যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে চলছে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর ৭৫তম বার্ষিকীর শীর্ষ সম্মেলন। স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রসহ ৩২ দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানরা যোগ দিয়েছেন তিন দিনের এই সম্মেলনে। ইউক্রেন ও গাজা যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনসহ নানা কারণেই এবারের সম্মেলনটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সম্মেলনের আগে আশা করা হচ্ছিল ইউক্রেন ও গাজা যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে কোনো মতামত বা নির্দেশনা আসতে পারে এবার। কিন্তু সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন গত বুধবার দেখা গেল উল্টো উসকানির ছড়াছড়ি। ইউক্রেনকে আরও কমপক্ষে ৪৩ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ন্যাটো নেতারা। আগামী বছরের মধ্যে ইউক্রেনকে এই সহায়তা সরবরাহ করা হবে। এ সময় আনুষ্ঠানিকভাবে কিয়েভকে এই জোটে সদস্যপদ পাওয়ার জন্য একটি অপরিবর্তনীয় পথও ঘোষণা করেছেন তারা। রাশিয়ার পক্ষ নেওয়ায় সমালোচনা করেছেন চীনও। সব মিলিয়ে সামরিক জোটটি আসলে যুদ্ধ সম্প্রসারণের দিকেই যেতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার ন্যাটো চূড়ান্ত ওই ঘোষণাপত্রের জোটের সদস্যরাও ইউক্রেন এবং ইউরোপের নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য পৃথক এবং যৌথ পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস এবং ডেনমার্ক ঘোষণা করেছে, এই গ্রীষ্মের মধ্যে ন্যাটোর দেওয়া প্রথম এফ-১৬ যুদ্ধবিমান ইউক্রেনের সামরিক পাইলটদের হাতে থাকবে। যুক্তরাষ্ট্র আরও বলেছে, ২০২৬ সালে জার্মানিতে দীর্ঘ পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করবে তারা। এই পদক্ষেপের ফলে শীতল যুদ্ধের পর থেকে সবচেয়ে শক্তিশালী মার্কিন অস্ত্র পেতে যাচ্ছে জার্মানি। এই পদক্ষেপটি ১৯৮৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন স্বাক্ষরিত ইন্টারমিডিয়েট রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস চুক্তির অধীনে নিষিদ্ধ করা হতো। তবে এটি ২০১৯ সালে ভেঙে যায়।
এদিকে রাশিয়া ইউরোপের জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকি হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ করেছে ন্যাটো। রাশিয়ার এই হুমকি মোকাবিলায় জার্মানিতে দীর্ঘ পাল্লার মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের সিদ্ধান্ত বড় ধরনের একটি পদক্ষেপ বলে মনে করছে তারা। রয়টার্স জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্তের ফলে স্নায়ুযুদ্ধের পর থেকে ইউরোপের কোনো দেশে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র পাঠাবে যুক্তরাষ্ট্র, যা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানি এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, বিভিন্ন পর্বে দীর্ঘ মেয়াদের জন্য ইউরোপে বড় পরিসরে এসএম-৬, টমাহক ও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করার প্রস্তুতি চলছে।
বুধবার ন্যাটো মিত্রদের প্রকাশ করা ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, ‘আমরা মিত্রদের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার বিরুদ্ধে হামলার সম্ভাবনা বাদ দিতে পারি না। সম্মেলনে ন্যাটো রাষ্ট্রগুলো ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির প্রতি আরও সমর্থন জুগিয়ে ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে ন্যাটোর মহাসচিব ইয়েন্স স্তোলতেনবার্গ বহু বছর ধরে ইউক্রেনকে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার আহ্বান জানালেও তাতে সাড়া দেননি জোটের সদস্যরা।
এদিকে বিবিসি বলছে, চীনের বিষয়ে ন্যাটোর আগের ভাষ্য এবার আরও জোরালো হয়েছে। সম্মেলনের নথিতে ইউক্রেন রাশিয়ার যুদ্ধে প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে চীনকে ‘নির্ণায়ক সক্ষমকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বেইজিং ইউরো-আটলান্টিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করে চলেছে বলে এতে মন্তব্য করা হয়েছে।
স্তোলতেনবার্গ সাংবাদিকদের জানান, এই প্রথমবারের মতো ন্যাটোর ৩২ সদস্যরাষ্ট্রের সবাই যৌথভাবে চীনকে রাশিয়ার যুদ্ধের নির্ণায়ক সক্ষমকারী হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘ন্যাটো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার সংগঠন না, এটি এর মিত্র রাষ্ট্রগুলোর যার যার সিদ্ধান্তের ব্যাপার। কিন্তু আমার মনে হয়, ন্যাটোর এই সম্মেলনে থেকে আমরা যে বার্তা দিয়েছি, তা খুব পরিষ্কার।’
ওই ঘোষণায় চীনকে রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টায় রাজনৈতিক ও বস্তুগত সমর্থন দেওয়া বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়। চীনের মহাকাশ সক্ষমতা ও তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের দ্রুত সম্প্রসারণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। আর সবশেষে বেইজিংকে কৌশলগত ঝুঁকি হ্রাস আলোচনায় যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
ইউক্রেনের বিমানবাহিনীকে শক্তিশালী করার জন্য ন্যাটোর প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে করা একটি পোস্টে তিনি বলেছেন, নতুন যুদ্ধবিমানগুলো ন্যায্য ও স্থায়ী শান্তিকে আরও একধাপ এগিয়ে দিয়েছে। সন্ত্রাস অবশ্যই ব্যর্থ হবে।
তবে রাশিয়া ও চীন এই ঘোষণাপত্রের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্র পেসকভ বলেছেন, ইউরোপ ও আমেরিকা আসলে সংলাপ চায় না। তারা শান্তিও চায় না। তিনি বলেন, পশ্চিমা নেতারা চাইছেন ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়া কৌশলগত কোনো ভুল করুক। কিন্তু আমরা ন্যাটোকে সব সময়ই চোখে চোখে রাখব।
ন্যাটো নেতাদের তীব্র সমালোচনা করেছে চীনও। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেছেন, পশ্চিমাদের উচিত চীনের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক কথাবার্তা ও ভুল তথ্য ছড়ানো বন্ধ করা। এ ছাড়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ন্যাটোকে নাক না গলানোর বিষয়েও সতর্ক করেছে চীন।