনো প্রকল্পের কাজ শুরু হয়নি।

পিপিপি কর্তৃপক্ষ প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়ার পর পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কয়েক দফায় স্টাডি করে কোরীয় কোম্পানির বিনিয়োগ ও পানি সরবরাহের প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করে দর ঠিক করে। সেই দর ও স্টাডি রিপোর্টের ওপর গত ৩০ এপ্রিল বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে বেজা, পিপিপি কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম ওয়াসা, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে সভা হয়। সভায় পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত পানির দরের সঙ্গে বেজা ও চট্টগ্রাম ওয়াসার আরোপিত সার্ভিস চার্জ যোগ করে পানির প্রাথমিক দর ঠিক করতে বলা হয়। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকেও পানির দর কমানোর চেষ্টা করতে বলা হয়।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান পানির দর কত প্রস্তাব করেছে আর বেজা ও ওয়াসার চার্জ কত হতে পারে এ প্রশ্নের উত্তরে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ গত বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রতি ১ হাজার লিটার পানির দর ধরেছে ৯১ টাকা ৩০ পয়সা। এর সঙ্গে বেজা ও ওয়াসার চার্জ যোগ করলে ১১০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।’

এই দরে বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরের কারখানার মালিকরা পানি কিনবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। কোরীয় কোম্পানিটি বেজার স্টোরেজে পানি সরবরাহ করার পর সেখান থেকে অভ্যন্তরীণ লাইনে কারখানাগুলোয় পানি দেবে বেজা। কারখানার মালিকরা পানির দামও শোধ করবেন বেজাকে। আর বেজা দেবে বিনিয়োগকারী কোরীয় ‘তাইয়েং ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি’কে।

এ বিষয়ে বেজার বঙ্গবন্ধু শিল্পনগনের প্রকল্প পরিচালক আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, ‘আমরা যাদের জন্য পানির প্রকল্প গ্রহণ করছি, তারা পানি না নিলে সমস্যা। তাই পানির মূল্যের বিষয়ে উচ্চপর্যায়ে সিদ্ধান্ত হবে। এই প্রকল্পে সরকারের পক্ষ থেকে আরও কিছু বিনিয়োগ এলে হয়তো পানির দর আরও কমতে পারে। এই পানি ব্যবহার করবে বিদেশি কোম্পানি, তাই সরকার ভর্তুকি দেবে কি না, এখনই বলা যাচ্ছে না।’

প্রকল্পটি পিপিপির আওতায় হচ্ছে বলে কথা হয় পিপিপির মহাপরিচালক (প্রোগ্রাম অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট) আবুল বাশারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সাধারণত এ ধরনের প্রকল্পে সরকার প্রায় ২০ শতাংশ টাকা বিনিয়োগ করতে পারে। বিনিয়োগ করলে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট অনুযায়ী পানির দর ৭৫ টাকায় নেমে আসতে পারে। দেখা যাক কী সিদ্ধান্ত হয়।’

পাশের দেশে শিল্পে পানির দর কত এমন প্রশ্নের জবাবে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী একেএম ফজলুল্লাহ বলেন, ‘সরকার ভর্তুকি দেয় জনগণের জন্য। এ পানি ব্যবহৃত হবে বিদেশি বিনিয়োগের প্রকল্পে। তা দিয়ে বিদেশি কোম্পানিগুলোর শিল্পোৎপাদন হবে। ভারতের চেন্নাইয়ে ১ হাজার লিটার পানির দর ২৩২ টাকা, ত্রিপুরায় ১৯৮ টাকা, দিল্লিতে ২৩১ টাকা, হায়দরাবাদে ৩১৬ টাকা; ফিলিপাইনে ১৩৫ টাকা ৩০ পয়সা, ভিয়েতনামে ১৪৭ টাকা ৪০ পয়সা, থাইল্যান্ডে ১০৩ টাকা ৪০ পয়সা এবং সিঙ্গাপুরে ১৭৩ টাকা ৮০ পয়সা।’

তিনি বলেন, ‘যেহেতু ১৫০ কিলোমিটার দূর থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি আনা হবে তাই দাম কমানোর সুযোগ নেই। আর বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরে ভূ-পৃষ্ঠস্থ পানি ছাড়া কোনো গতি নেই।’ 

প্রকল্প সম্পর্কে চট্টগ্রাম ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর পানি সরবরাহ প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ নুরুল আমিন বলেন, ‘১ হাজার ৮০০ মিলিমিটার ব্যাসের পাইপ দিয়ে চাঁদপুরের মোহনপুর থেকে দুটি বোস্টার স্টেশনের মাধ্যমে পানি আসবে মিরসরাইয়ে। প্রথম পর্যায়ে ২০৩০ সাল নাগাদ দিনে ২৫ কোটি লিটার এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ২০৪০ সাল নাগাদ আরও ২৫ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা হবে।’

বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরের ভেতরে পানির সংযোগ কারা দেবে এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের কাজ হলো বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরে পানি পৌঁছে দেওয়া। বেজার পক্ষ থেকে অভ্যন্তরীণ বিতরণ নেটওয়ার্ক তৈরি করার কথা।’

জানা গেছে, কোরীয় কোম্পানিটি ৩০ বছর পর প্রকল্পটি চট্টগ্রাম ওয়াসার কাছে হস্তান্তর করবে।

১৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ও বুস্টার স্টেশন স্থাপন করতে ২২১ দশমিক ৬৯ একর ভূমির প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ের ১৪২ দশমিক শূন্য ২ একর, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের ৬ দশমিক ৪৭ একর, জেলা পরিষদের ৩ দশমিক শূন্য ২ একর, জেলা প্রশাসনের ৯ দশমিক শূন্য ৯ একর, ব্যক্তিমালিকানাধীন ১৪ দশমিক ৬৭ একর এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ৩১ দশমিক ৮৭ একর জায়গা রয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণের টাকা বাংলাদেশ সরকার দেবে এবং নির্মাণ খরচ জোগাবে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান।

উল্লেখ্য, সাগরে জেগে ওঠা প্রায় ৩০ হাজার একর ভূমিতে গড়া হচ্ছে উপমহাদেশের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক অঞ্চল। ১০ বছরে ১২০টি প্রতিষ্ঠানের ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে ১৫ লাখ লোকের কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা করা হয়েছে মিরসরাই, সীতাকু- ও সোনাগাজীর এই অঞ্চলে। কিন্তু পানি ছাড়া উন্নয়ন পরিকল্পনা অচল। প্রথমে চট্টগ্রামের হালদা নদী থেকে দৈনিক ১৪ কোটি লিটার পানি উৎপাদনের পরিকল্পনা করা হলেও পরিবেশবাদীদের চাপে সেখান থেকে সরে আসে সরকার। পরে ফেনী নদী ও মুহুরী নদীর পানি পরিশোধন করে দৈনিক দুই থেকে তিন কোটি লিটার এবং ভূগর্ভস্থ পানি থেকে আরও প্রায় দুই কোটি লিটার সরবরাহের কথা ভাবা হয়। কিন্তু ভূ-গর্ভস্থ পানি দিয়ে বিশাল এ অর্থনৈতিক অঞ্চলে পানি জোগানো সম্ভব নয়। তাই ওয়াসা পিপিপির আওতায় মেঘনা থেকে দিনে ৫০ কোটি লিটার পানি সরবরাহের পরিকল্পনা করেছে।