প্রচারের অভাবে আসে ‘ভুল’ বার্তা

পুলিশি সেবাসংক্রান্ত নগরবাসীর নানা দুর্ভোগের কথা সরাসরি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারকে জানাতে কয়েক মাস আগে চালু হয় ‘মেসেজ টু কমিশনার’। ডিএমপির বর্তমান কমিশনার হাবিবুর রহমান ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে নগরবাসীকে আধুনিক পুলিশি সেবা প্রদানের লক্ষ্যে চালু করেন এ সেবা। কিন্তু চালুর সময় উদ্যোগটি আশার সঞ্চার করলেও প্রচারণার অভাবে এর যথাযথ সুফল পাচ্ছে না নগরবাসী। এ সেবার সংশ্লিষ্ট দুটি মোবাইল ফোন নম্বরে প্রতিদিন মেসেজের মাধ্যমে গড়ে চারটি করে প্রাসঙ্গিক অভিযোগ জমা পড়ছে। তবে বেশিরভাগ অভিযোগই আসছে অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে।

সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ‘মেসেজ টু কমিশনার’ সেবায় আসা প্রাসঙ্গিক অভিযোগগুলোর শতভাগেরই প্রতিকার করা হচ্ছে। কিন্তু অপ্রাসঙ্গিক বিষয়গুলোর সমাধান পুলিশের পক্ষে করা সম্ভব নয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পুলিশের সঙ্গে নাগরিকদের সেতুবন্ধন ও পুলিশি সেবাগুলো পাওয়ার পথ সহজ করতে গত বছরের নভেম্বরে ‘মেসেজ টু কমিশনার’ সেবা চালু করে ডিএমপি। ওই বছরের দুই মাসে সংশ্লিষ্ট দুটি মোবাইল ফোন নম্বরে মেসেজের মাধ্যমে ৩৯টি অভিযোগ এলেও চলতি বছরে প্রতি মাসে গড়ে ১২৬টি করে প্রাসঙ্গিক অভিযোগ ‘মেসেজ টু কমিশনার’-এ আসে। এর বাইরেও অসংখ্য অপ্রাসঙ্গিক মেসেজ এসেছে। ‘মেসেজ টু কমিশনার’ সেবার বিষয়টি যথাযথভাবে প্রচার বা ব্র্যান্ডিং না করায় নগরবাসী অপ্রাসঙ্গিক মেসেজ পাঠিয়ে থাকে বলে ধারণা অনেকের। ‘মেসেজ টু কমিশনার’ সেবার সংক্ষিপ্ত নাম ‘এম টু সি’। এর স্লোগান হলো ‘এ উইন্ডো অব স্মার্ট পুলিশিং’। প্রধানমন্ত্রীর রূপকল্প ২০৪১ সালের মধ্যে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয়ে ডিএমপির ৫০

থানার নাগরিক সেবাসংক্রান্ত কাজগুলো সহজ ও দ্রুততর করতে এ মেসেজ টু কমিশনার সেবা চালু করা হয়। নগরবাসী পুলিশের সেবাসংক্রান্ত যেকোনো সমস্যার প্রতিকার ও পরামর্শের জন্য ‘এম টু সি’র মাধ্যমে এসএমএস ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করতে পারবে। এর পাশাপাশি ভয়েস এসএমএস দিয়েও জানানো যাবে অভিযোগ। অভিযোগ করতে যেকোনো অপারেটরের মোবাইল ফোন থেকে থানার নাম লিখে ০১৩২০-২০২০২০ ও ০১৩২০-১০১০১০ নম্বরে মেসেজ পাঠাতে হবে। মেসেজ পাওয়ামাত্রই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে তা সেবাপ্রার্থীকে ফিরতি মেসেজ দিয়ে জানিয়ে দেবেন।

তবে যথাযথ প্রচারণার অভাবে এই সেবার সুফল ভোগ করতে পারছে না নগরবাসী। আবার নগরবাসীদের অনেকেই অবগত নন এ সেবা সম্পর্কে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজধানীর বাড্ডা এলাকার বাসিন্দা বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মী রাজিব হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মেসেজ টু কমিশনার এ বিষয়ে এই প্রথম শুনলাম। তবে এ উদ্যোগটা ভালো হয়েছে। থানায় গিয়ে কোনো সমস্যায় পড়লে কমিশনারকে বিষয়টি জানানো যাবে।’

একই ধরনের ভাষ্য মিরপুরের বাসিন্দা ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেলের চালক সিয়াম হাসানের। তিনি বলেন, ‘মেসেজ টু কমিশনার এ বিষয়ে আমার জানা নেই। তবে এটা আমাদের জন্য খুবই উপকারী হবে। অনেক সময় অহেতুক ট্রাফিক পুলিশ মামলা দেয়। সেই বিষয়গুলো আমরা কমিশনারকে জানাতে পারব।’

এ ছাড়া কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর কাছে ডিএমপির এই সেবার বিষয়ে জানতে চাইলে তাদের অধিকাংশই বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন বলে জানান।

ডিএমপির সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মেসেজ টু কমিশনারে প্রয়োজনের (প্রাসঙ্গিক) চেয়ে অপ্রয়োজনীয় (অপ্রাসঙ্গিক) মেসেজ বেশি আসে। দেখা গেছে, রাস্তায় যানজটের সৃষ্টি হয়েছে তার জন্য মেসেজ দিচ্ছে। রাস্তায় গাড়ি পার্কিংয়ের সমাধান চেয়ে মেসেজ দেওয়া হচ্ছে। এমনকি পরীক্ষার ফি প্রদান, পাওনা টাকা উদ্ধার, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া, রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, প্রতিবেশীদের সঙ্গে মারপিট, জন্মদিনের শুভেচ্ছার মতো অপ্রয়োজনীয় ঘটনার মেসেজও এখানে দেওয়া হয়। তবে এসব মেসেজ পরীক্ষা করে যেটি প্রয়োজনীয় মনে হচ্ছে সেটির সমাধান করা হচ্ছে। গত জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ৭৬০টি অভিযোগের মধ্যে ৭৩২টির সমাধান করা হয়েছে। সমস্যা সমাধানের পরে আবার ভুক্তভোগীকে ফিরতি মেসেজও দেওয়া হচ্ছে।’

মেসেজ টু কমিশনারের কাজ : ‘মেসেজ টু কমিশনার’ উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছিল ঢাকা মহানগরের বাসিন্দাদের কথা চিন্তা করে। এর মাধ্যমে নাগরিকরা পুলিশি সেবা সংক্রান্তে যেকোনো সমস্যা, অভিযোগ জানানো ও পরামর্শ গ্রহণের জন্য সরাসরি কমিশনারের কাছে বার্তা পাঠাতে পারবে। এ ছাড়া নাগরিকরা অপরাধ সম্পর্কিত যেকোনো তথ্য জানানোর মাধ্যমে অপরাধ প্রতিরোধে ভূমিকা পালন করতে পারবেন। সামাজিক অপসংস্কৃতি, বাল্যবিয়ে, যৌতুক ও কিশোর অপরাধ সম্পর্কেও অভিযোগ করতে পারবেন। থানায় জিডি ও মামলাযোগ্য আইনি সেবা-পরামর্শ চেয়ে বার্তা পাঠাতে পারবেন।

প্রচারণার অভাবে অপ্রয়োজনীয় মেসেজ : ‘মেসেজ টু কমিশনার’ সেবার প্রচারণা বা ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য কিছু নীতিমালাও করা হয়েছিল। যার মধ্যে ছিল সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধিদের নিয়ে উদ্বোধন, ২-৩ মিনিটের একটি প্রোমো ভিডিও (বিজ্ঞাপন) তৈরি করে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার, থানা বা পুলিশের সব ইউনিটে প্রচারপত্র দিয়ে জনসাধারণকে এ সেবা সম্পর্কে অবগত করা, বিট পুলিশিং সেবায় এ বিষয়ে ব্রিফিং এবং সবশেষে শর্ট ভিডিও ফিল্ম আকারে মেসেজ টু কমিশনারের বিজ্ঞাপন তৈরি। কিন্তু এ বিষয়গুলোতে তেমন একটা গুরুত্ব না দেওয়ায় অপ্রাসঙ্গিক মেসেজ বেশি আসছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (অপারেশন) বিপ্লব কুমার সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মেসেজ টু কমিশনারে প্রতিদিন অসংখ্য অভিযোগ আসে। যার মধ্যে প্রয়োজনীয় মেসেজগুলো দেখে সমাধান করা হয়। মেসেজ টু কমিশনার তৈরি করা হয়েছিল নগরবাসীর পুলিশিং সেবাগুলো যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, পুলিশের মাধ্যমে যাতে কেউ ক্ষতিতে না পড়ে, সেই বিষয়গুলোর অভিযোগ করার জন্য। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় অপ্রয়োজনীয় অভিযোগ বেশি আসছে। তবে প্রয়োজনীয় অভিযোগগুলোর বিষয়ে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আবার ভুক্তভোগীদের ব্যবস্থা নিয়ে জানিয়েও দেওয়া হয়।’

মেসেজ টু কমিশনারে আসা কয়েকটি অভিযোগ : ‘মেসেজ টু কমিশনার’ সেবার দুটি মোবাইল ফোন নম্বরে প্রতিদিন জমা পড়া অভিযোগের বেশিরভাগই অপ্রাসঙ্গিক বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা। তেমনই কয়েকটি মেসেজ হলো ‘ভাইয়া আমি অনেক বিপদে পড়ে আছি, ঢাকার উত্তরায় এক লোক, আমার শালার মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরে চাকরি নিয়ে দেওয়ার কথা বলে টাকা নিয়ে গেছে। চাকরি তো হয় নাই। এখন আমার টাকা আমাকে দিতে চাচ্ছে না। ভাইয়া, দয়া করে আমাকে একটু হেল্প করুন। আপনার কাছে বিনীত অনুরোধ করছি, ভাইয়া আমি ওখানে কোন থানায় যাব, দয়া করে একটু ফোন করে দেবেন ওসিকে।’

‘মাননীয় ডিএমপি কমিশনার স্যার আসসালামু আলাইকুম স্যার। স্যার, ঢাকা শহরের কিছু গাড়িতে পুলিশের স্টিকার লাগায় স্যার। আপনি সেগুলো সরায়ে ফেলতে বলেছেন স্যার। এটা মহৎ মহতী উদ্যোগ স্যার, ভালো উদ্যোগ স্যার। আপনাকে ধন্যবাদ স্যার। কিন্তু কিছু গাড়ি এখনো রাস্তায় চলে পুলিশের স্টিকার লাগিয়ে। আজকে আমি একটি গাড়িতে দেখেছি স্যার।’

‘অভিযোগকারীর স্বামী সিঙ্গাপুর প্রবাসী, তার স্বামীর বড় ভাই ১০ বছর পূর্বে আমার থেকে ১২ লাখ টাকা এবং ৪ ভরি গয়না নেয়, তা চাইলে, তার ছোট ভাইকে দিয়ে অত্যাচার করে এবং সে, তার বউ, তার ছেলে আমাকে মারধর করে, সোনারগাঁও থানা, নারায়ণগঞ্জ থানায় অভিযোগ করলেও তারা মামলা আকারে নেয় না।’

‘Assalamu alaiychum, জন্মদিন আমাদের অনুপ্রেরণা মহান আল্লাহতায়ালা যেন আপনার দীর্ঘ হায়াত দান করেন।’