বৃষ্টি-বন্যা বাড়াচ্ছে ‘উড়ন্ত নদী’

ভারী বৃষ্টিপাতে সৃষ্ট বন্যা ও ভূমিধসে চলতি বছরের বর্ষা মৌসুমের শুরু থেকে ভারতে বহু মানুষের প্রাণ গেছে, বাস্তুচ্যুত হয়েছে হাজারো মানুষ। বছরের এ সময়ে ভারত বা এশিয়ায় বন্যা অস্বাভাবিক নয়, কারণ এই অঞ্চলে এ সময়টাতেই সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মৌসুমি বৃষ্টিপাত অনিয়মিত হয়ে পড়ছে, অল্প সময়ের মধ্যে ব্যাপক বৃষ্টিপাতের পর দীর্ঘ সময় ধরে দেখা দিচ্ছে বৃষ্টিহীনতা বা খরা।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে বায়ুতে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বা আর্দ্রতার পরিমাণ বাড়ছেই; সেই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে এক ধরনের ঝড়, যাকে বলা হচ্ছে ‘বায়ুমণ্ডলীয় নদী’ বা ‘উড়ন্ত নদী’।

বিবিসি বলছে, এই ঝড় আসলে বিপুল জলীয় বাষ্পের অদৃশ্য ফিতার মতো; যার জন্ম হয় উষ্ণ মহাসাগরে। বাষ্পীভূত পানি ওই অদৃশ্য ফিতার মতো জড়ো হয় বায়ুমণ্ডলে। জলীয় বাষ্প বায়ুমণ্ডলের নিচের অংশে অনেকগুলো স্তম্ভ গঠন করে, বাতাসে ভেসে সেগুলো ক্রান্তীয় অঞ্চল থেকে শীতল অক্ষাংশে চলে যায়। পরে তা নেমে আসে বৃষ্টি বা তুষার হিসেবে, যা বন্যা বা মারাত্মক তুষারপাত সৃষ্টির জন্য দায়ী।

পৃথিবীর বাতাসে ভাসমান মোট জলীয় বাষ্পের প্রায় ৯০ শতাংশই বহন করে এই ‘উড়ন্ত নদীগুলো’। এই জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বিশ্বের বৃহত্তম নদী আমাজনের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহের প্রায় দ্বিগুণ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবী দ্রুত উষ্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই বায়ুমণ্ডলীয় নদীগুলো দীর্ঘ, প্রশস্ত ও তীব্রতর হয়ে উঠছে, যা বিশ্ব জুড়ে কোটি কোটি মানুষকে বন্যার ঝুঁকিতে ফেলেছে।

ভারতের আবহাওয়াবিদরা বলছেন, ভারত মহাসাগরে উষ্ণায়নের কারণে ‘উড়ন্ত নদী’ তৈরি হচ্ছে, যা জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে মৌসুমি বৃষ্টিপাতকে প্রভাবিত করছে।

বিজ্ঞান সাময়িকী নেচারে ২০২৩ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ভারতে ১৯৫১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বর্ষা মৌসুমে ৫৭৪টি বায়ুমণ্ডলীয় নদীর দেখা মিলেছে; সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ধরনের চরম আবহাওয়ার ঘটনা বেড়েছে। ভারতে গত দুই দশকে সবচেয়ে তীব্র বায়ুমণ্ডলীয় নদীগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশই বন্যা সৃষ্টি করেছে।

ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আইআইটি) এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের একটি দল এই গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তারা দেখেছেন, ১৯৮৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বর্ষা মৌসুমে ভারতের সবচেয়ে ১০টি মারাত্মক বন্যার সঙ্গে সাতটিরই যোগ আছে বায়ুমণ্ডলীয় নদীর সঙ্গে। ওই গবেষণায় বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক দশকগুলোয় ভারত মহাসাগরে বাষ্পীভবন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। জলবায়ু উষ্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বায়ুমণ্ডলীয় নদী ও তার মাধ্যমে বন্যা সৃষ্টির ঘটনাও সম্প্রতি বেড়েছে।

ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল মিটিরিওলজির বায়ুমণ্ডলীয় বিজ্ঞানী ড. রক্সি ম্যাথিউ কোল বিবিসিকে বলেন, বর্ষা মৌসুমে ভারতীয় উপমহাদেশের দিকে প্রবাহিত আর্দ্রতার তারতম্য (আরও ওঠানামা) বৃদ্ধি পায়। ফলে উষ্ণ সমুদ্রের পুরো আর্দ্রতা কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিনের মধ্যে বায়ুমণ্ডলীয় নদীগুলোয় চলে যায়। তাতে দেশ জুড়ে ভূমিধস ও হড়কা বান বাড়ছে।

বিবিসি লিখেছে, এক একটি বায়ুমণ্ডলীয় নদীর দৈর্ঘ্য ২ হাজার কিলোমিটার (১,২৪২ মাইল), প্রস্থ ৫০০ কিলোমিটার এবং গভীর প্রায় ৩ কিলোমিটার হতে পারে। এমন নদী এখন আরও প্রশস্ত ও দীর্ঘতর হচ্ছে, কিছু ক্ষেত্রে ৫ হাজার কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ নদীও দেখা গেছে। তবে এগুলো খালি চোখে মানুষ দেখতে পায় না।