গাড়িচাপায় দারোয়ানকে ‘হত্যা’

বাড়িওয়ালাকে বাঁচাতে দৌড়ঝাঁপ প্রভাবশালীদের

রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজার এলাকায় গাড়িচাপা দিয়ে আবাসিক ভবনের নিরাপত্তাকর্মী মো. ফজলুল হককে হত্যার অভিযোগ ওঠার পর থেকে পলাতক রয়েছেন ভবনটির ফ্ল্যাটমালিক প্রকৌশলী মফিদুল ইসলাম। আর মফিদুলের পক্ষ হয়ে স্থানীয় প্রভাবশালীরা ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। তারা বিভিন্ন কৌশলে নিহতের পরিবারকে চাপ দিয়ে মামলা করিয়েছে সড়ক পরিবহন আইনে। এ ছাড়া বিষয়টির সমঝোতার জন্য স্থানীয় কাউন্সিলরের অফিসে একাধিক বার বৈঠকেও বসেছে।

পুলিশ বলছে, মফিদুল গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গেট ভেঙে ফজলুলকে চাপা দেয় বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তবে নিহতের পরিবারের দাবি, কোনো কারণে আক্রোশ থেকে বা পরিকল্পনা করে ফজলুলকে হত্যা করা হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার সকালে ফজলুল নিহত হওয়ার পর রাতে মফিদুলকে আসামি করে মামলা করেন নিহতের স্ত্রী। এরপর গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত একাধিক অভিযান চালানোর কথা জানালেও মফিদুলকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। তবে পূর্ব রাজাবাজার এলাকায় প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত ইন্দিরা রোড ইউনিট আওয়ামী লীগের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন চুন্নু প্রকৌশলী মফিদুলের পক্ষ হয়ে বিষয়টি নিয়ে সমঝোতার জন্য নিহত নিরাপত্তাকর্মীর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেনদরবার করছেন বলে জানা গেছে।

নিহত ফজলুল হকের বাড়ি নেত্রকোনায়। চাকরি করতেন সেফ ফোর্স সিকিউরিটি কোম্পানিতে। তার দুটি মেয়ে রয়েছে। বড় মেয়ের বয়স ৫ বছর ও ছোট মেয়ের বয়স ১৬ মাস। ফজলুলের স্ত্রী বর্তমানে অন্তঃসত্ত্বা। পরিবারের একমাত্র উপর্জনক্ষম ছিলেন ফজলুল। তার মৃত্যুতে পরিবারটি পথে বসে গেছে। কোথায় যাবে, কী খাবে সেই চিন্তায় দিশেহারা ফজলুলের স্ত্রী শরিফা বেগম।

আর তার এই অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দিতে বিভিন্ন তৎপরতা চালাচ্ছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। ফজলুলের স্ত্রীকে ভুল বুঝিয়ে এ ঘটনায় মামলা করানো হয়েছে সড়ক পরিবহন আইনে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হত্যা মামলা না করে দুর্ঘটনার মামলা করায় দোষীরা খুব সহজেই ছাড় পেয়ে যেতে পারে।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ঢাকায় সেফ ফোর্স সিকিউরিটি কোম্পানিতে চাকরি করতেন ফজলুল। এক মাস আগেই পূর্ব রাজাবাজার এলাকার এই ভবনে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে নিয়োগ পান। গত বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে তার ডিউটি ছিল। সকাল সোয়া ৮টার দিকে আসামি মফিদুল গ্যারেজ থেকে বের হওয়ার সময় দ্রুত ও বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালিয়ে ফজলুলকে ধাক্কা দিলে গেট ভেঙে রাস্তার ওপর ছিটকে পড়েন তিনি। এরপর মফিদুল তার গাড়িটি ফজলুলের শরীরের ওপর উঠিয়ে দেয়। এতে ফজলুলের কোমর ভেঙে যায় এবং কপাল, ডান হাতসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে কাটাসহ গুরুতর জখম হয়। এরপর তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এরই মধ্যে মালিক মফিদুল গাড়িটি রেখেই পালিয়ে যান।

নিহত নিরাপত্তাকর্মীর স্ত্রী শরিফা বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, তার স্বামীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। আসামিকে দ্রুত গ্রেপ্তার করলেই এর কারণ জানা যাবে।

তিনি আরও বলেন, ‘আমার দুইটা মেয়ে। আমার মেয়েরা এতিম হয়ে গেল। আমি এখন এদের নিয়ে কীভাবে থাকব। আমি আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই।’

নিহত ফজলুলের বোন মিনারা বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘটনার পর পুরো বিষয়টি ম্যানেজের চেষ্টা করছে রাজাবাজারের স্থানীয় বড় ভাই পরিচয় দেওয়া চুন্নু ও শাহজাহান নামে দুই লোক। কয়েক দফায় কাউন্সিলরের অফিসে আমাদের বোঝানো হয়েছে মীমাংসার জন্য। আমাদের সঙ্গে মীমাংসার কথা বলে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।’

তবে ইন্দিরা রোড ইউনিট আওয়ামী লীগের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন চুন্নু অভিযোগ মিথ্যা দাবি করে বলেন, ‘আমি নিরাপত্তাকর্মীর পরিবারকে সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসছিলাম। কাউন্সিলরের অফিসে নিয়ে তাদের বুঝিয়ে মামলা করিয়েছি। এ সময় শেরেবাংলা নগর থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি শাহজাহান শিকদারও ছিলেন।’

এদিকে মফিদুল ইসলামের গাড়ির চালকের দাবি গাড়িটির ব্রেকপ্যাড ক্ষয় হয়ে গিয়েছিল। তিনি বলেন, ‘স্যার (মফিদুল) সেটা চেক করতে গাড়িতে উঠে পা দিয়ে একসেলেটরে চাপ দেন, এরপর গাড়ি চলতে শুরু করলে তিনি হয়তো থামাতে গিয়ে ব্রেকে পা না দিয়ে ভুলে একসেলেটরে আরও জোরে চাপ দেন। এতে গাড়ি মুহূর্তের মধ্যে গেট ভেঙে বাইরে গিয়ে ধাক্কা খায়।’

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে জানা গেছে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গেট ভেঙে ফজলুলকে চাপা দেয় আসামি মফিদুল। ঘটনার পর থেকে তিনি পলাতক। আমরা তাকে গ্রেপ্তারের জন্য কয়েক দফা অভিযান চালিয়েছি। খুব দ্রুতই আসামিকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হবে।’