বৈশাখের এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে যখন নগরী ডুবেছিল, তখনই ধারণা করা হয়েছিল বর্ষায় কী ঘটতে যাচ্ছে? যথারীতি দেরিতে হলেও গতকাল বৃহস্পতিবার ছয় ঘণ্টায় (সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা) ৯৭ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টিতে প্রায় পুরো নগরী জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় দুই বা তিন ঘণ্টার মধ্যে পানি নেমে গেলেও কিছু কিছু এলাকা দিনভর জলমগ্ন ছিল। জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ পুরোদমে শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই দুর্ভোগ থেকে যেন মুক্তি নেই নগরবাসীর।
জলাবদ্ধতা নিরসনে মেগা প্রকল্পের অবকাঠামোগত অগ্রগতি ৭১ শতাংশ হলেও এখনো খালের উভয় পাড়ে ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হয়নি। আর এতে জলাবদ্ধতা প্রকল্পের অগ্রগতিতেও ধীরগতি বলে উল্লেখ করেছেন মাঠপর্যায়ে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নকারী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোর।
এ বিষয়ে সেনাবাহিনীর প্রকল্প পরিচালক লে. কর্নেল ফেরদৌস আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নগরীর অনেক এলাকায় এক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যে পানি নেমে গেলেও মুরাদপুর ও আগ্রাবাদ এলাকায় কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। মুরাদপুর এলাকায় হিজরা খালের উভয় পাড়ে ভূমি অধিগ্রহণের কাজ হয়নি ফলে খাল সম্প্রসারণের কাজ শেষ করতে না পারায় পানি আটকে গিয়ে জলাবদ্ধতা দীর্ঘ হচ্ছে।’
আগ্রাবাদ ও হালিশহর এলাকায় গতকাল দিনভর পানি আটকে ছিল। এই আটকা পানির বিষয়ে লে. কর্নেল ফেরদৌস আহমেদ বলেন, ‘ওই এলাকাটি স্বাভাবিকভাবেই নিচু। তাই পানি নামতে দেরি হয় এবং অল্প বৃষ্টিতেই পানি আটকে থাকে। মূলত, অধিক বৃষ্টিপাত ও একটি বড় ফ্যাক্টর ছিল।’
তবে আগ্রাবাদ এলাকায় পানি জমার জন্য মোগলটুলী খালের মুখে রেগুলেটর বসানোর কাজ শেষ না হওয়া দায়ী বলে জানান জলাবদ্ধতা প্রকল্পের অনুমোদনকারী সংস্থা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রকল্প পরিচালক ও নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ মাঈনুদ্দিন। তিনি বলেন, ‘জলাবদ্ধতা প্রকল্পে অনেক এলাকায় সুফল পাওয়া যাচ্ছে। তবে হিজরা খাল এলাকায় ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ করতে না পারায় মুরাদপুর ও বহদ্দারহাট এলাকায় পানি জমে জলাবদ্ধতা হচ্ছে। এ ছাড়া আগ্রাবাদ এলাকার মোগলটুলী খালে রেগুলেটর বসানো হলে ওই এলাকায় আর পানি জমবে না।’
কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। গতকাল সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত নগরীতে ৯৭ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এ ছাড়া গত বুধবার রাত থেকেই বৃষ্টি হচ্ছিল। বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপের প্রভাবে এই বৃষ্টিপাতে সকাল থেকেই নগরীর আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা, ছোটোপুল, শান্তিবাগ, হালিশহর কে-ব্লক, এল-ব্লক, আই-ব্লক, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, কর্ণফুলী আবাসিক এলাকা, পোর্ট কানেকটিং রোডের তাসপিয়া, ওয়াপদা, নয়াবাজার, অলংকার মোড়, পশ্চিম ফিরোজশাহ কলোনি এলাকায় প্রায় হাঁটুসমান পানি জমে যায়। এ ছাড়া জাকির হোসেন রোডের ওয়ারলেস মোড়, ঝাউতলা রেলগেট, জিইসি মোড়, ওয়াসা মোড়, চকবাজার, ডিসি রোড, কেবি আমান আলী রোড, কাপাসগোলা ও বাদুরতলা এলাকায় পানি জমে। তবে সবচেয়ে বেশি পানি জমে ষোলশহর ২ নম্বর গেট, মুরাদপুর, সুন্নিয়া মাদ্রাসা এলাকা, হাজীপাড়া ও শমসেরপাড়া এলাকায়। এ এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে পানি আটকা ছিল। কোথাও কোথাও কোমরসমান পানিও দেখা যায়।
জলাবদ্ধতা বিষয়ে হালিশহর কে-ব্লকের বাসিন্দা মামুনুর রশিদ মামুন বলেন, ‘এলাকার রাস্তা উঁচু করা হলো, মহেশখালের মুখে সøুইসগেট লাগানো হলো, তারপরও জলাবদ্ধতা দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেলাম না।’
তবে সহসা এ অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার চিন্তা করাও সম্ভব নয় বলে জানান ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার। তিনি বলেন, ‘অনেক এলাকায় খালের পাশে দেওয়া রিটেইনিং ওয়ালগুলো রাস্তা থেকে উঁচু। এতে রিটেইনিং ওয়ালগুলো একেকটি বাঁধে পরিণত হয়েছে। ফলে পানি রাস্তা থেকে খালে যেতে পারছে না। অন্যদিকে সøুইসগেটগুলোর মুখ আরও চওড়া করা হলে আরও বেশি পরিমাণে পানি বের হয়ে যেতে পারত। তা না করায় পানি দ্রুত বের হতে না পেরে জলাবদ্ধতা দীর্ঘ করছে।’
জলাবদ্ধতা নিরসনে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা না হওয়ায় নগরবাসীকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বলে জানান প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার।
তবে রাস্তার ওপরে পানি জমার জন্য অনেকে সিটি করপোরেশনকে দায়ী করছেন। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নালার ওপরে আরসিসি ঢালাই দিয়ে বন্ধ করে এর ওপরে টাইলস লাগানোর ফলে নালাগুলো আর পরিষ্কার করা হয় না। এতে নালাগুলো ময়লা ও বালু জমে বন্ধ হয়ে যায় এবং পানি রাস্তায় নেমে আসে।
এই অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী শাহীন-উল ইসলাম বলেন, ‘এই অভিযোগের ভালো ও খারাপ উভয় দিক রয়েছে। জমাট বাঁধিয়ে টাইলস লাগানোর ফলে ওপর থেকে আর কেউ নালার ভেতরে ময়লা ফেলতে পারে না, আবার দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় পরিষ্কারের সুযোগ থাকছে না বলে এগুলো ব্লকেজ হয়ে যায়। তাই এ সমস্যা কীভাবে সমাধান করা যায়, তা নিয়ে ভাবছি।’
চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএর ৮ হাজার ৬২৯ কোটি টাকার প্রকল্পের পাশাপাশি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বহদ্দারহাট থেকে বারৈয়পাড়া পর্যন্ত ১ হাজার ৩৬২ কোটি টাকায় একটি নতুন খাল খননের প্রকল্প রয়েছে। গত বছর এর খননকাজ শুরু হয়। অন্যদিকে সিডিএর ২ হাজার ৭৭৯ কোটির প্রকল্পের আওতায় চাক্তাই থেকে কালুরঘাট সেতু পর্যন্ত উপকূলীয় বেড়িবাঁধ ও সøুইসগেট নির্মাণের আওতায় ১২টি সøুইসগেট রয়েছে। এ ছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের আরেক প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ৬২০ কোটি টাকায় কর্ণফুলীর মোহনা থেকে উজানে মদুনাঘাট পর্যন্ত ২৩টি সøুইসগেট রয়েছে। সব মিলিয়ে ৪০টি সøুইসগেটে নগরীর খালগুলো থেকে কর্ণফুলী থেকে জোয়ারের পানি প্রবেশ বন্ধ হওয়ার কথা। এসব প্রকল্প শেষ হলে চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতার সুফল পাওয়া যাবে বলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর বক্তব্য।