ক্লাস গবেষণা না করে পরীক্ষায় স্বাচিপ নেতাসহ ২ চিকিৎসক

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) চিকিৎসক ডা. পবিত্র কুমার দেবনাথের পর এবার সব নিয়ম ভেঙে এমডি (ডক্টর অব মেডিসিন) কোর্সের চূড়ান্ত ফাইনাল পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন আরও দুই চিকিৎসক। এই চিকিৎসকদের একজন বিএসএমএমইউয়ের অ্যানেসথেশিয়া বিভাগের মেডিকেল অফিসার শরীফ উদ্দিন সিদ্দিকী ও অন্যজন মাতুয়াইল শিশু-মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ইফতেখার আহমেদ বাপ্পি। ইফতেখার আহমেদ আওয়ামীপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) কেন্দ্রীয় কমিটির প্রশিক্ষণ ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক।

নিয়ম অনুযায়ী, এমডি কোর্সের একজন শিক্ষার্থীকে শিক্ষাছুটি নিয়ে পূর্ণকালীন আবাসিক শিক্ষার্থী হিসেবে পড়াশোনা করতে হয়। শিক্ষাছুটিতে থাকা অবস্থায় তার প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করা কিংবা কর্মক্ষেত্রে থাকার কোনো সুযোগ নেই। তবে এসব নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিয়মিত ক্লাস না করে, টিউটোরিয়াল পরীক্ষা না দিয়ে ও গবেষণা না করেই থিসিস পেপার জমা দিলেও চূড়ান্ত পরীক্ষায় বসার সুযোগ পেয়েছেন ইফতেখার আহমেদ ও শরীফ উদ্দিন। তাদের পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে প্রতিষ্ঠান দুটি।

একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, ডা. ইফতেখার ১১ জুলাই (গতকাল) বিএসএমএমইউ কেন্দ্রে পরীক্ষা দিয়েছেন। অন্যদিকে ডা. শরীফ একই কেন্দ্রে পরীক্ষা দেবেন ১৫ জুলাই।

এর আগে ৪ জুলাই শরীফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে বিএসএমএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক ডা. দীন মো. নূরুল হকের কাছে অ্যানেসথেশিয়া, অ্যানালজেসিয়া ও ইনটেনসিভ কেয়ার মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কামাল হোসেন লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগে অধ্যাপক কামাল উল্লেখ করেন, পাঁচ বছরে এমডি কোর্সের কোনো ক্লাস করেননি শরীফ, এমনকি অপারেশন থিয়েটার প্লেসমেন্টেও অংশ নেননি। তিনি যে থিসিস জমা দিয়েছেন, তাও সম্পূর্ণ ভুয়া। শরীফ উদ্দিনকে কখনো অপারেশন থিয়েটারেও দেখেননি বলে জানান এই শিক্ষক।

অধ্যাপক কামাল হোসেন বিভাগীয় চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, ‘শরীফ উদ্দিনের লগ ইন বইয়ে স্বাক্ষর দিতে না চাইলে বিভাগীয় চেয়ারম্যান আমাকে হুমকি দেন এবং স্বাক্ষর দিয়ে থিসিস পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার ব্যবস্থা করেন।’

বিভাগীয় চেয়ারম্যান সাবিনা ইয়াসমীনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে ইফতেখার আহমেদ শিশু-মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে একটা ইউনিটের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ইভিনিং কনসালট্যান্সি ও প্রশিক্ষণার্থীদের শিক্ষাদানসহ অন্যান্য স্বাভাবিক কার্যক্রম পালন করেছেন। তার নিয়মিত ডিউটি রোস্টার ও দায়িত্ব পালনের তথ্য-প্রমাণ রয়েছে দেশ রূপান্তরের হাতে।

শিশু-মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আব্দুল মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার জানা মতে ইফতেখার আহমেদ কর্মরত নন, তিনি শিক্ষার্থী হিসেবেই পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। বিভাগ থেকেও আমাকে তাই জানানো হয়েছে।’ ডিউটি রোস্টারে ডা. ইফতেখারের নাম থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে দেখব।’

মাতুয়াইল শিশু-মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক জানান, ইফতেখার আহমেদ ৮০ শতাংশ ক্লাসেই অনুপস্থিত ছিলেন। কিছুদিন পরপর তিনি ক্লাস করতে যেতেন এবং একসঙ্গে সব হাজির দিয়ে রাখতেন। তিনি থিসিসের ক্লাস না করেই থিসিস পেপার জমা দিয়েছেন, যেখানে নানা অসংগতি থাকার পরও তাকে উত্তীর্ণ দেখানো হয়েছে। অন্য চিকিৎসকরা জোরালো প্রতিবাদ জানালেও তাতে কর্ণপাত করেননি শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. ওয়াহিদা খানম।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. ওয়াহিদা খানমকে ফোন দেওয়া হলে তিনি ব্যস্ত আছেন জানিয়ে এক ঘণ্টা পর ফোন দিতে বলেন। এক ঘণ্টা পর তাকে আবার কল দিলেও তিনি ব্যস্ত আছেন বলে ফোন রেখে দেন এবং এরপর আর ফোন ধরেননি।

নিয়ম ভেঙে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাধারণত পরীক্ষায় একজন শিক্ষার্থীকে অংশ নেওয়ার অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় দেখে। এরপরও যদি কোনো নিয়মের ব্যত্যয় ঘটে এবং কেউ ইউজিসি বরাবর অভিযোগ করে, তাহলে আমরা ব্যবস্থা নিই। এ রকম অনৈতিক উপায়ে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার অনুমতি বিষয়ে আমার জানা ছিল না, কমিশন খোঁজ নিয়ে দেখবে।’

এর আগে একইভাবে অনৈতিক উপায়ে এমডি কোর্সের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার অনুমতি পেয়েছিলেন বিএসএমএমইউয়ের রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা. পবিত্র কুমার সরকার। এ নিয়ে দেশ রূপান্তরে ‘ক্লাস করেন না পরীক্ষায় ফেল তবুও তিনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বে-নজির আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যে শিক্ষার্থী যোগ্য নন, তিনি যখন একটা বিশেষজ্ঞ ডিগ্রি পান, তাতে রোগীদের ঝুঁকি বাড়বে। এটা কোনোভাবেই ঘটতে দেওয়া উচিত নয়।’ বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলেরও কঠোর হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।

দেশের চিকিৎসকদের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসির) ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ডা. মো. লিয়াকত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একজন শিক্ষার্থীকে পরীক্ষায় অংশ নিতে দেওয়া কিংবা না দেওয়া ইনস্টিটিউট বা সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের এখতিয়ার। এরপরও যদি আমাদের কাছে কেউ লিখিত অভিযোগ করে, তাহলে আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখব।’