গাজা সিটিতে অবস্থিত ফিলিস্তিনে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংগঠন ইউএনআরডব্লিউএর সদর দপ্তরে হামলা চালিয়ে ভবনটি ভেঙে দিয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। গতকাল মঙ্গলবার ইউএনআরডব্লিউএ প্রধান ফিলিপ লাজারিনির বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আলজাজিরা।
এর আগে গত সপ্তাহে আইডিএফ (ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী) জানিয়েছিল তারা এ ভবনের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেছে। আইডিএফ দাবি করে, এ ভবনের ভেতর সামরিক সরঞ্জাম রয়েছে এবং কিছু কক্ষে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র বাহিনী হামাস জিম্মিদের আটকে রাখে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে লাজারিনি বলেন, ‘এ ঘটনায় আমি স্তম্ভিত। গাজায় ইউএনআরডব্লিউএর সদর দপ্তর শুরুতে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয় আর এখন তা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন উপেক্ষা করা হচ্ছে এবং ঘটনাটি এ অব্যাহত ধারার সর্বশেষ উদাহরণ। জাতিসংঘের অবকাঠামোগুলোকে সব পরিস্থিতিতে সুরক্ষিত রাখতে হবে। এগুলোকে কখনোই সামরিক বা যুদ্ধের কাজে ব্যবহার করা চলবে না। সব যুদ্ধের কিছু নিয়ম থাকে। গাজার যুদ্ধও কোনো ব্যতিক্রম নয়।
ইউএনআরডব্লিউএর মুখমাত্র তামারা আলরিফাই জানান, ইসরায়েল গাজায় গত সপ্তাহে বেশ কয়েকবার হামলা চালিয়েছে, যা এ যুদ্ধের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী হামলার অন্যতম। এ ছাড়া গাজা সিটিতে ইউএনআরডব্লিউএর সদর দপ্তর ধ্বংসের মাধ্যমে ইসরায়েল প্রমাণ করেছে, তারা গাজা উপত্যকায় যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা করছে না।
তামারা বলেন, গাজার যুদ্ধ শুরুর পর গত সপ্তাহটি ছিল সবচেয়ে ভয়াবহতম সপ্তাহের অন্যতম। ইউএনআরডব্লিউএর সদর দপ্তর থেকে যেসব ছবি আমরা পাচ্ছি, সেগুলো আমাদের স্তম্ভিত করেছে। তিনি আরও জানান, ইসরায়েল এ যুদ্ধে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন উপেক্ষা করছে। জাতিসংঘের অবকাঠামোর ওপর হামলার ঘটনাগুলো এর স্পষ্ট প্রমাণ।
তিনি উল্লেখ করেন, গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ইউএনআরডব্লিউএর ১৯০টি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার বেশিরভাগই বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়শিবির হিসেবে ব্যবহার হচ্ছিল। এ সংঘাতে ১৯০টি অবকাঠামো আক্রান্ত হয়েছে এবং এসব আশ্রয়শিবিরের ভেতরে থাকা ৫০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে।
এদিকে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানাচ্ছে, গাজায় স্থল, জল ও আকাশপথে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। উপত্যকাটির উত্তর থেকে দক্ষিণ সর্বত্রই তছনছ হয়েছে ইসরায়েলের বোমা ও গুলির আঘাতে। এরই মধ্যে গাজায় যুদ্ধবিরতির আলোচনা থেকে সরে এসেছে হামাস। এতে সেখানে শিগগিরই সংঘাত থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
গত সোমবার উত্তরে গাজা নগরের তাল আল-হাওয়া, শেখ আজলিন, আল-সাবরা এলাকা এবং নুসেইরাত আশ্রয়শিবিরে নির্বিচার গোলাবর্ষণ করেছে ইসরায়েলি সেনারা। মধ্য গাজার আল-মুগারাকা এলাকাও ইসরায়েলের গোলা আঘাত হেনেছে। এ অঞ্চলের আল-মাগাজি শিবিরে ইসরায়েলের বিমান হামলার পর তিন শিশুসহ পাঁচ ফিলিস্তিনির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে রেড ক্রিসেন্ট।
ইসরায়েলের এ চলমান হামলায় গত বছর ৭ অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৮ হাজার ৬৬৪ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ৮৯ হাজার ৯৭ জন। ইসরায়েলের হামলা শুরুর আগে ওইদিনই দেশটিতে ঢুকে ১ হাজার ১৯৫ জনকে হত্যা করেন হামাস সদস্যরা। জিম্মি করা হয় ২৫১ জনকে। তাদের মধ্যে ১১৬ জন এখনো হামাসের হাতে বন্দি।
জিম্মিদের মুক্ত করতে এবং গাজায় যুদ্ধবিরতির জন্য দফায় দফায় আলোচনায় বসছে ইসরায়েল ও হামাস। তবে আশার আলো দেখা যাচ্ছে না। এরই মধ্যে হামাস জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির চলমান আলোচনা থেকে সরে দাঁড়াচ্ছে তারা। হামাস নেতা মোহাম্মদ দাইফের হত্যাচেষ্টার সময় ৯২ ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার পর এ সিদ্ধান্ত নেয় সংগঠনটি।
এদিকে গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করে এক বিবৃতিতে হামাস বলে, আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ অস্ত্র ইসরায়েলের হাতে তুলে দেওয়ার মাধ্যমে জাতিগত নিধনে সমর্থন দিচ্ছে মার্কিন সরকার। ইসরায়েলের হামলায় ফিলিস্তিনের নারী ও শিশুদের যে রক্ত ঝরছে, তার প্রতি অবজ্ঞা দেখাচ্ছে দেশটি।