জীবনে বরকত লাভের উপায়

হাল সময়ে অনেক মানুষের মুখে মুখে একটি শব্দ বারবার ঘুরেফিরে আসে। তা হলো ‘অভাব’। কোনো মানুষের সঙ্গে কথা বলতে গেলেই তিনি নিজের অভাবের বিশাল ফিরিস্তি তুলে ধরেন। অথচ দেখা যায়, যারা অভাবের কথা বেশি বেশি বলে, তারা কেউ বেকার নয়। বরং সবাই মোটা অঙ্কের অর্থ উপার্জন করে। তাদের বাসায় কোনো জিনিসপত্রের অভাব নেই। তারপরও কেন অভাব তাদের পিছু ছাড়ে না? কারণ একটাই। তা হলো, তাদের জীবনে কোনো বরকত নেই। বরকত না থাকার কারণেই তাদের এত অভাব। তাই আমাদের জানতে হবে, জীবনে বরকত কীভাবে আসে? কোন পথে চললে আমরা মহান আল্লাহর দেওয়া বরকত লাভ করতে পারব?

বরকত মানে প্রাচুর্য ও কল্যাণ। বরকত হওয়ার অর্থ হলো কোনো জিনিসে প্রাচুর্য ও স্থায়িত্ব লাভ হওয়া এবং তা কল্যাণকর হওয়া। যেমন : টাকা-পয়সার বরকত হওয়ার অর্থ হলো টাকা-পয়সা কল্যাণের পথে ব্যবহৃত হওয়া। টাকা-পয়সায় বরকত হওয়া মানে পরিমাণে টাকা-পয়সা বেড়ে যাওয়া নয়। তবে কখনো কখনো টাকা-পয়সা বৃদ্ধির দ্বারাও বরকত অর্জন হয়।

খাবার-দাবারে বরকত হওয়ার অর্থ হলো খাবার-দাবার দ্বারা কল্যাণ অর্জিত হওয়া এবং সেই কল্যাণ স্থায়িত্ব লাভ করা। সময়ে বরকত হওয়ার অর্থ হলো কল্যাণময় কাজে জীবনের সময় ব্যয় হওয়া এবং স্বল্প সময়ে অনেক ভালো কাজ করতে পারা। এভাবে জীবনের প্রত্যেক ক্ষেত্রে এবং প্রত্যেক কাজের মধ্যে বরকত হতে পারে। আর যখন আমাদের জীবন বরকতময় হবে, তখন জীবনে সুখ-শান্তির কোনো সীমা থাকবে না। এমনও হতে পারে, ঘরে খাবার নেই, পকেটে টাকা নেই তারপরও দেখবেন, আপনার জীবনে সুখের কোনো সীমা নেই। কোরআন ও হাদিসের আলোকে জীবনে বরকত অর্জনের কিছু উপায় তুলে ধরা হলো।

সময়ে বরকত অর্জনের উপায় : সময়ে বরকত অর্জিত হয় নেক আমলের দ্বারা। যত বেশি নেক আমল আপনি করবেন, জীবনে তত বেশি বরকত হবে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হজরত ছাওবান (রা.) বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘নেক কাজ ছাড়া অন্য কিছু বয়সকে বাড়াতে পারে না। দোয়া ছাড়া অন্য কিছু ভাগ্যকে বদলাতে পারে না। আর মানুষ তার পাপের কারণে রিজিক থেকে বঞ্চিত হয়।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ ৯০)

সম্পদে বরকত অর্জনের উপায় : সম্পদে বরকত অর্জন হয় দান-সদকা করার দ্বারা। মহান আল্লাহর রাস্তায় সম্পদ ব্যয় করলে, দ্বীনের কাজে সম্পদ ব্যয় করলে সম্পদে বরকত হয়। এতে সম্পদ কমে না; বরং বাড়ে। কিন্তু অবৈধ উপায়ে সম্পদ উপার্জন করলে সে সম্পদে আল্লাহতায়ালা বরকত দেন না। কোরআনে কারিমে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন আর দানকে বৃদ্ধি করেন।’ (সুরা বাকারা ২৭৬)

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) কতৃর্ক বর্ণিত এক হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘দান-সদকা সম্পদকে হ্রাস করে না।’ (সহিহ মুসলিম ১৫৮৮)

উপরোক্ত আয়াত ও হাদিস থেকে বুঝা যায় আল্লাহর রাস্তায় দান-সদকা করা হলে, আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করা হলে, ফরজ ব্যয় হোক বা নফল ব্যয়, যে পর্যায়ের ব্যয়ই হোক না কেন তার কারণে সম্পদ কমে না; বরং মহান আল্লাহ সম্পদ বৃদ্ধি করে দেন। কখনো সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি করে দেন, কখনো সম্পদে বরকত বৃদ্ধি করে দেন। যখন যেভাবে বৃদ্ধি করা আল্লাহতায়ালা ভালো মনে করেন, সেভাবেই বৃদ্ধি করে দেন।

এর বিপরীতে যারা সুদ-ঘুষ খায় এবং অবৈধ উপায়ে সম্পদ উপার্জন করে, তাদের সম্পদকে মহান আল্লাহ বরকতহীন করে দেন। তাদের সম্পদে কোনো বরকত হয় না। সম্পদ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সুখ-শান্তি অর্জন করা, তা তাদের ভাগ্যে জোটে না।

অপর হাদিসে এসেছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘যখন আল্লাহর বান্দারা ভোরে ঘুম থেকে ওঠে তখন আকাশ থেকে দুজন ফেরেশতা অবতীর্ণ হন। তাদের একজন বলেন, হে আল্লাহ! তুমি দাতাকে প্রতিদান দাও। অপরজন বলেন, হে আল্লাহ! তুমি কৃপণকে ধ্বংস করে দাও।’ (সহিহ বুখারি ১৪৪২)

অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহতায়ালা বলেন যে, হে আদম সন্তান তুমি দান করো। আমি তোমাকে দান করব। (সহিহ বুখারি)

খাবারে বরকত অর্জনের উপায় : খাবার-দাবারে বরকত অর্জন করার জন্য খাবার শুরু করার আগে মহান আল্লাহর নাম নিয়ে বরকতের দোয়া করে খাবার শুরু করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে হাদিসে। খাবার সামনে এলেও এরূপ দোয়া রয়েছে। খাবার শুরু করার সময়ও এরূপ দোয়া রয়েছে।

খাবার সামনে আসলে ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফিমা রাজাকতানা ওয়াকিনা আজাবান্নার’ দোয়াটি পাঠ করা সুন্নত। এর অর্থ হলো, হে আল্লাহ! তুমি আমাদের যে রিজিক দান করেছ, তাতে বরকত দাও। জাহান্নামের আজাব থেকে আমাদের রক্ষা করো। (কিতাবুল আজকার ৬৫০)

খাবার শুরু করার আগে ‘বিসমিল্লাহি ওয়া বারাকাতিল্লাহ’ দোয়া পাঠ করা সুন্নত। এর অর্থ হলো, আল্লাহর নামে আল্লাহর বরকতের সঙ্গে খাওয়া শুরু করছি।

খাবারে আরও বরকত হয় একত্রে খাওয়ার দ্বারা। হজরত ওয়াহশি ইবনে হারব (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কতিপয় সাহাবি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমরা খাবারি খাই কিন্তু তাতে তৃপ্তি হয় না। তখন হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা সম্ভবত আলাদা আলাদাভাবে খাবার খাও। তারা বললেন, হ্যাঁ। তখন হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরা একত্রে মিলে খাবার খাও এবং আল্লাহর নাম নিয়ে খাবার খাওয়া শুরু করো। তাতে তোমাদের খাবারে বরকত দান করা হবে।’ (সুনানে আবু দাউদ ৩৭৬৪)

খাবারে আরও বরকত হয় পড়ে যাওয়া খাবারের টুকরা উঠিয়ে (প্রয়োজনে ধুয়ে) খেলে। এক হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খাবারের ফায়দা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, তোমাদের জানা নেই, তোমাদের খাবারের কোন অংশে বরকত রয়ে গেছে। হতে পারে, যে অংশ পড়ে গেছে তার মধ্যেই বরকত রয়ে গেছে। অতএব সেটা তুলে খেয়ে নাও।

রিজিকে বরকত অর্জনের উপায় : রিজিকে বরকত হয় আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার দ্বারা। হজরত আনাস (রা.) কতৃর্ক বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিজ জীবিকার বৃদ্ধি এবং দীর্ঘায়ু কামনা করে, সে যেন আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে উত্তম ব্যবহার করে।’ (সহিহ বুখারি ২০৬৭)

উল্লেখ্য, রিজিক দ্বারা শুধু খাবার-দাবার উদ্দেশ্য নয়; বরং মানুষ জীবনে খাবার-দাবার, ধন-সম্পদ, পোশাক-পরিচ্ছদ, শান্তি-নিরাপত্তা যা কিছুই ভোগ করে সবই রিজিকের অন্তর্ভুক্ত।

বিয়ে-শাদিতে বরকত অর্জনের উপায় : বিয়ে-শাদিতে বরকত অর্জন হয় অতিরিক্ত ব্যয় বর্জন করার দ্বারা। হজরত আয়েশা (রা.) কর্র্তৃক বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয় সে বিবাহ বেশি বরকতময় যে বিবাহে ব্যয় কম।’ (বায়হাকি ৬১৪৬)

এভাবে জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কীভাবে বরকত আসে তা শরিয়তে খুব সুন্দরভাবে নির্দেশিত হয়েছে। এ সবগুলোর মূল কথা হলো, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নতের অনুসরণ। এর মাধ্যমেই জীবনের সব ক্ষেত্রে বরকত আসে। এর বাইরে গিয়ে জীবনে অফুরান বরকত ও শান্তির কথা চিন্তা করা যায় না। মহান আল্লাহ আমাদের জীবনের সব ক্ষেত্রে হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নত ও আদর্শ অনুসরণের তওফিক দান করুন।

যেন আমরা ইহকাল ও পরকালের সফলতা অর্জন করতে পারি।