দু-তিন দিন ধরে চট্টগ্রামসহ সারা দেশে শিশু ‘নিখোঁজের খবর’ চাউর হচ্ছে ফেসবুকে। কয়েকটি পেজ ও গ্রুপে ঘুরপাক খাচ্ছে শিশু নিখোঁজবিষয়ক স্ট্যাটাস। যাচাই না করেই এসব স্ট্যাটাসকে সত্য ধরে নিয়ে অনেকে শেয়ারও করছেন নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে। এতে জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন অভিভাবকরা।
চট্টগ্রামের পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ফেসবুকে ‘ভিকটিম’ শিশুর ছবি ও তথ্য দিয়ে বিভিন্ন গ্রুপে ও ব্যক্তিগত প্রোফাইলে নিখোঁজের স্ট্যাটাস দেওয়া হচ্ছে। আসলে এসব গুজব। যারা হারিয়েছে তারা কয়েক ঘণ্টা পর বাড়ি ফিরে এসেছে।
ঢাকা-চট্টগ্রামে ৪৮ ঘণ্টায় ৩৫ শিশু নিখোঁজের গুজব ছড়ানোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কিছু গ্রুপের অ্যাডমিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ। সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আবদুল মান্নান মিয়া গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অ্যাডমিনরা ভুল স্বীকার করেছে। মুচলেকা দিয়েছে। এ বিষয়ে পুলিশ সতর্ক আছে। গুজবে বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই।’
স্ক্রিনশট থেকে প্রাপ্ত চারজন অভিভাবকের মোবাইল ফোন নম্বরে গতকাল কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক। তারা চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, ঢাকার শাহজাহানপুর থানা ও লক্ষ্মীপুর এলাকা থেকে ‘নিখোঁজ’ হওয়া চার শিশুর অভিভাবক। তারা জানান, শিক্ষকের কাছ থেকে ছুটি নিয়ে মাদ্রাসাপড়ুয়া এক শিশু চলে যায় খালার বাড়িতে, আরেক মাদ্রাসাছাত্র পরিবারকে না জানিয়ে চলে যায় ফুফুর বাড়িতে। পঞ্চম শ্রেণিপড়ুয়া এক শিশু বন্ধুর সঙ্গে ট্রেনে চড়ে চলে যায় কিশোরগঞ্জে, সপ্তম শ্রেণির আরেক ছাত্র বন্ধুকে নিয়ে ঘুরতে চলে যায় কক্সবাজারে। তাদের কেউ সকালে ‘নিখোঁজ’ হয়ে সন্ধ্যায় ফিরেছে। আবার কাউকে পরিবার উদ্ধার করেছে দুই বা তিন দিন পর। এসব ঘটনায় ‘ভিকটিমের’ বাবা-মা নিজেরাই ফেসবুকে ছেলে ‘নিখোঁজের’ স্ট্যাটাস দিয়েছেন। অবশ্য কয়েক ঘণ্টা পর ‘নিখোঁজ’ ছেলে ফিরে আসায় ফেসবুকের স্ট্যাটাস ডিলিট করে দেন। চট্টগ্রাম নগর ও জেলা পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহে নগরের আকবর শাহ, পাঁচলাইশ ও হালিশহর থানা এলাকায় তিনটি নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে। তবে ভিকটিম শিশু নয়, তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্ক। এদের একজন ঋণের কারণে, অন্যজন প্রেমজনিত কারণে ও একজন অভিমান করে বাড়ি ছাড়েন। নিখোঁজ ওই তিনজনের মধ্যে দশম শ্রেণির এক ছাত্রকে গতকাল উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিএমপির এক কর্মকর্তা।
গত এক সপ্তাহে জেলার ১৬ থানা থেকে বিশেষ করে সাতকানিয়া থেকে তিনজন শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় জিডি করেছেন অভিভাবকরা। ইতিমধ্যে দুই শিশুকে উদ্ধার করা গেলে একজনকে এখনো উদ্ধার করা যায়নি বলে গতকাল বিকেলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন।
ঢাকা-চট্টগ্রামে ৩৫ শিশু ‘নিখোঁজ’ হওয়ার ঘটনা ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ার বিষয়টি স্রেফ গুজব বলে মন্তব্য করে নগর-পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আবদুল মান্নান মিয়া বলেন, ‘ফেসবুকে শিশু নিখোঁজের গুজব ছড়ানো হচ্ছে। আতঙ্ক সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যেই এটা করা হচ্ছে। গুজব ছড়ানোর অভিযোগে তিনটি গ্রুপের অ্যাডমিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তারা ভুল স্বীকার করেছে। ক্ষমা চেয়ে মুচলেকা দিয়েছে। তবে এখনকার শিশুরা অনেক আবেগপ্রবণ ও স্বাধীনচেতা। অভিভাবকদের উদ্দেশে বলি, শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করুন।’
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন বলেন, ‘শিশু নিখোঁজের তিনটি ঘটনায় পেশাদার কোনো অপরাধচক্রের জড়িত থাকার আলামত পাওয়া যায়নি। সমাজে আতঙ্ক সৃষ্টি করতেই ফেসবুকে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। পুলিশ সতর্ক রয়েছে।’
জানা গেছে, গত বুধবার বেলা ১১টার দিকে সাতকানিয়া উপজেলার মাদ্রাসাছাত্র মো. আবু সুফিয়ান (১১) বাড়ি যাওয়ার কথা বলে শিক্ষকের কাছ থেকে ছুটি নিয়ে চলে যায় বান্দরবান জেলার শুহলক এলাকায় খালার বাড়িতে। একই দিন সন্ধ্যায় সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে বাড়ি নিয়ে আসেন তার বাবা অটোরিকশাচালক মো. মিজান। ৩ জুলাই সকালে ‘নিখোঁজ’ হয় সাতকানিয়ার আরেক মাদ্রাসাছাত্র রোবায়েদ হোসেন সায়েম (৮)। ৪ জুলাই সকালে তার খোঁজ পাওয়া যায় একই উপজেলার পদুয়ায় ফুফুর বাড়িতে। সায়েমের বাড়ি উপজেলার ছদাহা ইউনিয়নের রোয়াজিরপাড়ায়।
লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ থানপাড়া উচ্চবিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র সিয়াম। তার বাবার নাম হারুনুর রশীদ। গত ২ জুলাই সকালে পরিবারকে না জানিয়ে বন্ধুর সঙ্গে ঘুরতে চলে যায় কক্সবাজারে। সেখানে গিয়ে ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে তারা। টাকাপয়সা হারিয়ে কাঁদতে থাকে সিয়াম। এক নারী জিজ্ঞেস করলে সে ঘটনা খুলে বলে। ওই নারী তার বাবাকে মোবাইল ফোনে বিষয়টি জানান। পরে তার বাবা হারুনুর রশীদ কক্সবাজার গিয়ে ছেলে ও তার বন্ধুকে বাড়ি নিয়ে আসেন।
গত ৩ জুলাই বন্ধুর সঙ্গে ট্রেনে করে কিশোরগঞ্জে চলে যায় ঢাকার মতিঝিল কলোনির উচ্চবিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র আলিফ। চার দিন পর ৭ জুলাই তাকে কিশোরগঞ্জ থেকে উদ্ধার করে পরিবার। এর আগে থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করেন তার মা সাবিনা আক্তার। আলিফ পরিবারের সঙ্গে ঢাকার শাহজাহানপুর থানার বারাকা হাসপাতাল এলাকার বাড়িতে থাকে।
শিশু নিখোঁজের খবরটি গুজব
‘ব্রেকিং নিউজ! গত ৪৮ ঘণ্টায় ঢাকা ও চট্টগ্রামে ৩৫টি বাচ্চা নিখোঁজ। সতর্ক থাকুন।’ এমন পোস্টে সয়লাব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক। এটি গুজব বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
শিশু নিখোঁজ-সংক্রান্ত পোস্ট পুলিশ সদর দপ্তরের নজরেও পড়েছে। এ ধরনের পোস্ট নিছক গুজব বলে জানিয়েছে পুলিশ। গুজবে বিভ্রান্ত বা আতঙ্কিত না হওয়ার জন্য সবার প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে তারা। গতকাল পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ কথা জানানো হয়েছে।
শিশু নিখোঁজের বিষয়ে সম্ভাব্য প্রথম ভাইরাল পোস্টদাতাকে শনাক্ত করেছে পুলিশ। তার নাম সাফিউল্লাহ সাফা। ইতিমধ্যে তিনি পোস্টটি সরিয়ে নিয়েছেন। তার সঙ্গে চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা যায়নি। তবে পুলিশের নজরদারিতে আছেন তিনি।
ডিএমপি জানায়, নিখোঁজের ঘটনায় বেশ কয়েকটি ফেসবুক পেজ ও গ্রুপ এমন স্ট্যাটাস দিচ্ছে। এসব স্ট্যাটাস সত্য ভেবে অনেকে শেয়ারও করছে নিজের প্রোফাইলে। এতে জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। এগুলো শুধুই গুজব। যারা হারিয়েছে তারা ঘণ্টা কয়েক বাসায় ছিল না। আবার কোনো শিশু দূরে তার বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে গিয়েছিল।
এ বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (মিডিয়া) কে এন রায় নিয়তি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘৪৮ ঘণ্টায় ৩৫ শিশু নিখোঁজ হয়েছে, এমন তথ্য ডিএমপির কাছে নেই।’ তবে নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে সাধারণ ডায়েরির (জিডি) ঘটনা নিয়মিতই ঘটে। গত ৪ থেকে ৬ জুলাই ৭২ ঘণ্টায় নিখোঁজের ঘটনায় ৩২টি জিডি হয়েছে। তাদের অনেকে ফিরেও আসে।’