গাজীপুরে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দিনে-রাতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ লাইন সংস্কারসহ নানা অজুহাতে কর্তৃপক্ষ প্রায়ই কোনো কোনো এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখছে। কল-কারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক রাখার জন্য শিল্প-কারখানা অধ্যুষিত এলাকায় কম লোডশেডিং দেওয়ার কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ শিল্প-মালিকদের। এক মাসে লোডশেডিংয়ের কারণে প্রায় শতকোটি টাকা লোকসানের দাবি করেছেন ব্যবসায়ীরা।
বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের সঙ্গে যোগ হয়েছে গ্যাসসংকট। দীর্ঘদিন ধরে গাজীপুরের কোনাবাড়ী, কালিয়াকৈর, ভোগড়া, কাশিমপুর, শ্রীপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের সংকট লেগেই আছে। বারবার তিতাস কর্তৃপক্ষকে এ ব্যাপারে অভিযোগ জানানো হলেও এখন পর্যন্ত সংকট নিরসনে কোনো উদ্যোগ নেয়নি তিতাস।
জানা গেছে, গাজীপুরের কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, জরুনসহ আশপাশের এলাকায় শতাধিক শিল্প-কারখানা রয়েছে। এসব এলাকায় দিনে সাত থেকে আট ঘণ্টা লোডশেডিং থাকে। লোডশেডিং দীর্ঘ হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কারখানার মালিকরা। বিদ্যুৎ না থাকার কারণে শত শত কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কমে গেলে শ্রমিকদের বেতনসহ নানা সংকটে পড়ার দুশ্চিন্তায় রয়েছেন অনেক পোশাক ব্যবসায়ী। সে ক্ষেত্রে শ্রমিকরা মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। লোডশেডিংয়ের কারণে জেনারেটরে প্রচুর পরিমাণ জ¦ালানি খরচ হয়। তা ছাড়া চাহিদামতো উৎপাদন এবং সময়মতো পণ্য শিপমেন্ট করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়তে হয়।
ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা জানান, কোটা আন্দোলন কেন্দ্র করে বেশ কিছুদিন শিল্প-কারখানা বন্ধ রাখা হয়। কারখানা চালু হলেও ইন্টারনেট সেবা নিয়ে বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগে ব্যাঘাত ঘটছে। এর মধ্যে ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে বিভিন্ন কল-কারখানায় উৎপাদনে ধস নেমেছে। শিল্প-কারখানা অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে গাজীপুরে লোডশেডিং কম হওয়ার কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। এমনকি শিডিউল মেনে ও আগাম তথ্য দিয়ে লোডশেডিং করার যে ঘোষণা সরকার দিয়েছে, সেই নির্দেশনা এখানে মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ শিল্প-মালিকদের। এ অবস্থায় বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন একেবারেই কমে এসেছে। ফলে বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কা করছেন শিল্প-মালিকরা।
লোডশেডিং হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে গাজীপুর পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি-১-এর জেনারেল ম্যানেজার (কম) মো. মোহায়মেনুল ইসলাম বলেন, ‘আমার নিয়ন্ত্রণে জেলা শহরের ১২টি ফিডার রয়েছে। এই ফিডারগুলোয় পালাক্রমে লোডশেডিং দেওয়া হয়। তাতে দেখা গেছে, ২৪ ঘণ্টায় একটি ফিডারে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা লোডশেডিং থাকছে।
স্থানীয় শিল্প-মালিক ও ব্যবসায়ীরা জানান, গাজীপুরে এমনিতেই গ্যাসের প্রকট সমস্যা। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বায়ারদের দেওয়া অর্ডার ঠিকমতো সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এতে লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে কারখানাকে। ঠিকমতো পোশাক সরবরাহ করতে না পারলে শ্রমিকদেরও বেতন দেওয়া সম্ভব হবে না। ব্যবসায়ীরা উৎপাদন ধসের জন্য বিদ্যুতের পাশাপাশি গ্যাসসংকটকেও দায়ী করেছেন। কারখানার বয়লার চালাতে যেখানে ১৫ পিএসআই প্রেশার দরকার, সেখানে অনেক সময় তা নেমে এক বা দুই পিএসআইয়ে দাঁড়ায়। এ সময় কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। তখন বিকল্প হিসেবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সেই বিদ্যুৎও ২৪ ঘণ্টায় ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং দেওয়া হয়।
গাজীপুরের ভবনীপুর এলাকার খান ব্রাদার্সের মালিক হযরত আলী বলেন, একটা কারখানায় যা উৎপাদন হয়, তার তিন ভাগের এক ভাগ উৎপাদন কমে গেছে লোডশেডিংয়ের কারণে। কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। দেশের শিল্প-কারখানা টিকিয়ে রাখতে হলে দ্রুত সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎ এবং গ্যাসের সমস্যা সমাধান করা জরুরি।
কাশিমপুর এলাকায় এসএম নিটিং কারখানার মহাব্যবস্থাপক সোলাইমান কবির তাদের কারখানায় বিদ্যুৎ ও জেনারেটর নির্ভরশীল। দিনে দেখা যায় এক বা দেড় ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে আবার এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। আবার কখন কখনো এর চেয়ে বেশিও লোডশেডিং থাকে। এ সময় জেনারেটর চালাতে হয়। তখন উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়।
চান্দনা এলাকার আরবি ফ্যাশন কারখানার পরিচালক মামুন হোসেন জানান, লোডশেডিংয়ের একটা সময় নির্ধারণ করা প্রয়োজন। দিনের একটা নির্দিষ্ট সময় লোডশেডিং হলে সমস্যা হতো না। দেখা যায়, ২৪ ঘণ্টা ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। এত লোডশেডিংয়ে কাজে বিঘœ ঘটছে। জেনারেটর দিয়ে উৎপাদন অব্যাহত রাখতে গেলে বেড়ে যাচ্ছে খরচ।
গাজীপুর প্রিন্ট নেটওয়ার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ হাসান সোহেল জানান, বিদ্যুতের ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে সময়মতো অর্ডারের পণ্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না। জেনারেটর দিয়ে কারখানা চালাতে গিয়ে অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে হচ্ছে। এতে কারখানা লোকসানের মধ্যে পড়তে হচ্ছে। গত এক মাসে প্রায় শতকোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে।
গাজীপুর পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি-১-এর সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার আবুল বাশার আজাদ জানান, ১৫৫টি ফিডারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ গ্রাহকের কাছে পৌঁছানো হয়। এর মধ্যে ১০০টি ফিডারে শিল্প-কারখানা রয়েছে। বাকিগুলো আবাসিক। শিল্প-কারখানায় লোডশেডিং না করার জন্য সরকারের নির্দেশনা থাকলেও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে তা পুরোপুরি মানা সম্ভব হচ্ছে না।
গাজীপুর পল্লীবিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানায়, গাজীপুরে প্রায় দুই হাজারের মতো শিল্প-কারখানা থাকলেও এসব কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। চাহিদা ও প্রাপ্তির বিস্তর ফারাক থাকায় শিল্প, বাণিজ্য ও আবাসিকে বিদ্যুৎ-সংকট থেকেই যাচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়ে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। গত ১৮ জুলাই মধ্যরাত থেকে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং পদ্ধতি চালু হওয়ার কথা থাকলেও গাজীপুরে লোডশেডিং চলছে আগের নিয়মেই।
গাজীপুর পল্লীবিদ্যুৎ সূত্রে জানা গেছে, জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে ৬৫০ মেগাওয়াট। পাওয়া যাচ্ছে প্রায় অর্ধেক পরিমাণ। বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ঘাটতি থাকার কারণে লোডশেডিং করতে হচ্ছে দফায় দফায়।