কেয়ামতের দিন হবে অত্যন্ত ভয়াবহ ও বিভীষিকাময়। সেদিন ভয়াবহ ও বিভীষিকাময় অবস্থা হবে, এটা সবাই জানে। কিন্তু সেই ভয়াবহতা কত ব্যাপক হবে তা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সবাই পারে না। সেদিন কেউ কাউকে চিনবে না। চিনলেও পরিচয় দেবে না। প্রত্যেকে ‘ইয়া নাফসি’, ‘ইয়া নাফসি’ বলবে। সেদিন মানুষ হবে বিক্ষিপ্ত পতঙ্গের মতো। পায়ের নিচে কোনো মাটি থাকবে না। সবকিছু জ্বলন্ত ধূলিকণা হয়ে বাতাসে উড়তে থাকবে। সবার অবস্থা হয়ে উঠবে অত্যন্ত ভীতিকর ও যন্ত্রণাদায়ক।
সেদিনের ভয়াবহতা ও বিভীষাকার কথা অনেক হাদিসে এসেছে। এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘হাশরের মাঠে ভয়ে প্রত্যেকে বলতে থাকবে, আমাকে বাঁচান, আমাকে বাঁচান। শুধু মুহাম্মদ (সা.) উম্মত নিয়ে চিন্তা করবেন।’ (সহিহ বুখারি ২৭১২) সেদিন ভয়াবহতার প্রধান কারণ হলো, প্রত্যেক মানুষের পূর্বের ভালো-মন্দ সব আমল ও আমলনামা উপস্থিত করা হবে এবং তা পরিমাপ করা হবে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর উপস্থাপিত করা হবে আমলনামা, তখন তাতে যা লিপিবদ্ধ আছে তার কারণে আপনি অপরাধীদের দেখবেন আতঙ্কগ্রস্ত এবং তারা বলবে, হায়! দুর্ভাগ্য আমাদের! এটা কেমন গ্রন্থ! এটা তো ছোট-বড় কিছু বাদ না দিয়ে সব কিছুই হিসাব করে রেখেছে। তারা যা আমল করেছে তা সামনে উপস্থিত পাবে। আর আপনার রব তো কারও প্রতি জুলুম করেন না।’ (সুরা কাহাফ ৪৯)
অপর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, ‘কেয়ামতের দিন আমি ন্যায়বিচারের মানদণ্ড স্থাপন করব। ফলে কারও প্রতি কোনো জুলুম করা হবে না। যদি কোনো কর্ম তিল পরিমাণও হয়, তবে তাও আমি উপস্থিত করব। হিসাব গ্রহণের জন্য আমিই যথেষ্ট।’ (সুরা আম্বিয়া ৪৭) বোঝা গেল, কেয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালা সর্বসমক্ষে তুলাদণ্ড স্থাপন করবেন। তাতে মানুষের আমল পরিমাপ করা হবে এবং আমলের ওজন অনুসারে মানুষের পরিণাম স্থির করা হবে।
হাশরের মাঠের এসব ভয়াবহতার কথা শুনলে ভয়ে লোমকূপ দাঁড়িয়ে যায়। কিন্তু কঠিন এই অবস্থাতেও নানাবিধ কারণে কিছু মানুষের সেদিন বিচার হবে না। তাদের আমল ওজন করা হবে না। কোনো হিসাব দেওয়া ছাড়াই তাদের ফায়সালা হবে। কেউ বিনা হিসাবে জান্নাতে যাবে। কেউ বিনা হিসাবে জাহান্নামে যাবে। তাদের বিস্তারিত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো।
নবী-রাসুল : মানবজাতির সর্বোত্তম কাফেলা হচ্ছে নবী-রাসুলরা। যারা আল্লাহতায়ালার ওহির জ্ঞান ও বিধিবিধান মানবজাতির কাছে পৌঁছানোর জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন। যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসুল এসেছিলেন। তারা ছিলেন বিশ্ববাসীর জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে অনেক বড় করুণা ও রহমতস্বরূপ। নবী-রাসুল সবাই মাসুম বা নিষ্পাপ। তাই কেয়ামতের ময়দানে তাদের আমলের কোনো হিসাব হবে না এবং ওজনের পাল্লায় মাপা হবে না। তারা বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে রাসুল! আপনার প্রতি আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যা কিছু নাজিল করা হয়েছে, তা প্রচার করুন। যদি (তা) না করেন, তবে (তার অর্থ হবে) আপনি আল্লাহর বার্তা পৌঁছালেন না। আল্লাহ আপনাকে মানুষের (ষড়যন্ত্র) থেকে রক্ষা করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ কাফের সম্প্রদায়কে হেদায়েত করেন না।’
(সুরা মায়েদা ৬৭)
ফেরেশতা : ফেরেশতারা আল্লাহতায়ালার অন্যতম বিস্ময়কর সৃষ্টি। তারা নিষ্পাপ ও পবিত্র। ফেরেশতারা আল্লাহতায়ালার তসবিহ-তাহলিল ও ইবাদত-বন্দেগিতে সর্বদা লিপ্ত থাকেন। তাদের ভেতরে গুনাহ করার কোনো উপকরণ দেওয়া হয়নি। তাই তারা গুনাহ থেকে মুক্ত। এ ছাড়া আল্লাহতায়ালা তার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন জিন ও মানুষকে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি জিন ও মানুষকে কেবল এ জন্যই সৃষ্টি করেছি যে, তারা আমার ইবাদত করবে।’ (সুরা জারিয়াত ৫৬)
পাগল : যারা পাগল অবস্থায় বালেগ হয়েছে এবং পাগল অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করেছে তাদের কোনো হিসাব হবে না। তারা যেহেতু শরিয়তের বিধিবিধানের আওতাধীন নয় তাই তাদের আমাল ওজন করা হবে না। বরং বিনা হিসেবে জান্নাতে যাবে। হজরত আয়েশা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তিন ধরনের লোকের ওপর থেকে কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে, ঘুমন্ত ব্যক্তি যতক্ষণ না জাগ্রত হয়। পাগল ব্যক্তি যতক্ষণ না সুস্থ হয়। নাবালেগ যতক্ষণ না বালেগ হয়।’
(আবু দাউদ ৪৩৯৮)
নাবালেগ অবস্থায় মৃত্যুবরণ : মুসলমানদের যে সব সন্তান নাবালেগ অবস্থায় মারা যায় তারাও বিনা হিসাবে জান্নাতে যাবে। তাদের আমলনামা ওজন করা হবে না। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুসলমানদের ছোট-ছোট বাচ্চা যারা নাবালেগ অবস্থায় মারা গিয়েছে, জান্নাতে ইব্রাহিম (আ.) তাদের দায়িত্ব পালন করবেন।’ (মুসনাদে আহমদ)
সত্তর হাজার লোক : মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মতের মধ্যে এমন ৭০ হাজার লোক থাকবে, যাদের আমল ওজন করা হবে না; বরং তারা বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমার ৭০ হাজার উম্মত বিনা হিসাবেই জান্নাতে যাবে।’
(সহিহ মুসলিম ৪১৭)
কাফের-মুশরিক : এমন কাফের-মুশরিক যাদের কুফুরির ওপরই মৃত্যু হয়েছে। কেয়ামতে তাদের আমল ওজন করা হবে না; বরং তারা বিনা হিসাবে জাহান্নামে চলে যাবে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘এরাই সেসব লোক যারা নিজ প্রতিপালকের আয়াতসমূহ তার সামনে উপস্থিতির বিষয়টিকে অস্বীকার করে। ফলে তাদের যাবতীয় কর্ম নিষ্ফল হয়ে গেছে। আমি কেয়ামতের দিন তাদের জন্য কোনো ওজনের ব্যবস্থা রাখব না।’ (সুরা কাহাফ ১০৫) অর্থাৎ কেয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে তাদের কোনো মূল্য ও ওজন থাকবে না।