জেল পলাতকদের বিরুদ্ধে নতুন মামলা হবে

কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে গত শুক্রবার বিকেলে নরসিংদীর জেলা কারাগারে দুর্বৃত্তদের হামলায় অস্ত্রাগার থেকে ৮৫ অস্ত্র লুট হয়েছে। কারাগার থেকে পালিয়েছে ৮২৬ জন। যারা কারাগার থেকে পালিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা করার বিধান রয়েছে। বিচারে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দুই বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম সাজা হতে পারে বলে জানিয়েছেন সাবেক জেলা ও দায়রা জজ মো. মঈদুল ইসলাম।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) লিগ্যাল ও প্রসিকিউশন শাখার সাবেক এই মহাপরিচালক দেশ রূপান্তরকে বলেন, কারাগারে যেসব বন্দি ছিলেন, তাদের কারও বিচার শেষে সাজা ভোগ করছিলেন, আবার কারও বিরুদ্ধে বিচারকার্য চলছিল। কারাগারে হামলার দিন অনেক আসামি কারাগার থেকে পালিয়ে যান। দ-বিধির ২২৪ ধারা অনুযায়ী, যারা কারাগার থেকে পালিয়েছেন এটি একটি আলাদা অপরাধ। কারাগারে কেউ কেউ সাজাপ্রাপ্ত ছিল, কেউ কেউ অপরাধে অভিযুক্ত ছিল। যেসব অপরাধে তারা কারাগারে ছিল, সেটা চলতে থাকবে। এখন জেলা পালানোর ঘটনাটি একটি নতুন অপরাধ। এই অপরাধে তাদের বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা করা হবে। বিচারে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দুই বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম সাজা দেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, নরসিংদী কারাগারের ঘটনা সাধারণ বন্দি পালানোর ঘটনা নয়, এটি একটি উদ্ভূত পরিস্থিতি ছিল। যখন বিচারকার্য শুরু হবে, তখন প্রসিকিউশন প্রমাণ করতে চাইবে অভিযুক্তরা কারাগার থেকে পালিয়ে গেছে। আর অভিযুক্তরা আইনজীবীর মাধ্যমে প্রমাণ করতে চাইবে তারা পরিস্থিতির স্বীকার। যখন কারাগারে হামলা হয়েছে, তখন তারা আটক থাকলে মারা যাবেন, জানের ভয়ে তারা ওই জায়গা থেকে সরে গেছেন, পালিয়ে যাননি এ রকম ডিফেন্স তারা নেবেন। এই পরিস্থিতিতে তারা তো নিরুপায়। কারা কর্তৃপক্ষ নিজেরাই আত্মরক্ষার্থে ব্যস্ত। তাদের কীভাবে রক্ষা করবে। তারা প্রাণভয়ে পালিয়েছেস। এই সুযোগটা তাদের আছে। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে, তারা আত্মসমর্পণ করে কারাগারে ফিরে এসেছে। সরকার যদি আত্মসমর্পণের বিষয়ে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে, তাহলে তাদের বিচারের আওতায় আনা হবে না।

মঈদুল ইসলাম বলেন, কারাগারের অস্ত্র লুট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। অস্ত্র লুটের ঘটনায় অস্ত্র আইনে মামলা হবে, ডাকাতির মামলা হবে।

জানা গেছে, নরসিংদী জেলা কারাগারটি শহরের ভেলানগরের ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশেই অবস্থিত। এই ভেলানগর ও জেলখানা মোড়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা কয়েক দিনই লাগাতার বিক্ষোভ-সমাবেশ করছিলেন। শুক্রবার বিকেলে দুর্বৃত্তরা নরসিংদী জেলা কারাগারে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করে অস্ত্র লুটের সময় ৮২৬ বন্দি পালিয়ে গেছেন। এর মধ্যে গতকাল বিকেল পর্যন্ত ২৬১ জন আত্মসমর্পণ করেছেন। তারা নরসিংদী জেলা দায়রা জজ আদালতের মাধ্যমে আত্মসমর্পণ করেন। জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি কাজী নাজমুল ইসলাম বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন।

নরসিংদী কারাগার পরিদর্শন করেছেন সেনাবাহিনীর প্রধান : আমাদের নরসিংদী প্রতিনিধি জানান, দুর্বৃত্তদের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত নরসিংদী জেলা কারাগার পরিদর্শন করেছেন সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। গতকাল বুধবার দুপুরে তিনি কারগার পরিদর্শন করেন।

নরসিংদী কারাগারে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, অস্ত্র লুট ও আসামিদের বের করে নেওয়ার ঘটনার ৫ দিন পর সেনাপ্রধান কারগার পরিদর্শন করেন। এর আগে হেলিকপ্টার যোগে নরসিংদী মুছলেহ উদ্দিন ভূঁইয়া স্টেডিয়ামে অবতরণ করেন সেনাপ্রধান। পরে তিনি বেলা ১টা ২০ মিনিটে নরসিংদী জেলা কারাগার পরিদর্শন করেন। এ সময় নরসিংদী জেলা প্রশাসক ড. বদিউল আলম, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমানসহ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

নরসিংদী জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট কাজী নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘কয়েদিরা আইনজীবীদের মাধ্যমেই কারাগারে থাকে। ঘটনার পর থেকেই আইনজীবীরা কয়েদির সঙ্গে যোগাযোগ করে আইনের আশ্রয়ে নিয়ে আসার জন্য কাজ করছেন। আমাদের ডাকে সাড়া দিয়ে তারা আত্মসমর্পণ করছে। আমরা আশাবাদী ধীরে ধীরে আরও কয়েদি আত্মসমর্পণ করবে।’

নরসিংদীর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘চলমান সহিংসতার ঘটনায় জেলার বিভিন্ন থানায় পৃথক ৮টি মামলা হয়েছে। কারাগারে হামলার ঘটনায় সাবেক জেলার কামরুল ইসলাম বাদী হয়ে ২টি মামলা করেছেন। গতকাল নাশকতার ঘটনায় অভিযান চালিয়ে ২৭ জনকে গ্রেপ্তার ও ৩৯টি  অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।

নরসিংদী জেলা প্রশাসক ড. বদিউল আলম জানান, গতকাল নরসিংদী কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া ১৯০ কয়েদি আদালতের মাধ্যমে আত্মসমর্পণ করেছে। এ নিয়ে পালিয়ে যাওয়া ৩৩১ কয়েদি আত্মসমর্পণ করেছে। বর্তমানে কারাগারে নিরাপত্তায় বিজিবি ক্যাম্প নিয়োজিত রয়েছে। আর জেলার প্রতিটি ইউনিয়নের ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে মাইকিং করা হচ্ছে যেন কয়েদিরা নিকটস্থ থানা, কারাগার বা আদালতে আত্মসমর্পণ করে।