বাঙালি, ভিনদেশি কিংবা মোগলাই হরেক রকম খাবারের পাশাপাশি সি ফুড বা সামুদ্রিক খাবার ভোজনরসিকদের পছন্দের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে অনেক আগেই। বৈচিত্র্যময় স্বাদের সঙ্গে স্বাস্থ্য উপযোগী হওয়ায় অনেকের ডায়েট চার্টেই আছে সি ফুড। পুষ্টিগুণে ভরপুর সি ফুড গ্রহণের কিছু খারাপ দিকও রয়েছে। সি ফুডের আদ্যোপান্ত নিয়ে লিখেছেন জান্নাতুল কাওসার
হোমো স্যাপিয়েনরা ১৬৫০০০ বছর আগে থেকেই সামুদ্রিক জীবন সংগ্রহ করে আসছে। সামুদ্রিক খাবার সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সেবন করা যুগ যুগ আগে থেকেই ঘটে আসছে। বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকেও প্রমাণ পাওয়া যায়, সামুদ্রিক খাবার বরাবরই বেঁচে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কালের বিবর্তনে এসেছে নতুন কাল, নতুন দিন, নতুন মানুষ। কিন্তু উন্নত মানুষের যুগেও সামুদ্রিক খাবারের আবেদন এতটুকু কমেনি।
স্যামন, শেলফিশসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ, লবস্টার, শ্রিম্প, মলাস্কস, ওয়েস্টার, ক্লাম, ক্র্যাব, স্কালোপস, স্কুইড দেশে জনপ্রিয় হওয়া সামুদ্রিক খাবার বা সি ফুড। বাঙালি বা বিদেশি কিংবা মোগলাই হরেক রকম খাবারের পাশাপাশি সি ফুড বা সামুদ্রিক খাবার অনেক দিন ধরেই ভোজনরসিকদের পছন্দের তালিকায় বেশ ওপরের দিকেই স্থান পাচ্ছে। বৈচিত্র্যময় স্বাদের সঙ্গে স্বাস্থ্য উপযোগী হওয়ায় অনেকের ডায়েট চার্টেও স্থান করে নিয়েছে সি ফুড। কিন্তু পুষ্টিগুণে ভরপুর সি ফুড গ্রহণের ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতাও অবলম্বন করা জরুরি, না হলে ভালোর বদলে খারাপটাই হওয়ার সম্ভাবনা রয়ে যাবে।
সি ফুডের ধরন
প্রধানত তিন ধরনের সি ফুড বেশি জনপ্রিয়। একটি হলো বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ। স্যামন, ট্রাউট, সারডিন, কোরাল এই মাছগুলো খেতে দারুণ সুস্বাদু। আরেকটি সি ফুড হলো মলাস্কস। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের অক্টোপাস, স্কুইড, ঝিনুক ইত্যাদি। ক্রাসটেশিয়ান বলে সি ফুডের আরেকটি ধরন রয়েছে। নানা রকম চিংড়ি, লবস্টার ও কাঁকড়া এর অন্তর্গত। এই সামুদ্রিক প্রাণীগুলোকেই রন্ধন প্রণালি অনুসরণ করে নানা রকম সুস্বাদু পদে রূপ দেওয়া হয়।
কেন খাবেন সি ফুড
সামুদ্রিক খাবার বা সি ফুডে থাকে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন এবং ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড। কাজেই মাছ, মাংস ও ডিমের পাশাপাশি সামুদ্রিক খাবার হতে পারে প্রোটিনের চাহিদা মেটানোর একটি বড় উৎস। খাবারের পাতে ৮৫ গ্রাম সামুদ্রিক মাছ মানবদেহে জিংকের দৈনিক চাহিদার ২১ ভাগ, লৌহের ১৩ ভাগ, সেলেনিয়ামের ৯৯ ভাগ এবং ভিটামিন বি১২-এর শতভাগ চাহিদা পূরণে সক্ষম। সামুদ্রিক মাছের তেল ত্বককে উজ্জ্বল করতে সাহায্য করে। ত্বকের তারুণ্য ধরে রাখে। ভিটামিন বি-১২, ভিটামিন-ই, ম্যাগনেসিয়াম, সোডিয়াম এবং পটাসিয়াম সামুদ্রিক খাবারে পাওয়া যায়। এই ভিটামিন ও মিনারেল চুল পড়ার সমস্যা দূর করে চুলকে আরও স্বাস্থ্যকর, মজবুত ও চকচকে করে তুলতে সাহায্য করে। যারা হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডিসলিপেডেমিয়ায় ভুগছেন, তারা গরু-খাসির মাংস, মগজের মতো অনেক খাবার খেতে পারেন না। তাদের জন্য উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ সামুদ্রিক খাবার চমৎকার একটি বিকল্প হতে পারে। ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড একই সঙ্গে হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। স্যামন, সার্ডিন, অয়েস্টার ও শ্রিম্পে উচ্চমাত্রার ভিটামিন ‘ডি’ রয়েছে, যা হাড়ের জন্য বিশেষভাবে উপকারী।
বাড়িতেই হোক সামুদ্রিক খাবার
রেস্তোরাঁয় নানা পদের সি ফুড আইটেম যেমন আপনি পেয়ে যাবেন, তেমন বাড়িতেও সহজেই সামুদ্রিক খাবারের নানা পদ তৈরি করে ফেলতে পারেন। একে তো এই খাবার রান্না করতে বেশি তেল মসলা ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। তার ওপর সময়ও লাগে কম। আমাদের দেশেই এখন মিলছে কেটে-কুটে চটজলদি রান্নার উপযোগী ফ্রেশ বা হিমায়িত সি ফুড। বাড়িতে বিশেষ অনুষ্ঠানে একটু ভিন্ন স্বাদের কিছু তৈরি করতে চাইলে সামুদ্রিক খাবারের পদ আয়োজনে এনে দেবে বাড়তি বৈচিত্র্য।
স্কুইড বা মিক্সড সি ফুড দিয়ে সয়া সস, উস্টার সস, অয়েস্টার সস ইত্যাদির ফ্লেভারে গ্রেভি করা যায়। হালকা ভাজা বা সাতলে নিলেও ভালো লাগবে। আবার ফ্রায়েড রাইসও তৈরি করে ফেলতে পারেন। সামুদ্রিক মাছের ফিলে পরিবেশন করতে পারেন। সামান্য লবণ-লেবু আর ফ্রেশ গোলমরিচের গুঁড়া-সহযোগে এপিঠ-ওপিঠ একটু ভেজে নিলেই হলো। পছন্দমতো সিজনিং দিয়ে বেকও করা যায়। রূপচাঁদা বা কোরাল মাছ দিয়ে করতে পারেন বারবিকিউ। চিংড়ি তো বাঙালি বাড়িতে বেশ চেনা পদ। একটু ভিন্ন কিছু করতে চাইলে বানাতে পারেন সুস্বাদু প্রণচিলি। লবস্টার সাধারণত আগে লবণ-পানিতে অল্প সিদ্ধ বা স্টিম করে তারপর মাখন-রসুন, অলিভ অয়েল-গোলমরিচ বা যেকোনো ফ্লেভারের গ্রেভিতে সাতলে নিলে ভালো লাগে। চিংড়ি, স্কুইড, বড় কোনো সামুদ্রিক মাছের ফিলের সমন্বয়ে বানাতে পারেন সি ফুড স্যুপ। তবে যেভাবে যে পদই রান্না করুন না কেন, সামুদ্রিক খাবার কিন্তু অনেকক্ষণ ধরে রান্না করা যাবে না। অর্থাৎ ওভারকুক করা যাবে না। এতে খাবারের স্বাদ এবং গুণ দুটোই নষ্ট হয়। সামুদ্রিক খাবারের পরিবেশনায় মিনিমালিজম মেনে চলুন। অন্য খাবারের মতো প্লেট বা বাটি ভর্তি করে পরিবেশন করলে এর আমেজটাই মাটি হয়ে যাবে। প্রত্যেকের জন্য আলাদা প্লেটিং করুন। অথবা বড় একটি ডিশে কোনো প্যাটার্ন মেনে পরিবেশন করতে পারেন।
সংরক্ষণের তরিকা
সামুদ্রিক খাবারের ধরন অন্য যেকোনো খাবারের চেয়ে একটু আলাদা। এর সংরক্ষণ প্রক্রিয়াও তাই আলাদা। এই খাবার ঠিকমতো প্রসেস করে না খেলে মারাত্মক অ্যালার্জি দেখা দিতে পারে।
বাজার থেকে কেনার সময় তাজা সামুদ্রিক মাছ বা মলাস্ক কিনতে চেষ্টা করুন। যদি না পারেন তাহলে হিমায়িত সামুদ্রিক খাবার কিনুন, তবে অবশ্যই মেয়াদ দেখে। চিংড়ি, কাঁকড়া বেছে নেওয়ার সময় দেখতে হবে, তা তাজা কিনা। কাঁচা অবস্থায় সাধারণভাবে নীলচে ও স্বচ্ছ দেখাবে এগুলো। এদিকে মাসেলস তাজা হলে তার মুখ বন্ধ থাকবে, যা চুলার তাপ পেলে খুলে যায় নিজে নিজেই। কাঁচা
সামুদ্রিক মাছ (Seafood) কেনার সময় ভালোভাবে দেখে নিন সেটি টাটকা কিনা। টাটকা মাছ হলে তবেই কিনুন। গন্ধেই অনেক সময় মাছ টাটকা কিনা বোঝা যায়। খেয়াল করুন। বাজার থেকে সামুদ্রিক মাছ কিনে আনার পর বেশিক্ষণ ফেলে রাখবেন না। বাড়ি এসেই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মাছটিকে পরিষ্কার করে ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখুন। রান্নার আগে চিংড়ি, কাঁকড়া এগুলো খুব ভালো করে পরিষ্কার করুন। কোন অংশগুলো ফেলে দিতে হবে সেটি জেনে নিন। সামুদ্রিক মাছ বা সি ফুডে সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়া থাকে। তাই রান্না করা খাবার-দাবারের পাশে কাঁচা সামুদ্রিক মাছ রাখলে সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা থাকে। তাই কখনই কাঁচা মাছ রান্না করা খাবারের কাছাকাছি রাখবেন না। এতে কাঁচা মাছ ও সংরক্ষিত খাবার দুই-ই নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
কারা খেতে পারবেন না
গর্ভাবস্থায় সামুদ্রিক খাবার খাওয়া মা ও শিশু উভয়ের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কেননা সামুদ্রিক খাবারে উচ্চমাত্রার মার্কারি রয়েছে। যারা ইউরিক অ্যাসিডের সমস্যায় ভোগেন তারা সামুদ্রিক খাবার এড়িয়ে চলতে পারেন। শুকনো সামুদ্রিক মাছে সোডিয়ামের পরিমাণ বেশি থাকে। উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগের রোগীদের অল্প পরিমাণে খেতে হবে। শ্রিম্প, ওয়েস্টার, ক্র্যাব, স্কালোপস, স্কুইড ইত্যাদি সামুদ্রিক খাবার খেলে অনেকের অ্যালার্জি দেখা দেয়। ত্বকে চুলকানির সঙ্গে দেখা দিতে পারে হাঁচি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হয়ে যাওয়া ইত্যাদি। অনেক সময় তাৎক্ষণিক শ্বাসকষ্ট শুরু হতে পারে। তাই যাদের অ্যালার্জির সমস্যা আছে, তারা আগে থেকেই না জেনে নতুন কোনো সামুদ্রিক খাবার খাবেন না। সামুদ্রিক খাবার খেতে হলে কিডনি রোগীদের বিশেষ সতর্কতা দরকার। সামুদ্রিক মাছ কিংবা খাবারে প্রোটিন ও মিনারেলের পরিমাণ অনেক বেশি। যাদের কিডনির সমস্যা আছে, তারা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া খাবেন না।