গাজায় জাতিসংঘের কার্যালয়ে ইসরায়েলি সেনা অভিযান

একদিকে গাজায় যুদ্ধবিরতির আলোচনা শোনা যাচ্ছে, অন্যদিকে নতুন শক্তিতে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। গত রবিবার থেকে গতকাল সোমবার সন্ধ্যা অবধি বিভিন্ন স্থানে ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছে আরও অন্তত ৪০ জন। এর মধ্যে জানা গেল, গাজায় অবস্থিত জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংগঠন ইউএনআরডব্লিউএর ফিলিস্তিন সদর দপ্তরে সামরিক অভিযান চালিয়েছে ইসরায়েল।

এদিকে গাজা থেকে জিম্মিদের মুক্ত করতে চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য সরকারের ওপর চাপ জোরালো করতে ইসরায়েলে দ্বিতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ হয়েছে। গত রবিবার বিক্ষোভকারীরা তেল আবিব ও জেরুজালেমে মিছিল করেছেন। গতকাল ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী জানিয়েছে, ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য নিযুক্ত জাতিসংঘের ত্রাণ কার্যক্রম সংস্থার কার্যালয়ের ভেতর সামরিক সরঞ্জাম রয়েছে এবং এ ভবনের কিছু কক্ষে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র বাহিনী হামাস জিম্মিদের আটকে রাখতে ব্যবহার করে। এর আগে এ এলাকায় অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজন হামাস সদস্যকে হত্যা করা হয়েছিল এবং এ ভবনের নিচে একটি সুড়ঙ্গ পথ ধ্বংস করা হয়। আইডিএফ নিশ্চিত করেছে, তারা অভিযান শুরুর আগে সেখান থেকে লাউডস্পিকারে বেসামরিক ব্যক্তিদের সরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। এ ছাড়া নিরীহ মানুষের যাতায়াতের সুবিধায় তারা একটি করিডর চালু করার কথা জানিয়েছে।

আলজাজিরা বলছে, সোমবার ভোরে হঠাৎ করে ইসরায়েলি বাহিনী এগিয়ে এলে গাজা সিটির পশ্চিমে, তাল আল-হাওয়া মহল্লায় বড় আকারে বোমাবর্ষণ শুরু হয়। যার ফলে বেশ কিছু পরিবার নিজ বাড়িতে আটকা পড়ে।

এ ছাড়া গাজা সিটির পশ্চিমে আর-রেমাল মহল্লায় সড়কের মোড়ে ফ্লোরিয়া বাণিজ্যিক কমপ্লেক্সের ওপরের তলাগুলোতেও বোমা হামলা হয়েছে। ফিলিস্তিনি গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ব্যাংক অব ফিলিস্তিনের ভবনেও হামলা হয়েছে।

এর আগে গত শনিবার গাজার মধ্যাঞ্চলের নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরের আল-জাউনি বিদ্যালয়ে হামলার ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ৭৫ জন আহত হয়। নিহত হয় অন্তত ১৬ জন। এরপর রবিবার অন্য একটি স্কুলেও হামলা চালায় আইডিএফ।

হামাস নিয়ন্ত্রিত গাজার বেসরকারি নিরাপত্তা-সংক্রান্ত একটি সংস্থা জানিয়েছে, গাজা নগরীর হলি ফ্যামিলি বিদ্যালয়ে হামলা চালানো হয়েছে। তবে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী বলছে, গাজা নগরীর ওই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে হামাস যোদ্ধারা লুকিয়ে ছিলেন। সেই সঙ্গে ওই বিদ্যালয়ে হামাসের জন্য গোপনে অস্ত্র বানানো হতো।

গত বছরের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলি ভূখণ্ডে অতর্কিত হামলা চালায় ফিলিস্তিনি সশস্ত্র সংগঠন হামাস। এতে ১ হাজার ১৭০ জন নিহত হয়। জিম্মি হয় প্রায় ২৫০ জন। এ হামলার প্রতিশোধ হিসেবে সেদিনই গাজায় নজিরবিহীন ও নির্বিচার বিমান হামলা শুরু করে ইসরায়েল। পরে স্থলবাহিনীও এতে যোগ দেয়। গত ৯ মাসে ফিলিস্তিনি নিহতের সংখ্যা অন্তত ৩৮ হাজার ১৯৩। আহতের সংখ্যা অন্তত ৮৭ হাজার ৮২৮ জন। হতাহতের বেশিরভাগই নারী ও শিশু।

তবে এ যুদ্ধ বা হামলা বন্ধের দাবি জোরালো হচ্ছে আন্তর্জাতিক মহলে। খোদ ইসরায়েলেও নেতানিয়াহু সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে যুদ্ধবিরতির। গাজায় চলমান ইসরায়েলি যুদ্ধের ৯ মাস পূর্তিতে ইসরায়েল জুড়ে বড় ধরনের বিক্ষোভ করেছে ইসরায়েলিরা। বিক্ষোভকারীরা গাজায় যুদ্ধবিরতি ও জিম্মিদের মুক্তি নিশ্চিত করার জন্য ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। আর তা সম্ভব না হলে নেতানিয়াহুর পদত্যাগ দাবি করেছে তারা। ইসরায়েলের দুটি বড় শহরে বিক্ষোভকারীরা সড়ক অবরোধ করে। তেল আবিবে সড়ক থেকে বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দিতে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে।

গাজায় ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাসের কাছে জিম্মি থাকা ইসরায়েলি নাগরিকদের অনেক স্বজনও বিক্ষোভে অংশ নেয়। তাদের আশঙ্কা, গাজায় এখনো যারা জিম্মি আছে, তাদের ফেরানোর জন্য কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না কর্র্তৃপক্ষ। ইসরায়েল বলছে, গাজায় এখনো আটক আছে ১১৬ জন। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, ৪২ জিম্মি মারা গেছে।

তেল আবিবে বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিলেন ৫৭ বছর বয়সী অরলি নাতিভ। তিনি বলেন, জনগণের ভাবনাকে সরকার পরোয়া করে না। আমাদের বোন ও ভাইদের গাজা থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য তারা কিছুই করছে না।

বিক্ষোভকারীদের অনেকের অভিযোগ, রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে নেতানিয়াহু যুদ্ধবিরতি চুক্তির জন্য খুব একটা উদ্যোগী হচ্ছেন না। তার মন্ত্রিসভার দুজন কট্টর ডানপন্থি সদস্য চুক্তি হলে পদত্যাগের হুমকি দিয়েছেন।

ইসরায়েলের তথ্যের ভিত্তিতে এএফপি জানিয়েছে, গত ৭ অক্টোবর জিম্মি করা হয় ২৫১ জনকে। ইসরায়েলি বাহিনী তাদের মধ্য থেকে সাতজনকে জীবিত উদ্ধার করেছে। নভেম্বরে এক সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির সময় আরও ১০৫ জনকে মুক্তি দেওয়া হয়। এর মধ্যে ৮০ জন ইসরায়েলি নাগরিক।